নিজস্ব প্রতিবেদক, এনবি সংবাদ : যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যাতায়াতের ভোগান্তি কমাতে মেহেরুল্লানগর স্টেশনে দূরপাল্লার আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতির দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ বিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠিও পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কাছেই মেহেরুল্লানগর রেলস্টেশন। কিন্তু সেখানে বর্তমানে কোনো আন্তঃনগর ট্রেনের নিয়মিত যাত্রাবিরতি নেই। ফলে ট্রেনে যাতায়াত করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরের যশোর জংশনে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি বিশেষ করে রাতে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয় বলে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
যশোর শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে যশোর-চৌগাছা সড়কের আমবটতলা এলাকায় অবস্থিত যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষা ও গবেষণায় কার্যক্রম চালিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৮টি বিভাগ, আটটি অনুষদ, দুটি ইনস্টিটিউট, ছয়টি আবাসিক হল ও ২৪টি দপ্তর রয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে। ক্যাম্পাসে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন।
এই বিশাল বিশ্ববিদ্যালয় কমিউনিটির দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম বাস ও রেল যোগাযোগ। কিন্তু রেলপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে মেহেরুল্লানগর স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেন না থামায়।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে মেহেরুল্লানগর স্টেশনের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। বিপরীতে যশোর জংশনের দূরত্ব প্রায় ১৩ কিলোমিটার। ফলে কাছের স্টেশন ব্যবহার করার সুযোগ না থাকায় শিক্ষার্থী ও অন্যদের দূরের জংশনে যেতে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেন। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য সমস্যাটি আরও স্পষ্ট বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রেনে বাড়ি ফিরতে হলে তাদের আগে যশোর জংশনে যেতে হয়। এরপর সেখান থেকে ট্রেনে উঠে অনেক ক্ষেত্রে এমন পথে যেতে হয়, যা ক্যাম্পাসের অবস্থানের তুলনায় ঘুরপথ তৈরি করে। ফলে যাতায়াতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ক্যাম্পাসের এত কাছাকাছি একটি রেলস্টেশন থাকা সত্ত্বেও সেটি আন্তঃনগর ট্রেনের জন্য ব্যবহার করতে না পারায় শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
দিনের বেলায় কোনোভাবে যশোর জংশনে যাওয়া সম্ভব হলেও রাতে সমস্যাটি আরও বেশি প্রকট হয় বলে জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে ক্লাস, গবেষণা, ল্যাবের কাজ কিংবা অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রমের জন্য রাত পর্যন্ত ক্যাম্পাসে থাকতে হয়। কাজ শেষে ট্রেন ধরতে যশোর জংশনে যাওয়ার প্রয়োজন হলে তখন পর্যাপ্ত যানবাহন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে বলে তাদের অভিযোগ।
বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীসহ রাতে যাতায়াতকারীদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্যাম্পাসের কাছেই মেহেরুল্লানগর স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি চালু হলে এ ধরনের সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব হতে পারে।
যশোর জংশনে যাতায়াতের জন্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত যানবাহন ব্যবহার করতে হয়। এতে রেলভাড়ার পাশাপাশি ক্যাম্পাস থেকে জংশন পর্যন্ত যাতায়াতের খরচও যুক্ত হয়।
শিক্ষকদের ভাষ্য, গবেষণার কাজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য দায়িত্ব শেষ করে রাতে জংশনে যেতে হলে গাড়ি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহনপুলের গাড়ি ব্যবহার করা গেলেও এতে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় হয়।
তাদের মতে, মেহেরুল্লানগর স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি চালু হলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সময় ও ব্যয়ের চাপ কমতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আশপাশের এলাকার মানুষও উপকৃত হতে পারেন।
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের এই সমস্যার কথা বিবেচনা করে মেহেরুল্লানগর স্টেশনে দূরপাল্লার আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতির দাবি জানিয়েছে যবিপ্রবি প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কমিউনিটির যাতায়াতের সমস্যা বিবেচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা করছে প্রশাসন।
উপাচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, মেহেরুল্লানগর স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি চালু হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ পুরো বিশ্ববিদ্যালয় কমিউনিটির যাতায়াত অনেক সহজ হবে।
বর্তমানে মেহেরুল্লানগর স্টেশনে একটি মেইল ট্রেন থামে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে দূরপাল্লার আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি না থাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই স্টেশন শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটাতে পারছে না।
ফলে আন্তঃনগর ট্রেনে যাতায়াতের জন্য তাদের যশোর জংশনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, মেহেরুল্লানগর স্টেশনে অন্তত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি দেওয়া হলে তারা সরাসরি কাছের স্টেশন থেকেই ট্রেনে উঠতে ও নামতে পারবেন। এতে যশোর জংশন পর্যন্ত অতিরিক্ত যাতায়াতের প্রয়োজন কমবে।
মেহেরুল্লানগর স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি চালুর দাবি নতুন নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে ২০২৪ সাল থেকেই এ দাবি জানানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে ঠিক কবে এই স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি বন্ধ হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট সময় বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত করতে পারেননি।
এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী থাকায় মেহেরুল্লানগর স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেন থামানোর দাবি আবারও জোরালো হয়েছে।
মেহেরুল্লানগর স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি চালু হলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মানুষই নয়, আশপাশের এলাকার বাসিন্দারাও এর সুবিধা পেতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয়টি যশোর-চৌগাছা সড়কের গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায় অবস্থিত। ফলে এই স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেন থামলে স্থানীয় যাত্রীদের জন্যও রেল যোগাযোগের সুযোগ বাড়তে পারে।
এখন মূল প্রশ্ন রেল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চিঠির পর মেহেরুল্লানগর স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নিয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।



