সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeঅর্থ-বানিজ্যএলপি গ্যাসের দাম বাড়ছে কেন? ১৮৩৭ টাকার সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে আড়াই হাজারে

এলপি গ্যাসের দাম বাড়ছে কেন? ১৮৩৭ টাকার সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে আড়াই হাজারে

ঢাকার এক গ্রাহকের অভিজ্ঞতা থেকেই বাজারের পরিস্থিতির একটি চিত্র পাওয়া যায়। তাঁর দেওয়া রসিদ অনুযায়ী, অক্টোবরের ২ তারিখে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তাঁকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে। এর মধ্যে ডেলিভারি চার্জ ছিল ৫০ টাকা। ওই সময় সিলিন্ডারটির নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা বলে তিনি জানান।

এনবি সংবাদ, অনলাইন : বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির বাজারে সংকট ও অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করে দিলেও অনেক জায়গায় সেই দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। নির্ধারিত দামের তুলনায় কয়েকশ টাকা বেশি দিয়ে রান্নার গ্যাস কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। এ খবর বিবিসি বংলা অনইনের।

বাজার ঘুরে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের জন্য কোথাও ২ হাজার ২০০ টাকা, আবার কোথাও ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। অথচ বিইআরসি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। ফলে একটি সিলিন্ডার কিনতেই গ্রাহকদের অতিরিক্ত কয়েকশ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সরবরাহব্যবস্থার কোন স্তরে বাড়ছে? আমদানিকারক, অপারেটর, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে কারা বেশি দামে বিক্রি করছেন? আর নির্ধারিত দামে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা কী?

বাংলাদেশে এলপিজির দাম সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে নির্ধারণ করে বিইআরসি। সংস্থাটির নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী, অপারেটর কোম্পানি থেকে ডিলার এবং ডিলার থেকে খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় সিলিন্ডার।

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হিসাব অনুযায়ী, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য অপারেটর পর্যায়ে নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৭৪২ টাকা। ডিলারের জন্য প্রতি সিলিন্ডারে ৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার জন্য ৪০ টাকা মুনাফার হিসাব রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।

কিন্তু বাস্তবে অনেক গ্রাহককে এই দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে না। সরবরাহ সংকট, পরিবহন ব্যয় এবং অপারেটর পর্যায়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ তুলে ব্যবসায়ীরা বাড়তি দাম নেওয়ার যুক্তি দিচ্ছেন। তবে এসব ব্যাখ্যা থাকলেও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ দিতে হওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন ভোক্তারা।

ঢাকার এক গ্রাহকের অভিজ্ঞতা থেকেই বাজারের পরিস্থিতির একটি চিত্র পাওয়া যায়। তাঁর দেওয়া রসিদ অনুযায়ী, অক্টোবরের ২ তারিখে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তাঁকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে। এর মধ্যে ডেলিভারি চার্জ ছিল ৫০ টাকা। ওই সময় সিলিন্ডারটির নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা বলে তিনি জানান।

গ্রাহকের অভিযোগ, সরকার দাম নির্ধারণ করলেও বাজারে সেই দামের বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। তাঁর বক্তব্য, নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না এবং এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে।

ঢাকার হাতিরপুল এলাকার যে বিক্রেতার কাছ থেকে তিনি সিলিন্ডার কিনেছিলেন, সেই বিক্রেতাও বেশি দামে বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তাঁর দাবি, সরবরাহ সংকটের কারণে সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে খরচ বেড়েছে। সর্বশেষ যে গ্যাস পেয়েছেন, তাতে প্রতি সিলিন্ডারে তাঁর খরচ পড়েছে প্রায় ২ হাজার টাকা। সেই সিলিন্ডার তিনি ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করছেন।

