ভারতীয় ক্রিকেট দলের ঠাসা সূচি নিয়ে ফের সামনে এল অসন্তোষ। একের পর এক সিরিজ, ম্যাচের পর ম্যাচ—এর মাঝে পর্যাপ্ত অনুশীলন ও প্রস্তুতির সুযোগ পাচ্ছেন না ক্রিকেটাররা। এবার সেই সমস্যার কথা প্রকাশ্যে আনলেন টিম ইন্ডিয়ার উইকেটরক্ষক-ব্যাটার সঞ্জু স্যামসন। সরাসরি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিসিআই) আক্রমণ না করলেও তাঁর মন্তব্যে স্পষ্ট, বর্তমান সূচি নিয়ে সন্তুষ্ট নন ক্রিকেটারদের একাংশ।
বেঙ্গালুরুতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে বৃষ্টিতে ম্যাচ ভেস্তে যাওয়ার পর সম্প্রচারকারী সংস্থার সাক্ষাৎকারে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান সঞ্জু। সেই সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করেন ভারতীয় দলের স্পিনার যুজবেন্দ্র চাহাল। সেখানেই স্যামসন বুঝিয়ে দেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচির কারণে প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দলগুলিকে একের পর এক সিরিজ খেলতে হচ্ছে। টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-২০—তিন ফরম্যাটেই নিয়মিত মাঠে নামতে হচ্ছে ক্রিকেটারদের। ফলে ম্যাচের প্রস্তুতি, বিশ্রাম এবং নিজেদের খেলার ভুলত্রুটি শুধরে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
সঞ্জু স্যামসনের বক্তব্যেও উঠে এসেছে সেই সমস্যার কথা। তাঁর মতে, বর্তমান ক্রিকেট সূচিতে প্রস্তুতি ও অনুশীলনের জন্য আলাদা করে সময় বের করা সহজ নয়। এমন পরিস্থিতিতে মাঠে নেমে নিজেদের অভিজ্ঞতার উপরই বেশি নির্ভর করতে হয় ক্রিকেটারদের।
সঞ্জুর কথায়, এখনকার দিনে যেভাবে ক্রিকেটের সূচি তৈরি করা হয়, তাতে প্রস্তুতি নেওয়া কিংবা অনুশীলনের সুযোগ বিশেষ থাকে না। তাই মানসিকভাবে প্রস্তুত থেকে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। হাতের কাছে যে সুযোগ পাওয়া যায়, সেটাকেই কাজে লাগানোই হয়ে ওঠে ক্রিকেটারদের প্রধান লক্ষ্য।
তাঁর এই মন্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত ক্রীড়াসূচির মধ্যে খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি ও বিশ্রামের জন্য যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি না।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ শেষ করেই নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা ভারতীয় দলের। ফলে একটি সিরিজের ধকল কাটিয়ে পরের সিরিজের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করার সময় খুবই সীমিত। সঞ্জু স্যামসনের বক্তব্য অনুযায়ী, নিউজিল্যান্ডে পৌঁছনোর পর অনুশীলনের জন্য কার্যত এক দিনই পাওয়া যাবে। তার পরের দিনই মাঠে নামতে হবে দলকে।
এই অল্প সময়ে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, উইকেটের চরিত্র বোঝা এবং ম্যাচের পরিকল্পনা তৈরি করা যে সহজ নয়, তা বলাই বাহুল্য। বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে খেলতে গেলে আবহাওয়া, পিচ এবং মাঠের পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সঞ্জু জানান, দল নিউজিল্যান্ডে পৌঁছবে ২০ তারিখ। ২১ তারিখ অনুশীলনের সুযোগ রয়েছে। এরপরের দিনই ম্যাচ। অর্থাৎ, সফরের শুরুতেই প্রস্তুতির জন্য হাতে থাকবে অত্যন্ত সীমিত সময়।
তবে পরিস্থিতি কঠিন হলেও অভিজ্ঞতার উপর ভরসা রাখছেন ভারতীয় উইকেটরক্ষক। তাঁর মতে, এমন সময়ে আগের ম্যাচগুলিতে অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং পরিস্থিতি বুঝে খেলার দক্ষতাই সবচেয়ে বেশি কাজে আসে। পরিস্থিতি অনুযায়ী যা প্রয়োজন, সেটাই করার চেষ্টা করবেন তাঁরা।
সঞ্জু স্যামসন সরাসরি বিসিসিআইয়ের নাম করে অভিযোগ করেননি। তবে তাঁর বক্তব্যে ভারতীয় ক্রিকেটের বর্তমান সূচি নিয়ে অসন্তোষের ইঙ্গিত স্পষ্ট। কারণ, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভালো পারফরম্যান্সের জন্য শুধু প্রতিভা বা অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিকল্পিত প্রস্তুতি, অনুশীলন এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সতেজ থাকার সুযোগও।
একটি সিরিজ শেষ হওয়ার পরপরই অন্য সিরিজে নামতে হলে ক্রিকেটারদের পক্ষে নিজেদের খেলার বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা কাটানো, বোলিংয়ের পরিকল্পনা ঠিক করা কিংবা দলের কৌশল নিয়ে আলাদা করে অনুশীলনের সুযোগ কমে যায়।
বিশেষ করে যারা তিন ফরম্যাটেই খেলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে চাপ আরও বেশি। টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘ সময়ের লড়াইয়ের পর ওয়ানডে কিংবা টি-২০ ক্রিকেটের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে হয়। প্রতিটি ফরম্যাটের আলাদা চাহিদা থাকায় দ্রুত মানিয়ে নেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ।
সঞ্জুর মন্তব্য তাই শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা নয়, বরং আধুনিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচি নিয়ে বৃহত্তর আলোচনারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভারতীয় দলের সামনে শুধু নিউজিল্যান্ড সফরই নয়, রয়েছে আরও একাধিক আন্তর্জাতিক সিরিজ। নিউজিল্যান্ডে তিন ফরম্যাটে খেলার পর দেশের মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে সিরিজ রয়েছে। এরপর জিম্বাবোয়ে এবং অস্ট্রেলিয়ার ভারত সফরের সূচিও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একের পর এক সিরিজের এই চাপ সামলাতে গিয়ে ক্রিকেটারদের বিশ্রাম ও প্রস্তুতির সময় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নিয়মিত ম্যাচ খেলা জরুরি হলেও অতিরিক্ত ব্যস্ত সূচি খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি বাড়াতে পারে।
দীর্ঘ মরশুমে পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পেলে চোটের ঝুঁকি, পারফরম্যান্সে ওঠানামা এবং মানসিক অবসাদের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তাই ক্রিকেটারদের কাজের চাপ সামলাতে সূচি তৈরির সময় ম্যাচের সংখ্যা, যাতায়াত, অনুশীলন এবং বিশ্রামের মধ্যে ভারসাম্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যস্ত সূচি নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও সঞ্জু স্যামসন বুঝিয়ে দিয়েছেন, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই মাঠে নামতে হবে ভারতীয় দলকে। সীমিত প্রস্তুতির সময়কে কাজে লাগিয়ে অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তার উপর নির্ভর করাই তাঁদের পথ।
তবে তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন—আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাফল্যের জন্য ক্রিকেটারদের কি পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে? একের পর এক সিরিজ আয়োজনের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের বিশ্রাম এবং অনুশীলনের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
সঞ্জুর মন্তব্যের পর ভারতীয় দলের ঠাসা সূচি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হতে পারে। কারণ, ক্রিকেটারদের কাছ থেকে ধারাবাহিকভাবে সেরা পারফরম্যান্স প্রত্যাশা করা হলে তাঁদের প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।



