এনবি সংবাদ, অনলাইন : ১৯০১ সাল থেকে বৃষ্টিপাতের হিসাব রাখা শুরু হওয়ার পর এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। বর্ষাকালে এবার উত্তর-পূর্ব ভারত যে পরিমাণ বৃষ্টি পেয়েছে, তা গত ১২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। সাধারণত দেশের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই এলাকাতেই এবার দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো ছবি।
ভারতের এবারের বর্ষায় সামগ্রিক ভাবে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কম হয়েছে। বর্ষা শুরুর আগেই সেই সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল আবহাওয়া দফতর। পরে মৌসুম শেষে দেখা গেল, দেশের সব অঞ্চলের পরিস্থিতি এক রকম ছিল না। কোথাও বৃষ্টির ঘাটতি তুলনামূলক কম, আবার কোথাও ঘাটতি ছিল যথেষ্ট বেশি।
পশ্চিমবঙ্গ-সহ ভারতের কয়েকটি অঞ্চলে বর্ষাকালে মোটামুটি ভালো বৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু দেশের দক্ষিণ, পূর্ব এবং বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব অংশে বৃষ্টির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। সবচেয়ে বড় নজির তৈরি হয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতে।
উত্তর-পূর্ব ভারত সাধারণত বর্ষার সময় প্রবল বৃষ্টির জন্য পরিচিত। কিন্তু এবার সেই অঞ্চলেই এমন বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা গত ১২৫ বছরের রেকর্ডে নজিরবিহীন।
আবহবিদেরা ১৯০১ সাল থেকে পাওয়া বৃষ্টিপাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, চলতি বছরের বর্ষায় উত্তর-পূর্ব ভারত সবচেয়ে কম বৃষ্টি পেয়েছে। অর্থাৎ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যে তথ্য সংরক্ষিত হয়েছে, তার মধ্যে এবারের বর্ষাই সবচেয়ে শুষ্ক হয়ে উঠেছে এই অঞ্চলের জন্য।
ঘটনাটি তাই আবহবিদদের কাছেও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে অঞ্চলকে সাধারণত বর্ষার প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত করা হয়, সেখানেই এবার দেখা গেল দীর্ঘমেয়াদি রেকর্ডের সবচেয়ে বড় ঘাটতি।
উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যকে একসঙ্গে প্রায়ই ‘সেভেন সিস্টার্স’ বা ‘সাত বোন’ বলা হয়। এই সাত রাজ্য হল অসম, অরুণাচল প্রদেশ, মেঘালয়, মিজোরাম, ত্রিপুরা, মণিপুর এবং নাগাল্যান্ড।
ভৌগোলিক অবস্থান, পাহাড়ি এলাকা এবং বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই অঞ্চলে বর্ষাকালে সাধারণত প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।
বিশেষ করে মেঘালয়ের নাম এলেই বৃষ্টির কথা মনে পড়ে। চেরাপুঞ্জি এবং মৌসিনরাম বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিবহুল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। বছরের বড় সময় জুড়েই সেখানে বৃষ্টির প্রভাব দেখা যায়।
কিন্তু সেই মেঘালয়-সহ গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতে এবার বর্ষার চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
উত্তর-পূর্ব ভারতের বৃষ্টির ঘাটতির ক্ষেত্রে বিশেষ নজর রয়েছে অসম, অরুণাচল প্রদেশ এবং মেঘালয়ের দিকে। এই তিন রাজ্যেই সাধারণত বর্ষাকালে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টি হয়।
এবার সেখানে বৃষ্টির পরিমাণ কমে যাওয়ায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ উত্তর-পূর্ব ভারতের আবহাওয়া শুধু ওই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত নয়, কৃষি, নদী, বনাঞ্চল এবং জলসম্পদের উপরও এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে।
বর্ষায় পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে কৃষিকাজে সমস্যা তৈরি হতে পারে। নদী ও জলাধারে পানির পরিমাণ কমে যেতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলে স্বাভাবিক জলচক্রের উপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
চেরাপুঞ্জি এবং মৌসিনরামের নাম ভারত তথা বিশ্বের বৃষ্টিপাতের আলোচনায় বারবার উঠে আসে। অতিবৃষ্টির জন্য বিখ্যাত এই অঞ্চলের অবস্থান মেঘালয়ে।
তাই উত্তর-পূর্ব ভারতে যখন বর্ষার বৃষ্টিতে এত বড় ঘাটতির কথা সামনে এসেছে, তখন মেঘালয়ের প্রসঙ্গও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একদিকে বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল অঞ্চলগুলির একটি এই রাজ্যে, অন্যদিকে একই রাজ্য বৃহত্তর উত্তর-পূর্ব ভারতের সেই অঞ্চলের অংশ, যেখানে এবার ১২৫ বছরের মধ্যে বর্ষাকালে সবচেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে। এই বৈপরীত্যই এবারের বর্ষার আবহাওয়াকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
এবারের বর্ষায় ভারতের সব অঞ্চলে সমান পরিমাণ বৃষ্টি হয়নি। উত্তর-পূর্ব ভারতের পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের কিছু অংশেও বৃষ্টিপাতের ঘাটতি দেখা গেছে।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ-সহ কিছু এলাকায় তুলনামূলক ভাবে ভালো বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে গোটা দেশের গড় বৃষ্টিপাতের পরিসংখ্যান দিয়ে প্রতিটি অঞ্চলের পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়।
একটি অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলেও অন্য অঞ্চলে ঘাটতি থাকতে পারে। তাই বর্ষার সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণের সময় আঞ্চলিক তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনীতি ও পরিবেশ অনেকটাই মৌসুমি বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল। কৃষি থেকে শুরু করে পানীয় জল, নদী ও জলাভূমি—সব ক্ষেত্রেই বর্ষার বৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
একটি নির্দিষ্ট বছরে বৃষ্টির ঘাটতি থাকলেই দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। তবে এত দীর্ঘ সময়ের রেকর্ডে এমন ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি দেখা গেলে তা আবহবিদদের কাছে অবশ্যই গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো অতিবৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চলে বৃষ্টির ধরনে বড় পরিবর্তন হলে তার কারণ, স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে আরও বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়।
ভারতের বর্ষা মানেই কোথাও প্রবল বৃষ্টি, কোথাও বন্যা, আবার কোথাও বৃষ্টির অপেক্ষা। কিন্তু উত্তর-পূর্ব ভারতের ক্ষেত্রে সাধারণ ধারণা হল—বর্ষায় সেখানে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে।
এবার সেই পরিচিত ছবিই বদলে গেল। ১৯০১ সাল থেকে সংরক্ষিত তথ্যের ভিত্তিতে উত্তর-পূর্ব ভারত এমন এক বর্ষা দেখল, যেখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ গত ১২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।
চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরামের মতো অতিবৃষ্টির জন্য পরিচিত অঞ্চল যে বৃহত্তর উত্তর-পূর্ব ভারতের অংশ, সেই অঞ্চলের এমন ব্যতিক্রমী বর্ষা তাই শুধু একটি আবহাওয়ার খবর নয়। এটি ভারতের মৌসুমি বৃষ্টির বৈচিত্র্য এবং পরিবর্তনশীলতারও একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।