অন্যদিকে, মিরপুর এলাকার একজন দোকানদারও সরবরাহ সংকটের কথা জানিয়েছেন। সেখানে একটি সিলিন্ডারের দাম চাওয়া হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত দামের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরেও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। মুন্সীগঞ্জ সদরে এলপিজি বিক্রি করেন জাকির হোসেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখের পর ওই মাসে তিনি আর গ্যাস পাননি।

দাম বাড়ানোর পর ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করেও নতুন চালান পাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি তিনি। নতুন করে গ্যাস পাওয়া গেলেও প্রতি সিলিন্ডারে তাঁর খরচ প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

জাকির হোসেনের অভিযোগ, ডিলার পর্যায়েই যদি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ২০০ টাকা চাওয়া হয়, তাহলে খুচরা বিক্রেতাদের পক্ষে নির্ধারিত দামে তা বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর হিসাবে, নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকার সঙ্গে পাইকারি পর্যায়ের দামের ব্যবধানই প্রায় ৩৬৩ টাকা।

এতে স্পষ্ট হয়, খুচরা দোকানে পৌঁছানোর আগেই সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় অনেকটা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে কোন পর্যায়ে কতটা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে, তা নিশ্চিত করতে সরবরাহ ও লেনদেনের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।

এলপিজি সরবরাহব্যবস্থায় ডিলাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অপারেটর কোম্পানির কাছ থেকে সিলিন্ডার সংগ্রহ করে তাঁরা পাইকারি পর্যায়ে বিক্রি করেন। এরপর খুচরা বিক্রেতারা সেই সিলিন্ডার গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেন।

ডিলারদের অভিযোগ, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকেই সরবরাহ কমতে শুরু করে। অনেক ব্যবসায়ী তাঁদের চাহিদার অর্ধেক পরিমাণ গ্যাসও পাননি বলে দাবি করেছেন।

মুন্সীগঞ্জের এক ডিলার মোজাম্মেলের গোডাউন পরিদর্শনের সময় সেটি বন্ধ পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর দাবি, ২৬ বছর ধরে এলপিজি ব্যবসা করলেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি আগে হননি। তিনি অভিযোগ করেন, গ্রিন এলপিজি ১৮ সেপ্টেম্বরের পর তাঁকে আর গ্যাস সরবরাহ করতে পারেনি।

মোজাম্মেলের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন দাম নির্ধারণের পর অপারেটর পর্যায়ে প্রতি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৯০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে। অথচ নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী তাঁর ১ হাজার ৭৪২ টাকায় সিলিন্ডার পাওয়ার কথা।

এ ছাড়া পরিবহনসংক্রান্ত জটিলতায় তাঁর গাড়ি কয়েক দিন ধরে মোংলায় আটকে থাকার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এতে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে বলে তাঁর দাবি।

মোজাম্মেলের হিসাবে, প্রতি মাসে তিনি প্রায় ২০ হাজার সিলিন্ডার বিক্রি করলেও সেপ্টেম্বর মাসে পেয়েছেন সর্বোচ্চ ২ হাজারটি। সরবরাহ এতটা কমে যাওয়ায় ব্যবসার খরচ সামাল দিতে তাঁকে প্রতি সিলিন্ডারের পাইকারি দাম ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত চাইতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তবে ডিলারদের এই বক্তব্যের পাশাপাশি অপারেটরদের অবস্থানও যাচাই করা জরুরি। সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি স্তরের প্রকৃত ক্রয়মূল্য, পরিবহন ব্যয় এবং বিক্রয়মূল্য পর্যালোচনা করলেই অতিরিক্ত দামের উৎস আরও স্পষ্ট হবে।

এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠনের পক্ষ থেকেও অপারেটর পর্যায়ে বেশি দামের অভিযোগ তোলা হয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি মো. সেলিম খানের বক্তব্য অনুযায়ী, অপারেটরদের অতিরিক্ত দাম এবং পরিবহনসহ বিভিন্ন খরচ বৃদ্ধির কারণে ডিলারদের ব্যয় বেড়েছে।

