এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : চলতি বছর শেষ হওয়ার আগেই বিশ্ববাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ সামগ্রিক পণ্যের দাম গড়ে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতিতে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ এবং খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশ বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘অক্টোবর ২০২৬: কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্যের এই সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, আগামী ২০২৭ সালে সামগ্রিক পণ্যমূল্য কিছুটা কমতে পারে। তবে খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে স্বস্তির সম্ভাবনা কম। বরং আগামী বছরও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। এই অঞ্চলের অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বিশেষ করে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে। সংঘাতের কারণে তেলের মজুত কমে যাওয়ায় নতুন করে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষ্ণসাগর দিয়ে খাদ্যশস্য পরিবহনে বাধা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে শস্য সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি রাশিয়ার পরিশোধিত জ্বালানি তেলের উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাধা বাজারের অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এসব ভূরাজনৈতিক সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু জ্বালানি নয়, খাদ্য ও শিল্পপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।
জ্বালানি তেলের বাজার নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
তুলনামূলকভাবে ২০২৫ সালে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের গড় দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৬৯ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তেলের দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটতে পারে।
তবে ২০২৭ সালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৯ ডলারে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
তবে এই সম্ভাব্য মূল্যহ্রাস নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আসা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার ওপর।
সংঘাত আরও তীব্র হলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা অনুযায়ী, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
জ্বালানি তেলের পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের বাজার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম গড়ে ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে আরও ৭ শতাংশ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থাৎ দুই বছরের মধ্যে খাদ্যপণ্যের দাম সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে।
খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে কৃষ্ণসাগর দিয়ে খাদ্যশস্য রপ্তানিতে বিঘ্ন, এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব এবং জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য।
কৃষ্ণসাগর আন্তর্জাতিক খাদ্যশস্য পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই অঞ্চলে যুদ্ধ ও অস্থিরতার কারণে পরিবহনব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে গমসহ বিভিন্ন শস্যের সরবরাহ কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে কৃষিকাজে জ্বালানি ও সারের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব উপকরণের দাম বাড়লে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচ খাদ্যপণ্যের বাজারেও প্রভাব ফেলে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক খাদ্যশস্যের বাজারে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের দাম ১৪ শতাংশ বেড়েছে। আগামী ২০২৭ সালে এই দাম আরও ৯ শতাংশ বাড়তে পারে।
এল নিনোর প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন আসে। এর প্রভাবে কোনো অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও খরা দেখা দিতে পারে।
ফলে ধান, গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে, কৃষ্ণসাগর দিয়ে খাদ্যশস্য পরিবহনে বাধা অব্যাহত থাকলে এবং এল নিনোর প্রভাব প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হলে খাদ্যপণ্যের বাজারে নতুন করে বড় চাপ তৈরি হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের উচ্চমূল্যের স্তরকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
শুধু জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে ধাতু ও খনিজের দামও বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ধাতু ও খনিজের গড় দাম গত বছরের তুলনায় ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
এর পেছনে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং ডেটা সেন্টার খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এসব প্রযুক্তি ও শিল্পের জন্য অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের মতো ধাতুর চাহিদা বাড়ছে।
বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো তৈরিতে বিভিন্ন ধাতুর প্রয়োজন হয়। একইভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্লাউড প্রযুক্তির প্রসারের ফলে ডেটা সেন্টার নির্মাণেও বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের চাহিদা তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে সরবরাহের সীমাবদ্ধতা থাকায় বাড়তি চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না উৎপাদন। ফলে ধাতু ও খনিজের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া মূল্যবান ধাতুর দামও ২০২৬ সালে প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্ববাজারে চলতি বছরের মূল্যবৃদ্ধির পর আগামী বছর কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে সামগ্রিক পণ্যমূল্য সূচক ৭ শতাংশ কমতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তের ওপর নির্ভর করছে।
প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বড় আকারে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানির বাধা কমতে হবে। তৃতীয়ত, এল নিনোর কারণে কৃষি উৎপাদনের ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
এই শর্তগুলো পূরণ না হলে পণ্যমূল্য কমার পূর্বাভাস বাস্তবায়িত নাও হতে পারে।
বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে নতুন সংকট তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যপণ্যের বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ অব্যাহত থাকবে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু আমদানি-রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যায়।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি ও শিল্পের খরচ বৃদ্ধি পায়। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে শেষ পর্যন্ত বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। কারণ, তাদের আয়ের বড় অংশই খাবার কেনার পেছনে ব্যয় হয়। খাদ্যের দাম বাড়লে অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে খরচ করার সুযোগ কমে যায়।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের স্তর ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাও তীব্র হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় অর্থায়নের প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান অর্থায়নব্যবস্থার আওতায় ৫০ থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে ২৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের পরিকল্পনা ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি বেসরকারি খাত থেকে আরও বেশি পুঁজি সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের এই অর্থায়ন পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা করা এবং প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে অর্থের জোগান নিশ্চিত করা।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং জলবায়ুর পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। আগামী বছর সামগ্রিক পণ্যমূল্য কমার সম্ভাবনা থাকলেও খাদ্যপণ্যের বাজারে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহ এবং আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির ওপর।



