সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeবিশেষ প্রতিবেদনআধুনিক পরিবহনের ভিড়ে হারাচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি, পদ্মার চরে টিকে আছেন কচুয়ানেরা

আধুনিক পরিবহনের ভিড়ে হারাচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি, পদ্মার চরে টিকে আছেন কচুয়ানেরা

একটি ঘোড়া, কাঠের তৈরি গাড়ি আর চালকের পরিশ্রম—এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল চরাঞ্চলের পণ্য পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থাকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করতেন বহু মানুষ। তাঁদের কাছে ঘোড়ার গাড়ি ছিল পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার অন্যতম অবলম্বন।

একসময় গ্রামবাংলার মেঠোপথে ঘোড়ার গাড়ির চাকা ঘুরত নিয়মিত। কৃষকের মাঠের ফসল পৌঁছে যেত হাটবাজারে, আর এই বাহনকে কেন্দ্র করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন বহু মানুষ। যাত্রী পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষিপণ্য আনা-নেওয়া—সব ক্ষেত্রেই ঘোড়ার গাড়ির ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিক সড়ক, ভ্যান, ট্রাক, পিকআপ ও যন্ত্রচালিত নৌযানের প্রসারে গ্রামবাংলার পরিচিত এই বাহন এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।

তবে পুরোপুরি মুছে যায়নি ঘোড়ার গাড়ির ঐতিহ্য। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চলে এখনো কিছু মানুষ এই বাহনকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন। তাঁদের কাছে ঘোড়ার গাড়ি কেবল জীবিকা নির্বাহের উপায় নয়, বরং অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার একটি মাধ্যম। স্থানীয়ভাবে ঘোড়ার গাড়িচালকদের পরিচিতি রয়েছে ‘কচুয়ান’ নামে।

আধুনিক পরিবহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকা কঠিন হলেও পদ্মার চরের কয়েকজন কচুয়ান এখনো ঘোড়ার গাড়িতে কৃষিপণ্য বহন করেন। তাঁদের হাত ধরেই বেঁচে রয়েছে গ্রামীণ জনপদের পরিবহনব্যবস্থার এক পুরোনো অধ্যায়।

পদ্মার চরে এখনো চলছে ঘোড়ার গাড়ি

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পদ্মার চরাঞ্চল একসময় ঘোড়ার গাড়ির ব্যস্ততায় মুখর থাকত। চরাঞ্চলের মাঠে উৎপাদিত পেঁয়াজ, রসুন, আলু, বেগুন, বাদামসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য এই বাহনে করে পৌঁছে দেওয়া হতো স্থানীয় হাটবাজারে। দুর্গম মেঠোপথ পেরিয়ে ফসল পরিবহনের ক্ষেত্রে ঘোড়ার গাড়ি ছিল কৃষকদের অন্যতম ভরসা।

চরাঞ্চলের অনেক জায়গায় যাতায়াতের উপযোগী সড়ক ছিল সীমিত। নদীপথে পণ্য পরিবহনের জন্যও এখনকার মতো টলারচালিত নৌযানের চলাচল ছিল না। ফলে কৃষকের উৎপাদিত ফসল বাজারে পৌঁছে দিতে ঘোড়ার গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হতো।

একটি ঘোড়া, কাঠের তৈরি গাড়ি আর চালকের পরিশ্রম—এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল চরাঞ্চলের পণ্য পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থাকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করতেন বহু মানুষ। তাঁদের কাছে ঘোড়ার গাড়ি ছিল পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার অন্যতম অবলম্বন।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেছে চরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা। বেড়েছে আধুনিক যানবাহনের ব্যবহার। ফলে আগের মতো ঘোড়ার গাড়ির ব্যস্ততা আর চোখে পড়ে না। এখন হাতে গোনা কয়েকজন চালক এই পেশায় টিকে আছেন।

কেন কমে গেল ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা?

ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং যন্ত্রচালিত পরিবহনের বিস্তার। আগে যে পথে ঘোড়ার গাড়িতে কৃষিপণ্য নিয়ে যেতে হতো, এখন সেখানে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ভ্যান, ট্রাক, পিকআপ ও টলারচালিত নৌকার মতো বাহন কৃষিপণ্য পরিবহনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এসব যানবাহনে তুলনামূলক দ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়া যায়। একই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে বেশি পরিমাণ মালামাল বহন করাও সম্ভব হয়। ফলে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কাছে আধুনিক পরিবহন ক্রমেই বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, ঘোড়ার গাড়ির গতি ও মাল বহনের সক্ষমতা সীমিত। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া এবং বেশি পরিমাণ কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে যন্ত্রচালিত যানবাহনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। এ কারণে ঘোড়ার গাড়ির ওপর নির্ভরশীলতা কমেছে।

চরাঞ্চলের ঘোড়ার গাড়িচালক আঞ্জুম হোসেন, আশরাফুল ও আব্দুস সালামের ভাষ্য অনুযায়ী, যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তনের ফলে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষ জীবিকার পথ বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। প্রায় অর্ধশত মানুষ পুরোনো পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন বলে তাঁরা জানান।

একসময় যে বাহনকে ঘিরে বহু পরিবারের জীবন-জীবিকা চলত, আধুনিক পরিবহনের বিস্তারে সেই বাহন এখন আর আগের মতো আয় এনে দিতে পারছে না। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে ঘোড়ার গাড়ি চালানো পেশা হিসেবে আকর্ষণ হারাচ্ছে।

মানিকের চরে এখনো ভাড়ায় চলে ১০ থেকে ১২টি গাড়ি

ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন কমে গেলেও বাঘা উপজেলার পদ্মার চরাঞ্চলে এই বাহনের অস্তিত্ব এখনো রয়েছে। বিশেষ করে মানিকের চর এলাকায় ভাড়ায় চলাচল করে প্রায় ১০ থেকে ১২টি ঘোড়ার গাড়ি। এসব গাড়িতে কৃষিপণ্য নিয়ে বাঘা থেকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও ভেড়ামারা এলাকার দিকে যাতায়াত করা হয়।

এই গাড়িগুলো চরাঞ্চলের কিছু মানুষের কাছে এখনো প্রয়োজনীয় পরিবহন। সব জায়গায় আধুনিক যানবাহন সহজে চলাচল করতে পারে না। দুর্গম মেঠোপথে কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ঘোড়ার গাড়ি কোনো কোনো পরিস্থিতিতে কাজে আসে। তাই চাহিদা কমে গেলেও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি এই বাহন।

চরাঞ্চলের আশিতিপর বৃদ্ধ ও সাবেক গ্রাম পুলিশ নুরমোহাম্মদ জানান, আগের মতো ঘোড়ার গাড়ি আর দেখা যায় না। তবে একেবারে বিলুপ্তও হয়নি। পুরোনো পেশার প্রতি টান থেকে এখনো প্রায় ১০ থেকে ১২ জন এই বাহন চালিয়ে যাচ্ছেন।

তাঁদের এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পারিবারিক স্মৃতি এবং স্থানীয় জীবনযাত্রার ইতিহাস। আধুনিক পরিবহনের যুগে তাঁদের সংখ্যা কমে এলেও ঐতিহ্যটি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা।

কচুয়ানদের জীবনে ঘোড়ার গাড়ি শুধু পেশা নয়

ঘোড়ার গাড়িচালকদের স্থানীয়ভাবে ‘কচুয়ান’ বলা হয়। একসময় এই পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা। কৃষিপণ্য পরিবহন, হাটবাজারে মাল পৌঁছে দেওয়া এবং দুর্গম পথে যাতায়াতের কাজে তাঁদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

কচুয়ানদের জীবনে ঘোড়ার গাড়ি শুধু একটি বাহন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জীবিকার সংগ্রাম, শ্রম এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের ইতিহাস। ঘোড়ার দেখাশোনা করা, গাড়ি প্রস্তুত রাখা এবং দুর্গম পথে পণ্য পরিবহন—সবকিছুতেই প্রয়োজন হয় পরিশ্রম ও অভিজ্ঞতার।

আগে এই পেশা থেকে বহু মানুষের সংসার চলত। কিন্তু এখন কাজ কমে যাওয়ায় চালকদের আয়ও আগের মতো নেই। যাঁরা অন্য পেশায় চলে গেছেন, তাঁদের জন্য ঘোড়ার গাড়ি ছেড়ে দেওয়া ছিল সময়ের প্রয়োজন। আর যাঁরা এখনো এই পেশায় রয়েছেন, তাঁদের কাছে এটি ঐতিহ্য ও অভ্যাসের পাশাপাশি জীবিকারও একটি মাধ্যম।