তাঁদের দাবি, বিইআরসির নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে গেলে অনেক ডিস্ট্রিবিউটর লোকসানে পড়বেন। ব্যাংকঋণ ও ব্যবসার অন্যান্য দায় মেটানোও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা ব্যবসায়ী সমিতির চিঠি অনুযায়ী, নতুন দাম নির্ধারণের পর বিভিন্ন অপারেটর ডিলারদের কাছে প্রতি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭৪০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত চেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে কিছু কোম্পানি নির্ধারিত দামের চেয়ে সামান্য কমেও সিলিন্ডার সরবরাহ করছে বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিলারদের বক্তব্য, অপারেটর পর্যায়ে বেশি দাম নেওয়া হলে তাঁদের পক্ষে গ্রাহক পর্যায়ে নির্ধারিত মূল্য বজায় রাখা কঠিন। অন্যদিকে, ভোক্তাদের দৃষ্টিতে প্রশ্নটি হলো—ব্যবসায়ীদের ব্যয় বেড়ে থাকলেও তার প্রকৃত হিসাব যাচাই করে কেন নির্ধারিত দামে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না?

বাংলাদেশে এলপিজি আমদানির বড় অংশই বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে হয়ে থাকে। বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩২ থেকে ৩৩টি কোম্পানির লাইসেন্স থাকলেও নিয়মিত আমদানি করে ১০ থেকে ১২টি কোম্পানি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমদানি করা গ্যাস বাজারে ঠিক কতটা সরবরাহ হয়েছে এবং কোন পর্যায়ে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের ১ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্টে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ দুই মাসের আমদানির পরিমাণে বড় ব্যবধান ছিল না।

এই তথ্যের পরও বাজারে সরবরাহ সংকটের অভিযোগ থাকায় প্রশ্ন উঠেছে, আমদানি করা গ্যাস কোথায় এবং কীভাবে সরবরাহ করা হয়েছে। কেউ কেউ মজুত করে দাম বাড়ানোর অভিযোগ তুললেও তা প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য প্রতিবেদনে নেই। কয়েকটি কোম্পানি বিজ্ঞাপন দিয়ে মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে বলেও উল্লেখ রয়েছে।

তাই সংকটের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে আমদানির পরিমাণ, কোম্পানিভিত্তিক সরবরাহ, গুদামের মজুত এবং ডিলারদের কাছে পাঠানো চালানের হিসাব মিলিয়ে দেখা জরুরি।

গ্রিন এলপিজির জেনারেল ম্যানেজার আহসান হাবিব হিরো জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান গত দুই বছর ধরে সরাসরি এলপিজি আমদানি করছে না। অন্য আমদানিকারকদের কাছ থেকে গ্যাস কিনে কারখানায় বোতলজাত করে ডিলারদের সরবরাহ করা হয়।

তাঁর দাবি, সেপ্টেম্বর মাসে তাঁদের প্রায় ২ হাজার টন গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ পেয়েছেন মাত্র ১৫০ টন। অন্য কয়েকটি কোম্পানিও একই ধরনের সমস্যায় পড়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

অপারেটরদের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এবং আমদানির সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত ব্যয় এলপিজির সরবরাহকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে। দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তির তুলনায় স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনলে প্রিমিয়াম বা আনুষঙ্গিক ব্যয় বেশি হতে পারে।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হকও আমদানি কোটা ও লাইসেন্সসংক্রান্ত অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সুযোগ বাড়ানো গেলে আমদানির ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যয় বৃদ্ধি থাকলেও তার প্রভাব কোন কোম্পানির ক্ষেত্রে কতটা পড়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন। সব কোম্পানির ক্রয়মূল্য ও সরবরাহ ব্যয় এক নয়। ফলে বাজারের প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে কোম্পানিভিত্তিক তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।নির্ধারিত দাম নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন ভোক্তা প্রতিনিধিরা

এলপিজির নির্ধারিত মূল্য নিয়ে ভোক্তা অধিকারকর্মীদেরও প্রশ্ন রয়েছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, এ খাতে জবাবদিহি ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।

