জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ইটালি। একাধিক শহরে বিক্ষোভ ঘিরে তৈরি হয়েছে অশান্ত পরিস্থিতি। বিশেষ করে মিলানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট এবং সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মিলানে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েনের ঘোষণা করেছে ইটালি সরকার। এই পরিস্থিতিতে সে দেশে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে রোমের ভারতীয় দূতাবাস।
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় দূতাবাস ভারতীয়দের বিক্ষোভস্থল এবং জনবহুল এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরের দিকে নজর রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্য দিকে, হিংসাত্মক ঘটনার জেরে দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার।
জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ থেকেই ইটালির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, দৈনন্দিন খরচ এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপের মতো বিষয়গুলি ঘিরে জনঅসন্তোষ ক্রমশ বাড়ছে বলে জানা যাচ্ছে। রবিবার একাধিক শহরে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হলেও মিলানে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
প্রাথমিকভাবে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে নিজেদের দাবির কথা তুলে ধরেন। কিন্তু পরে আন্দোলনের একাংশ হিংসাত্মক হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন কয়েকজন বিক্ষোভকারী। বিভিন্ন দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানোর পাশাপাশি পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ার ঘটনাও ঘটে।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শহরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা এবং বিপণিবিতানগুলিতে নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে বিক্ষোভের জেরে আরও সম্পত্তির ক্ষতি হতে পারে।
ইটালির বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মিলানে বিক্ষোভ ঘিরে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ছড়িয়েছে। রবিবারের সংঘর্ষে একদল বিক্ষোভকারী পুলিশের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ তৎপর হলেও বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
মিলানের অন্যতম অভিজাত কেনাকাটার এলাকা ভিয়া মন্টেনাপোলিওনে। বিশ্বের বহু নামী বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের দোকান রয়েছে এই এলাকায়। অশান্তির আশঙ্কায় সেখানে অবস্থিত শ্যানেল, টিফানি এবং ডিওরের মতো সংস্থার দোকান থেকে মূল্যবান সামগ্রী সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অন্য দিকে, ডেকাথলন, আর্কিটেরিক্স এবং ভোডাফোনের মতো সংস্থার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। সম্ভাব্য হামলা ও ভাঙচুর থেকে দোকান রক্ষা করতে লেভিস এবং আন্ডার আর্মরের মতো ব্র্যান্ডের কর্তৃপক্ষও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। কয়েকটি দোকানের কাচের সামনে কার্ডবোর্ড ও কাঠের আড়াল তৈরি করা হয়েছে।
পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ার ঘটনায় বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় বিক্ষোভকারীদের একটি মিছিল মাঝপথে আটকে দেওয়া হয়।
এই ঘটনাগুলি শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েই প্রশ্ন তুলছে না, মিলানের বাণিজ্যিক পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে মিলানে নিরাপত্তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইটালি সরকার। উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি সোমবার সমাজমাধ্যমে জানান, শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে।
প্রশাসনের লক্ষ্য, গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে নিরাপত্তা জোরদার করা এবং নতুন করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়া আটকানো। বিশেষ করে বাণিজ্যিক এলাকা, জনসমাগমস্থল এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকে সুরক্ষিত রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রবিবার মিলানের অশান্তির ঘটনায় ২৭১ জন যুবককে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রেফতার হওয়াদের মধ্যে ২৩ জন নাবালক এবং ১৩ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
তবে আটক ও গ্রেফতারের এই পরিসংখ্যানের পাশাপাশি তদন্তের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু মিলানেই নয়, ইটালির উত্তরাঞ্চলের একাধিক শহরেও বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। শনিবার বোলোনিয়া, ব্রেসিয়া, বেরগামো এবং তুরিনে অশান্তির ঘটনা ঘটে।
পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই শহরগুলিতে সংঘর্ষের ঘটনায় আরও ২৮ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তুরিনে হাতুড়ি এবং পাথরের টুকরো নিয়ে ঘোরাফেরা করা কয়েকজনকে আটক করার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
অন্য দিকে, সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বোলোনিয়ার একটি রেলওয়ে স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানোই ছিল এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য।
একাধিক শহরে একই সময়ে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনের ওপর চাপ বেড়েছে। বিক্ষোভের পরিধি আরও বাড়ে কি না, তা নিয়ে নজর রাখছেন নিরাপত্তা আধিকারিকেরা।