তবে শুধু অতীতের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে একটি পেশাকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক সুযোগ। ঘোড়ার গাড়ির ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের অভিজ্ঞতা ও জীবনসংগ্রামকে গুরুত্ব দেওয়াও জরুরি।

রাজশাহী ছাড়াও যেসব এলাকায় ছিল ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন

ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার একসময় শুধু রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পদ্মার চরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাত্রী পরিবহন ও কৃষিপণ্য আনা-নেওয়ার কাজে এই বাহন ব্যবহৃত হতো।

রাজশাহীর পাশাপাশি নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার গোপালপুর ও বিলমাড়িয়া এলাকাতেও একসময় ঘোড়ার গাড়ি নিয়মিত চলাচল করত। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জের যমুনার চরাঞ্চল, পুরান ঢাকা, মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, নওগাঁ, কুষ্টিয়া ও যশোরের বিভিন্ন এলাকায় এই বাহনের প্রচলন ছিল।

গ্রামীণ জনপদে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার ছিল বহুমুখী। কৃষকের মাঠের ফসল বাজারে নিয়ে যাওয়া, ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহন এবং মানুষের যাতায়াত—বিভিন্ন প্রয়োজনে এই বাহন কাজে লাগত। অনেক জায়গায় সড়ক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে ঘোড়ার গাড়িই ছিল নির্ভরযোগ্য পরিবহনমাধ্যম।

অন্যদিকে, পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দৃশ্যের সঙ্গেও ঘোড়ার গাড়ির ইতিহাস জড়িয়ে আছে। একসময় শহরের রাস্তায় এই বাহনের চলাচল ছিল পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু মোটরচালিত যানবাহনের বিস্তার এবং নগরজীবনের পরিবর্তনের ফলে এর ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে।

একইভাবে গ্রামাঞ্চলেও ঘোড়ার গাড়ির জায়গা দখল করেছে আধুনিক পরিবহন। কোথাও কোথাও ঐতিহ্যবাহী বাহনটি এখনো টিকে থাকলেও আগের মতো ব্যাপক ব্যবহার আর নেই।

ঘোড়ার গাড়ির ইতিহাস বহু প্রাচীন

ঘোড়ায় টানা গাড়ি স্থল পরিবহনের ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মোটরগাড়ির ব্যাপক প্রচলনের আগে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ ও পণ্য পরিবহনের জন্য ঘোড়ার গাড়ি এবং নানা ধরনের রথ ব্যবহার করা হতো। সময় ও অঞ্চলভেদে এসব বাহনের নকশা, চাকার সংখ্যা এবং ব্যবহারের ধরন আলাদা ছিল।

প্রাচীন ইউরোপের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে দুই চাকার গাড়ির নমুনা পাওয়া গেছে। ব্রোঞ্জ যুগেও চার চাকার গাড়ির ব্যবহার ছিল বলে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার থেকে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে প্রাচীন রোমে ভ্রমণের জন্য চার চাকার গাড়ি ব্যবহৃত হতো। কিছু গাড়িতে যাত্রার আরাম বাড়াতে বিশেষ ধরনের কাঠামো বা সংযোগব্যবস্থাও ব্যবহার করা হয়েছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে ধারণা পাওয়া যায়।

এশিয়ার বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতাতেও রথ ও ঘোড়ায় টানা গাড়ির ব্যবহার ছিল। সিন্ধু সভ্যতার হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো ও চানহুদারো থেকে এক্কাগাড়ির মতো দেখতে গাড়ির প্রতিরূপ পাওয়া গেছে। প্রাচীন চীনেও রাজপরিবার, শিকার এবং বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক কাজে রথ ব্যবহারের প্রমাণ রয়েছে।

তবে প্রাচীন রথ, সামরিক যান, রাজকীয় গাড়ি এবং বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে ব্যবহৃত কাঠের ঘোড়ার গাড়ি এক ধরনের বাহন নয়। এগুলোর নকশা ও ব্যবহার আলাদা হলেও মানুষের যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনে পশুচালিত গাড়ির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