তাঁর মতে, গণশুনানি ছাড়া মূল্য বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। একই সঙ্গে নির্ধারিত দাম ঘোষণার পরও বাজারে সেই দামে গ্যাস না পাওয়ার বিষয়টি ভোক্তাদের জন্য বড় সমস্যা।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে গ্যাস আমদানি করা কিছু কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রতি টনে প্রিমিয়াম ১০০ ডলারের নিচে থাকতে পারে। অন্যদিকে, স্পট মার্কেট থেকে আমদানির ক্ষেত্রে এই ব্যয় প্রায় ২৫০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো জানিয়েছে।

সর্বশেষ মূল্য নির্ধারণের সময় ২৫০ ডলার প্রিমিয়াম বিবেচনায় নেওয়া হলেও কোন কোম্পানি স্পট মার্কেট থেকে কতটা গ্যাস আমদানি করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত হিসাব পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ফলে মূল্য নির্ধারণে সব কোম্পানির প্রকৃত আমদানি ব্যয় যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রতিবেদনটিতে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় বাংলাদেশে গৃহস্থালির এলপিজির কেজিপ্রতি ব্যয় বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।

ভারতের দিল্লিতে প্রতি কেজি এলপিজির দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৪ টাকা ৩৪ পয়সা এবং কলকাতায় প্রায় ৮৬ টাকা ৪৭ পয়সা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তানে তা প্রায় ১২৪ টাকা ৩৭ পয়সা, শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় প্রায় ১৩০ টাকা ১২ পয়সা এবং নেপালে প্রায় ১১৫ টাকা ৫৩ পয়সা।

তবে বিভিন্ন দেশের দাম তুলনা করার ক্ষেত্রে বিনিময় হার, সরকারি ভর্তুকি, কর, আমদানি ব্যয় এবং মূল্য নির্ধারণের নীতির পার্থক্য বিবেচনায় নিতে হয়। শুধু কেজিপ্রতি দাম দিয়ে পুরো বাজার পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। তারপরও এই তুলনা বাংলাদেশের এলপিজি বাজারে মূল্য নির্ধারণ ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

এলপিজির নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। জেলা প্রশাসকেরা ডিলারদের সঙ্গে আলোচনা করছেন এবং কোথাও কোথাও অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, বিইআরসি আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে সংকটের কারণ খতিয়ে দেখতে কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে। মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনের মাধ্যমে পরিস্থিতি যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

তবে শুধু মূল্য নির্ধারণ করলেই বাজার স্বাভাবিক হবে না। আমদানি থেকে শুরু করে অপারেটর, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা—প্রতিটি স্তরে প্রকৃত ক্রয়মূল্য, মজুত এবং সরবরাহের তথ্য যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে সরবরাহ ঘাটতির কারণ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

এলপিজি বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে আমদানিকারক, অপারেটর ও ডিলারদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কথা বলছেন, কেউ সরবরাহ ঘাটতি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কথা জানাচ্ছেন। আবার ভোক্তা প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলছেন মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা ও বাজার তদারকি নিয়ে।

কিন্তু এসব বিতর্কের মধ্যেও সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়েছেন সাধারণ মানুষ। রান্নার গ্যাসের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে তাঁদের নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি খরচ করতে হচ্ছে।

এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ, নিয়মিত সরবরাহ, কোম্পানিভিত্তিক আমদানি ও মজুতের হিসাব যাচাই এবং বাজারে কার্যকর নজরদারি। তদন্তে যদি অতিরিক্ত দাম নেওয়া বা কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু এলপিজির দাম কত, তা নয়। প্রশ্ন হলো—সরকার নির্ধারিত দামে সাধারণ মানুষ নিয়মিত রান্নার গ্যাস পাবেন কি না। সেই নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা না হলে মূল্য ঘোষণা থাকলেও ভোক্তাদের ভোগান্তি কমবে না।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