ইটালির অশান্ত পরিস্থিতির মধ্যে সে দেশে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রোমের ভারতীয় দূতাবাস।
সোমবার সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত এক নির্দেশিকায় দূতাবাস জানিয়েছে, গত সপ্তাহ থেকেই ইটালির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ এবং পথসভা চলছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দূতাবাসের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বিক্ষোভের স্থান এবং ভিড় রয়েছে এমন এলাকা এড়িয়ে চলতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর ও প্রশাসনের নির্দেশের দিকে নজর রাখতে হবে। পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্র অনুসরণ করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের জন্য দূতাবাস দুটি হেল্পলাইন নম্বর প্রকাশ করেছে।
রোমের ভারতীয় দূতাবাস: +৩৯ ৩৩১ ৬১৪ ২০৮৫
মিলানের ভারতীয় কনস্যুলেট জেনারেল: +৩৯ ৩৮৮১৬৪৭৫২৭
ইটালিতে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের প্রয়োজন হলে এই নম্বরগুলিতে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যাঁরা মিলান বা অন্য কোনও বিক্ষোভপ্রবণ এলাকায় রয়েছেন, তাঁদের চলাফেরার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে চলা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলাই নিরাপদ সিদ্ধান্ত হতে পারে।
ইটালিতে বিক্ষোভের নামে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। রবিবার সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় তিনি স্পষ্ট করেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিবাদ জানানোর অধিকার থাকলেও শহর ধ্বংস করা বা সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তিতে হামলা চালানো কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মেলোনির বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নাগরিকেরা নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারেন এবং সরকারের নীতির বিরোধিতা করতে পারেন। কিন্তু সেই প্রতিবাদ হিংসাত্মক হয়ে উঠলে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এবং নিরাপত্তাকর্মীদের জীবন বিপন্ন হয়।
সোমবার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে মন্ত্রী এবং নিরাপত্তা আধিকারিকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা আটকানোর জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মেলোনি আরও জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া হাজার হাজার মানুষের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা রয়েছে। কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থনে বা বিরোধিতায় মানুষ রাস্তায় নামতেই পারেন। তবে হিংসা ও ভাঙচুরকে প্রতিবাদের অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিও তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে তারা হিংসাত্মক ঘটনার স্পষ্ট নিন্দা করে এবং গণআন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ রাখার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়।
অশান্তির পরিপ্রেক্ষিতে ইটালি সরকার আরও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের কথা ভাবছে। উপপ্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি জানিয়েছেন, রাষ্ট্র এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার জবাব কঠোরভাবে দেওয়া হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে একটি বিশেষ নিরাপত্তা প্যাকেজ অনুমোদনের বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে। বিশেষ করে নাবালক এবং যুব গ্যাংগুলির হিংসাত্মক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।
এ ক্ষেত্রে ‘প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন’ বা নিবর্তনমূলক আটকের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রের খবর। তবে প্রস্তাবিত ব্যবস্থার চূড়ান্ত রূপ কী হবে, তা মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পরই স্পষ্ট হতে পারে।
সরকারের সামনে এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এক দিকে, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের কারণগুলি মোকাবিলা করা। অন্য দিকে, বিক্ষোভের নামে হিংসা, লুটপাট এবং সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনা বন্ধ করা।
ইটালির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ এবং মিলানে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলেও পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরেছে। বিশেষ করে বিদেশি নাগরিক, পর্যটক এবং প্রবাসী ভারতীয়দের জন্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে এই পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তা নির্ভর করছে বিক্ষোভের গতিপ্রকৃতি, সরকারের পদক্ষেপ এবং প্রশাসনের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের অবস্থানের ওপর।
মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মানুষের অসন্তোষ গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। কিন্তু সেই প্রতিবাদ হিংসাত্মক হয়ে উঠলে তার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শহরের স্বাভাবিক জনজীবনে।
তাই আপাতত ইটালির পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে প্রশাসন। অন্য দিকে, ভারতীয় দূতাবাসের সতর্কবার্তা মেনে চলা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুসরণ করাই সে দেশে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



