পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৫৪ কোটি বছর। এই দীর্ঘ সময়ে বদলে গেছে মহাদেশের মানচিত্র, বিলুপ্ত হয়েছে অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদ, ঘটেছে একাধিক গণবিলুপ্তি। কিন্তু এত পরিবর্তনের মধ্যেও সমুদ্রের তলায় টিকে রয়েছে এক প্রাচীন প্রাণিগোষ্ঠী, যার ইতিহাস প্রায় ৫৪ কোটি বছরের পুরোনো। ছোট্ট এই প্রাণীদের নাম ব্র্যাকিওপড। দেখতে অনেকটা ঝিনুকের মতো হলেও তাদের গঠন ও বিবর্তনের ইতিহাস আলাদা। সম্প্রতি এই প্রাণিগোষ্ঠীর জিনগত সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে নতুন তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ব্র্যাকিওপডের সঙ্গে ব্রায়োজোয়ান ও ফোরোনিড নামে আরও দুটি প্রাণিগোষ্ঠীর বিবর্তনীয় সম্পর্ক রয়েছে। বহু প্রাচীন এক সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে এই তিন ধরনের প্রাণীর উদ্ভব হয়েছিল বলে গবেষকদের ধারণা। সেই পূর্বপুরুষ দেখতে সম্ভবত কৃমির মতো ছিল।
ব্র্যাকিওপড হলো সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী। এদের শরীর সাধারণত দুটি শক্ত খোলসে ঢাকা থাকে। বাইরে থেকে দেখতে ঝিনুকের মতো মনে হলেও ব্র্যাকিওপড ও সাধারণ ঝিনুকের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
ঝিনুকের দুটি খোলস সাধারণত একে অপরের প্রতিবিম্বের মতো। কিন্তু ব্র্যাকিওপডের ক্ষেত্রে দুটি খোলসের গঠন ও আকৃতি আলাদা হতে পারে। এই বৈশিষ্ট্য তাদের সহজেই অন্য অনেক খোলসযুক্ত প্রাণী থেকে আলাদা করে।
ব্র্যাকিওপড সাধারণত সমুদ্রের তলায় বসবাস করে। খোলসের ভিতরে থাকা বিশেষ একটি অঙ্গের সাহায্যে তারা জল থেকে খাদ্যকণা সংগ্রহ করে। এই অঙ্গকে বলা হয় লোফোফোর। এর সূক্ষ্ম অংশের সাহায্যে জল থেকে ক্ষুদ্র খাদ্যকণা ছেঁকে নেওয়া সম্ভব হয়।
আকারে ছোট হলেও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও পৃথিবীর বিবর্তনীয় ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে এই প্রাণীদের গুরুত্ব অনেক। কারণ, তাদের জীবাশ্ম প্রাচীন সমুদ্রের পরিবেশ এবং প্রাণের বিকাশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।
ব্র্যাকিওপডের ইতিহাসের সূত্র পাওয়া যায় ক্যামব্রিয়ান যুগের শিলাস্তরে। প্রায় ৫৪ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে সামুদ্রিক প্রাণীদের বৈচিত্র্য দ্রুত বাড়ছিল। সেই সময়ের জীবাশ্মে ব্র্যাকিওপডের মতো প্রাণীর উপস্থিতি পাওয়া যায়।
পরবর্তী কোটি কোটি বছরে পৃথিবীর জলবায়ু, সমুদ্রের পরিবেশ এবং জীবজগতের গঠনে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। একাধিক গণবিলুপ্তিতে বহু প্রাণিগোষ্ঠী পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। কিন্তু ব্র্যাকিওপডের বিভিন্ন বংশধারা টিকে থেকেছে।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে আজকের ব্র্যাকিওপড ৫৪ কোটি বছর আগের প্রাণীদের হুবহু একই রকম। দীর্ঘ বিবর্তনের পথে তাদের বিভিন্ন প্রজাতির শারীরিক বৈশিষ্ট্য, খোলসের গঠন ও জীবনযাপনে পরিবর্তন এসেছে। টিকে রয়েছে তাদের প্রাণিগোষ্ঠীর বিবর্তনীয় ধারাবাহিকতা।
স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট অ্যান্ড্রুজের গবেষকেরা জীবিত ব্র্যাকিওপডের পাঁচটি প্রধান বর্গ এবং সংশ্লিষ্ট প্রাণীদের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণার লক্ষ্য ছিল এই প্রাণীদের বিবর্তনীয় ইতিহাস ও পারস্পরিক সম্পর্ক আরও ভালোভাবে বোঝা।
গবেষণায় ব্র্যাকিওপড, ব্রায়োজোয়ান এবং ফোরোনিডের মধ্যে একটি প্রাচীন সাধারণ পূর্বপুরুষের সম্পর্কের পক্ষে তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের ধারণা, সেই পূর্বপুরুষের শরীর সম্ভবত কৃমির মতো ছিল।
এই অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কেবল বাহ্যিক গঠন দেখে প্রাণীদের বিবর্তনীয় সম্পর্ক সব সময় নির্ভুলভাবে বোঝা যায় না। জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করলে বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে কতটা সম্পর্ক রয়েছে এবং তাদের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে কী ধারণা পাওয়া যায়, তা আরও স্পষ্ট হতে পারে।
