এনবি সংবাদ, অনলাইন : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা স্মৃতিস্তম্ভ, ভাস্কর্য, স্মারক, জাদুঘর ও মুক্তিযুদ্ধের নানা স্থাপনাও সেই ইতিহাসের দৃশ্যমান সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু এসব স্থাপনা বারবার ভাঙচুর, অবমাননা কিংবা অযত্নের শিকার হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো কতটা নিরাপদ?
ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা ঝোলানোর সাম্প্রতিক ঘটনা সেই প্রশ্নই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় নির্মাণাধীন ভাস্কর্যটির মাথায় জুতার মালা ঝোলানো অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয়রা। পরে ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
ঘটনার পর ভাস্কর্য থেকে জুতার মালা সরিয়ে ফেলা হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি বৈঠক করে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে আব্দুর রহমান ওরফে সম্রাট নামে এক ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেপ্তার করার কথা জানায় পুলিশ। তবে কেন তিনি এই কাজ করেছেন এবং এর পেছনে অন্য কেউ ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার সড়কদ্বীপে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে নির্মাণাধীন ভাস্কর্য রয়েছে। মঙ্গলবার সকালে বা দুপুরের দিকে স্থানীয়দের নজরে আসে, ভাস্কর্যের মাথায় জুতার মালা ঝোলানো।
এর কিছু ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। পরে ঘটনাস্থলে যান মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তারা। ভাস্কর্য থেকে জুতার মালা সরিয়ে ফেলা হয়।
জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে এ নিয়ে জরুরি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয় এবং ঘটনার তদন্তে কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে আব্দুর রহমান ওরফে সম্রাটকে শনাক্ত করা হয়। পরে ঝিনাইদহের কাঞ্চননগর এলাকা থেকে তাকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার পেছনে তার উদ্দেশ্য কী ছিল, অন্য কেউ জড়িত কি না এবং এর সঙ্গে কোনো সংগঠিত কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায়।
অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত একজনকে আইনের আওতায় আনা হলেও ঘটনার পূর্ণ কারণ স্পষ্ট নয়। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতার জন্য তিনি দেশের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ লাভ করেন।
তাই তাঁর নামে নির্মিত কোনো স্মারক বা ভাস্কর্যের অবমাননা কেবল একটি স্থাপনার ক্ষতি হিসেবে দেখলে বিষয়টির পুরো গুরুত্ব ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, শহীদদের স্মৃতি এবং জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
তবে একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কেন তারা তা করেছে, সেটি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি বা ভিডিও দেখে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে দায়ী করার আগে পুলিশের তদন্তের ফল জানা প্রয়োজন।
ঝিনাইদহের এই ভাস্কর্যটি নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, গত দুই বছরের বেশি সময়ে এটি একাধিকবার ভাঙচুর কিংবা অবমাননার শিকার হয়েছে।
সর্বশেষ জুতার মালা ঝোলানোর ঘটনার আগে ভাস্কর্যটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছিল। এ কারণে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, বারবার ঘটনা ঘটার পরও কেন স্থাপনাটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না?