একসময় যে বাহন ছিল পরিবহনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ, প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তার প্রয়োজনীয়তা কমেছে। বাংলাদেশের পদ্মার চরাঞ্চলের ঘোড়ার গাড়িও সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি স্থানীয় উদাহরণ।

উন্নয়নের সঙ্গে ঐতিহ্য সংরক্ষণও জরুরি

আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা মানুষের জীবন সহজ করেছে। কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে, পরিবহন খরচ ও সময়ের হিসাবেও এসেছে পরিবর্তন। তাই ঘোড়ার গাড়ির পুরোনো ব্যবহার ফিরিয়ে আনার জন্য আধুনিক যানবাহনের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন নেই।

তবে উন্নয়নের ধারায় হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নথিবদ্ধ করে রাখা জরুরি। কারণ ঘোড়ার গাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষকের জীবনযাত্রা, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং বহু মানুষের জীবিকার স্মৃতি।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পদ্মার চরাঞ্চলে এখনো যাঁরা ঘোড়ার গাড়ি চালান, তাঁদের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা যেতে পারে। তাঁদের সাক্ষাৎকার, পুরোনো ছবি, গাড়ির নির্মাণপদ্ধতি এবং এই বাহন ব্যবহারের স্মৃতি সংরক্ষণ করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে, একসময় কীভাবে দুর্গম চরাঞ্চলে কৃষিপণ্য পরিবহন করা হতো।

স্থানীয় ইতিহাসচর্চা, জাদুঘর কিংবা ঐতিহ্যবিষয়ক প্রদর্শনীতেও ঘোড়ার গাড়ির ইতিহাস তুলে ধরা সম্ভব। তবে এমন উদ্যোগ নিতে হলে স্থানীয় মানুষের মতামত এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত চালকদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

ঘোড়ার গাড়ির ঐতিহ্য সংরক্ষণের অর্থ শুধু একটি পুরোনো বাহনকে টিকিয়ে রাখা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবনসংগ্রাম ও গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তনের ইতিহাসকেও ধরে রাখা।

পদ্মার চরে একদিন হয়তো থেমে যাবে ঘোড়ার গাড়ির চাকা

রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরে আমের জন্য পরিচিত। এ অঞ্চলে রয়েছে পুঠিয়া রাজবাড়ি, বাঘার শাহী মসজিদসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা। এসব নিদর্শন রাজশাহীর অতীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে। কিন্তু পদ্মার চর থেকে হাটবাজারে কৃষিপণ্য বহন করা ঘোড়ার গাড়িও এই অঞ্চলের গ্রামীণ জীবনের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আজকের দিনে সেই বাহনের চলাচল অনেকটাই সীমিত। মানিকের চর এলাকায় হাতে গোনা কয়েকটি ঘোড়ার গাড়ি এখনো কৃষিপণ্য পরিবহন করছে। চালকেরা চেষ্টা করছেন পুরোনো পেশাটিকে ধরে রাখতে। কিন্তু আধুনিক যানবাহনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এই বাহনের অস্তিত্ব কতটা টিকে থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

হয়তো একদিন পদ্মার চরাঞ্চলের মেঠোপথে আর ঘোড়ার গাড়ির চাকা ঘুরবে না। থাকবে না কচুয়ানদের নিয়মিত যাতায়াতের পরিচিত দৃশ্য। তখন পুরোনো ছবি, স্থানীয় মানুষের স্মৃতি এবং ইতিহাসের নথিই হয়ে উঠবে এই ঐতিহ্যের সাক্ষী।

তবু যত দিন বাঘার চরাঞ্চলে কয়েকজন কচুয়ান ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন, তত দিন গ্রামবাংলার এই পুরোনো পরিবহনব্যবস্থার গল্পও বেঁচে থাকবে। আধুনিকতার স্রোতে হারিয়ে যেতে বসা ঘোড়ার গাড়ি তাই কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি মানুষের শ্রম, সংগ্রাম এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া গ্রামীণ জীবনেরও প্রতিচ্ছবি।

—সংবাদ সংস্থার সাহায্য নিয়ে লেখা

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