তবে সাধারণ পূর্বপুরুষের চেহারা সম্পর্কে কৃমির মতো ধারণাটি একটি বিবর্তনীয় অনুমান। সেই প্রাচীন প্রাণীর সম্পূর্ণ দেহাবশেষ পাওয়া না গেলে তার প্রকৃত আকৃতি নিশ্চিতভাবে জানা কঠিন।
গবেষণার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ব্র্যাকিওপডের খোলস তৈরিতে ব্যবহৃত খনিজের বৈচিত্র্য।
বিভিন্ন ব্র্যাকিওপডের খোলসে ক্যালসিয়াম কার্বোনেট গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তবে বিবর্তনের পথে এই প্রাণিগোষ্ঠীর কিছু শাখায় ক্যালসিয়াম ফসফেটসমৃদ্ধ খোলসের বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে।
একই প্রাণিগোষ্ঠীর বিভিন্ন শাখায় খোলস তৈরির খনিজ উপাদানে এমন পার্থক্য কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা বিজ্ঞানীদের কাছে আগ্রহের বিষয়। জীবের শরীর কীভাবে পরিবেশ থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করে এবং বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেহের গঠন কীভাবে বদলায়, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এ ধরনের গবেষণা সহায়তা করে।
খোলসের রাসায়নিক গঠন জীবাশ্ম সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন খনিজের উপস্থিতি ও সংরক্ষণের ধরন জীবাশ্মের বৈশিষ্ট্য এবং প্রাচীন সামুদ্রিক পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে।
ব্র্যাকিওপডের দীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, পৃথিবীর জীবজগতে বড় বড় পরিবর্তনের মধ্যেও তাদের কিছু বংশধারা টিকে রয়েছে। তবে ঠিক কোন বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পেরেছে, তার একক ও নিশ্চিত ব্যাখ্যা নেই।
প্রাণীদের টিকে থাকা নির্ভর করে বহু বিষয়ের ওপর। পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, খাদ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, আবাসস্থল এবং প্রজননসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিবর্তনের ধারাকে প্রভাবিত করতে পারে। ব্র্যাকিওপডের ক্ষেত্রেও এমন একাধিক কারণ ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, প্রাচীন প্রাণিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব টিকে থাকা মানেই তার সব প্রজাতি বেঁচে থাকা নয়। ব্র্যাকিওপডের বহু প্রাচীন প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানের প্রজাতিগুলি সেই দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাসের টিকে থাকা শাখাগুলির অংশ।
প্রাচীন জীবাশ্মের পাশাপাশি বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন সমুদ্রেও ব্র্যাকিওপডের জীবিত প্রজাতি পাওয়া যায়। তাদের উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের অতীত ও বর্তমানের প্রাণিজগতের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজতে সাহায্য করে।
জীবাশ্ম থেকে পাওয়া তথ্য এবং জীবিত প্রাণীর জিনগত বিশ্লেষণ একসঙ্গে ব্যবহার করে গবেষকেরা বুঝতে পারেন, দীর্ঘ সময় ধরে কোন বৈশিষ্ট্য বদলেছে, কোন বৈশিষ্ট্য টিকে রয়েছে এবং বিভিন্ন প্রাণিগোষ্ঠী কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ব্র্যাকিওপড নিয়ে এই গবেষণা তাই শুধু একটি সামুদ্রিক প্রাণীর ইতিহাস নয়; বরং পৃথিবীতে প্রাণের বিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন এবং প্রাচীন পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে জানারও গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে *সায়েন্স অ্যাডভান্সেস* সাময়িকীতে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন এই অনুসন্ধান প্রাচীন সামুদ্রিক প্রাণীদের বিবর্তনীয় সম্পর্ক এবং খোলসের গঠনগত পরিবর্তন নিয়ে গবেষণার আরও সুযোগ তৈরি করেছে।
পৃথিবীর জীবজগৎ যে কোটি কোটি বছর ধরে পরিবর্তিত হয়েছে, ব্র্যাকিওপড তারই এক জীবন্ত উদাহরণ। তাদের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, বিবর্তন মানে কেবল বিলুপ্তি নয়—পরিবর্তিত পরিবেশে কিছু প্রাণিগোষ্ঠীর ধারাবাহিকভাবে টিকে থাকাও তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।