আরও একটি বিষয় নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। ভাস্কর্যটি নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকায় এর চারপাশে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা রয়েছে, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্মৃতিচিহ্ন যদি দীর্ঘ সময় নির্মাণাধীন বা সংস্কারাধীন থাকে এবং সেখানে নিয়মিত নজরদারি না থাকে, তাহলে সেটি দুর্বৃত্তদের জন্য সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা সামনে আসে।
সে সময় শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ও বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্নের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, ম্যুরাল এবং বীরশ্রেষ্ঠদের স্মৃতিফলকও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
এসব ঘটনার সঠিক সংখ্যা নিয়ে সরকারি পর্যায়ে একটি পূর্ণাঙ্গ হিসাব সবসময় সামনে আসেনি। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুলসংখ্যক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় অনেক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরে সেগুলো পুনর্নির্মাণ বা সংস্কারের প্রশ্নটি সামনে আসে। কিন্তু বাস্তবে সব স্থাপনা সমানভাবে সংস্কারের আওতায় এসেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রথম সরকার এখানে শপথ নিয়েছিল। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ স্থানের গুরুত্ব আলাদা।
কিন্তু অতীতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সংস্কারকাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর মধ্যে এমন কোনো স্থান যদি দীর্ঘদিন ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে থাকে, তাহলে তা শুধু অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, জাতীয় স্মৃতি সংরক্ষণের বিষয়ও হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন আহমেদ আযম খান। সরকারি ওয়েবসাইটেও তাঁকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক কার্যক্রমেও মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর কল্যাণ নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে।
মন্ত্রী আহমেদ আযম খানও বিভিন্ন স্থাপনা সংস্কারের বিষয়ে সরকারের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। চট্টগ্রামের জিয়া স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনের সময় সেটি সংস্কার করে দ্রুত জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
তবে একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—আগে ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা কী, কোন স্থাপনা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত, কোনটির সংস্কার কখন হবে এবং এসব স্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ মানে শুধু ভেঙে যাওয়া অংশ আবার তৈরি করা নয়। এর সঙ্গে রয়েছে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সিসিটিভি নজরদারি, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, নিরাপত্তাকর্মী এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি।
বিশেষ করে যেসব ভাস্কর্য বা স্মৃতিস্তম্ভ জনবহুল সড়ক, বাস টার্মিনাল কিংবা উন্মুক্ত এলাকায় রয়েছে, সেগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
একই স্থাপনায় বারবার হামলা হলে শুধু প্রতিবার ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কীভাবে হামলা হচ্ছে, কোথায় নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে এবং ঘটনার পর অপরাধীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া কঠিন। কোনো ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তিগত উচ্ছৃঙ্খলতা হতে পারে, কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে, আবার কোনো ঘটনা পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টাও হতে পারে।
ঝিনাইদহের সর্বশেষ ঘটনার ক্ষেত্রেও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। পুলিশ একজনকে আটক করেছে এবং তার উদ্দেশ্য ও অন্য কারও সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখছে।
তবে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর বা অবমাননার ঘটনা ঘটলে একটি বিষয় স্পষ্ট—শুধু ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়। আগে থেকেই এসব স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য দীর্ঘদিনের। ইতিহাসের ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্নকে ঘিরে মতভেদও রয়েছে।
কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া মানুষ এবং বীরশ্রেষ্ঠদের স্মৃতি জাতীয় ইতিহাসের অংশ। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও তাঁদের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের বিষয়ে একটি ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা সম্ভব কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ঝিনাইদহের হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা দেওয়ার ঘটনা সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
সর্বশেষ ঘটনায় পুলিশ একজনকে আটক করেছে। এখন তদন্তে বেরিয়ে আসা দরকার, তিনি একাই এই কাজ করেছেন কি না, এর পেছনে কোনো প্ররোচনা ছিল কি না এবং কেন এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছিল।
একই সঙ্গে প্রশাসনের দায়িত্ব হবে ভাস্কর্যটির স্থায়ী সংস্কার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারণ একটি স্মৃতিস্তম্ভ বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও যদি একই পরিস্থিতি ফিরে আসে, তাহলে শুধু অপরাধী আটক করলেই সমস্যার সমাধান হয় না।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন দেশের ইতিহাসের দৃশ্যমান দলিল। এগুলো রক্ষা করা শুধু একটি মন্ত্রণালয়, প্রশাসন বা রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব নয়। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন, সংস্কৃতিকর্মী, ইতিহাসবিদ এবং নাগরিক সমাজেরও ভূমিকা রয়েছে।
ঝিনাইদহের সাম্প্রতিক ঘটনা তাই একটি ভাস্কর্যে জুতার মালা ঝোলানোর ঘটনা হিসেবে থেমে থাকলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশ তার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কতটা যত্নে সংরক্ষণ করছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সেই ইতিহাস কীভাবে পৌঁছে দেবে?



