এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাবে দেশের অর্থনীতিতে চাপ সামলাতে রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু তাঁর এই উদ্যোগ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। একদিকে জ্বালানির দাম কমানোর যুক্তি তুলে ধরছে ট্রাম্প প্রশাসন, অন্যদিকে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলের একাধিক আইনপ্রণেতা।
সমালোচকদের দাবি, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক অভিযান চলাকালে মস্কোকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। তাঁদের মতে, রাশিয়ার জ্বালানি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পেছনে যে উদ্দেশ্য ছিল, নতুন এই সিদ্ধান্ত তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে জ্বালানির বাজার সামলাতে ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে রাশিয়া তিন লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর পর্যায়ক্রমে আরও বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।
ট্রাম্পের ঘোষণায় বলা হয়েছে, প্রথম দফার সরবরাহের পর নভেম্বর মাসে আরও পাঁচ লাখ টন ডিজেল পাঠাতে পারে রাশিয়া। পরবর্তী পর্যায়ে সরবরাহের পরিমাণ বাড়িয়ে ১০ লাখ টন করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে আরও ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কত দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে রাশিয়ার উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতার ওপর।
ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে রাশিয়ার একাধিক তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দেশটির উৎপাদনব্যবস্থা কতটা দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। রাশিয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিশ্রুত ডিজেল সরবরাহ করতে পারবে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসকে জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে ডিজেল রপ্তানির পরিমাণ প্রতি মাসে ৩০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উৎপাদন পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংক্রান্ত বিধিনিষেধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ডিজেল আমদানির পরিকল্পনার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ট্রাম্প জানিয়েছেন, মার্কিন নাগরিকদের জন্য জ্বালানির দাম কমানো তাঁর অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। বিশেষ করে কৃষক, পশুপালক এবং ট্রাকচালকদের ওপর জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমাতে চান তিনি।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, আমেরিকানদের জন্য জ্বালানির দাম কমানো, বিশেষ করে কৃষক, পশুপালক ও ট্রাকচালকদের সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলোর একটি।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি ও পরিবহণ খাতে ডিজেলের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিকাজে ব্যবহৃত ট্র্যাক্টর, ফসল কাটার যন্ত্র, পণ্যবাহী ট্রাক এবং বিভিন্ন শিল্পযানে এই জ্বালানি প্রয়োজন হয়। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহণের খরচও বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব পড়তে পারে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও।
এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানি করে সরবরাহ বাড়ানো গেলে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে বলে আশা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে আমদানির পরিমাণ, পরিবহণ খরচ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনা না করে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনা নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ঘিরে। কারণ, মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও গ্যাস কেনে এমন দেশগুলোর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের অনুমোদন দিয়ে একটি আইনে স্বাক্ষর করেছিলেন তিনি।
অথচ এখন জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়ায় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধীদের বক্তব্য, একদিকে মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির পথ সহজ করে দেওয়া হচ্ছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির অংশ হিসেবে আগামী ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে মার্কিন ব্যাংকে থাকা রাশিয়ার সম্পদসহ অন্যান্য সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ, এই সিদ্ধান্তের ফলে রাশিয়ার ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে না। বরং নির্দিষ্ট জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে এই ছাড়ের আইনি ভিত্তি এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েই এখন বিতর্ক তীব্র হচ্ছে।
রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনার বিরোধিতা করে সাতজন মার্কিন সিনেটর যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চারজন রিপাবলিকান এবং তিনজন ডেমোক্র্যাট। তাঁরা দাবি করেছেন, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাই ট্রাম্পকে তাঁর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স, লিসা মারকাউস্কি, থম টিলিস ও জন কার্টিস। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে রয়েছেন জিন শাহিন, রিচার্ড ব্লুমেনথাল ও রন ওয়াইডেন।
সিনেটরদের বক্তব্য, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক অভিযান চলাকালে মস্কোকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁদের মতে, রাশিয়ার জ্বালানি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্দেশ্য ছিল দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অর্থের জোগান সীমিত করা।
বিবৃতিতে তাঁরা আরও উল্লেখ করেছেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের জন্য যেন মার্কিন অর্থ পরোক্ষভাবে ব্যবহৃত না হয়, সেই লক্ষ্যেই ২০২২ সালে কংগ্রেস রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল।
তবে এই অভিযোগের চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি হয়েছে, এমন তথ্য নেই। ফলে চুক্তিটি সরাসরি আইন লঙ্ঘন করছে কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন, নিষেধাজ্ঞার শর্ত এবং প্রশাসনের দেওয়া ছাড়ের বৈধতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা অবশ্য ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরোধিতা করছেন না। রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা টমাস ম্যাসি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সব ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই জ্বালানির দাম কমানোর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব। যাঁরা বলছেন, বর্তমান আইনের মধ্যে থেকে এই চুক্তি করা যাবে না, তাঁদের বক্তব্যও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রশাসনের যুক্তি, দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানো এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমানো এখন জরুরি। তবে সমালোচকদের মতে, স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত লক্ষ্য দুর্বল করা ঠিক হবে না।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সংঘাতের প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিভিন্ন দেশে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে।
অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করেই পেট্রোল, ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি তৈরি করা হয়। তাই তেলের সরবরাহ কমে গেলে বা পরিবহণব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে পরিশোধিত জ্বালানির বাজারেও তার প্রভাব পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষি, পণ্য পরিবহণ এবং শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। কৃষকদের বেশি অর্থ খরচ করে যন্ত্রপাতি চালাতে হয়। ট্রাকচালকদের পণ্য পরিবহণে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়। ব্যবসায়ীরাও সেই বাড়তি খরচের একটি অংশ পণ্যের দামে যুক্ত করতে পারেন।
ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু গাড়িচালকদের সমস্যা নয়। এর প্রভাব খাদ্যপণ্য, পরিবহণ এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়েও পড়তে পারে।
মার্কিন অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন বা এএএ-এর উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৬.২৮ ডলারে পৌঁছেছিল। এর আগে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দাম বেড়ে প্রতি গ্যালন ৬.৫৩ ডলারে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে দাম কিছুটা কমলেও তা এখনও উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে।
এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, ডিজেলের দাম প্রতিদিন একই থাকে না। অঞ্চল, সরবরাহব্যবস্থা, কর এবং বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী দামে পার্থক্য হতে পারে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপ্রধান রাজ্যগুলোতে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বেশি অনুভূত হচ্ছে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রপাতি চালানো এবং উৎপাদিত ফসল বাজারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কৃষকদের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচও বাড়ে।
আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকান পার্টির হাতে থাকবে কি না, তা নির্ধারিত হবে। ফলে নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানোর বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অর্থনৈতিক প্রশ্নের পাশাপাশি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জেও পরিণত হয়েছে।
প্রকাশিত জনমত জরিপে অর্থনীতি ও ইরান যুদ্ধ মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারা তাঁর দলের নির্বাচনী সম্ভাবনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেলের বাজারে কতটা প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, দেশটিতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে কয়েক লাখ টন ডিজেল আমদানি করলেই সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতি পুরোপুরি মিটে যাবে, এমনটা নিশ্চিত নয়।
রাশিয়া যদি প্রথম পর্যায়ে তিন লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করে, তা বাজারে অতিরিক্ত জ্বালানি যোগ করবে। কিন্তু এর প্রভাব নির্ভর করবে আমদানির সময়, সরবরাহের ধারাবাহিকতা, পরিবহণ খরচ এবং অন্যান্য উৎস থেকে জ্বালানি পাওয়ার পরিস্থিতির ওপর।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম, শোধনাগারের উৎপাদন এবং পরিবহণব্যবস্থার পরিবর্তনও ডিজেলের মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করলেই মার্কিন ভোক্তারা দ্রুত ও উল্লেখযোগ্যভাবে কম দামে ডিজেল পাবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ট্রাম্পের রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা নিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও সমালোচনা শুরু হয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং-সহ কয়েকজন নেতা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমালোচকদের বক্তব্য, রাশিয়ার ওপর চাপ বজায় রাখা এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করাই এখন আন্তর্জাতিক মিত্রদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তাঁদের আশঙ্কা, জ্বালানি রপ্তানির সুযোগ বাড়লে রাশিয়া অতিরিক্ত রাজস্ব পেতে পারে, যা দেশটির অর্থনীতিকে সহায়তা করবে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, রাশিয়াকে ডিজেল রপ্তানির সুযোগ দেওয়া প্রেসিডেন্ট পুতিনের জন্য এক ধরনের পুরস্কার। তিনি মনে করেন, যুদ্ধ বন্ধে মস্কোর ওপর চাপ বাড়ানো প্রয়োজন, আর এমন চুক্তি সেই প্রচেষ্টাকে দুর্বল করতে পারে।
এদিকে, রবিবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন একটি ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’তে পৌঁছেছে। তবে এই যুদ্ধবিরতির শর্ত, কার্যকারিতা কিংবা বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
জেলেনস্কি এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু মস্কোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করা বা জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার মতো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে দুই পক্ষের সম্মতি, যুদ্ধবিরতির শর্ত এবং তা কতটা কার্যকরভাবে পালন করা হচ্ছে, তার ওপরই এমন উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে।
রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে একটি কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন তুলে ধরেছে। একদিকে মার্কিন নাগরিকদের জ্বালানির খরচ কমানো এবং কৃষি ও পরিবহণ খাতকে স্বস্তি দেওয়া জরুরি। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে কতটা পূরণ করা সম্ভব, তা নির্ভর করবে চুক্তির আইনি ভিত্তি, রাশিয়ার সরবরাহ সক্ষমতা এবং বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির ওপর। পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিজেল এলেও তার ফলে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের খরচ কতটা কমবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির উদ্যোগ আপাতত ট্রাম্পের জন্য একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কৌশল ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানির দাম কমাতে এই পরিকল্পনা কতটা সফল হয় এবং রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক কীভাবে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।



