সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশহাজার বছরেরও বেশি বাঁচে এই গাছ! সারাজীবন ঝরে না মাত্র ২টি পাতা,...

হাজার বছরেরও বেশি বাঁচে এই গাছ! সারাজীবন ঝরে না মাত্র ২টি পাতা, মরুভূমিতে প্রকৃতির বিস্ময়

ওয়েলউইটচিয়া মিরাবিলিসের একটি পূর্ণবয়স্ক গাছের কাছে গেলে অনেক সময় মনে হতে পারে, সেখানে অসংখ্য লম্বা পাতা ছড়িয়ে রয়েছে। পাতাগুলি মাটির উপর এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন জায়গায় ছেঁড়া ফিতের মতো আকার ধারণ করে।

গাছের পাতা ঝরে যায়, নতুন পাতা গজায়। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় গাছের চেহারা। কিন্তু পৃথিবীতে এমন এক আশ্চর্য উদ্ভিদ রয়েছে, যার জীবদ্দশায় মাত্র দুটি পাতা তৈরি হয়। সেই দুটি পাতাই গাছটির সঙ্গে থেকে যায় সারাজীবন। শুধু তা-ই নয়, সময়ের সঙ্গে পাতাগুলি ক্রমশ লম্বা হতে থাকে। আর গাছটি বেঁচে থাকতে পারে এক হাজার বছরেরও বেশি সময়!

ভাবতে অবাক লাগলেও প্রকৃতির এই বিস্ময় বাস্তব। গাছটির নাম ওয়েলউইটচিয়া মিরাবিলিস (Welwitschia mirabilis)। পৃথিবীর অন্যতম ব্যতিক্রমী এই উদ্ভিদের দেখা মেলে আফ্রিকার নামিব মরুভূমিতে। প্রবল গরম, শুষ্ক আবহাওয়া এবং প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও আশ্চর্যভাবে বেঁচে থাকে এই গাছ। এর সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হল, গোটা জীবনজুড়ে গাছটি মাত্র দুটি স্থায়ী পাতা তৈরি করে। সেই পাতাই বছরের পর বছর ধরে বাড়তে থাকে।

ওয়েলউইটচিয়া মিরাবিলিস: মরুভূমির হাজার বছরের বিস্ময়

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এমন অনেক উদ্ভিদ রয়েছে, যাদের বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের অবাক করে। তবে ওয়েলউইটচিয়া মিরাবিলিসের মতো উদ্ভিদ সত্যিই বিরল। এটি মূলত নামিবিয়া এবং অ্যাঙ্গোলার উপকূলবর্তী শুষ্ক অঞ্চলে জন্মায়। এই অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত নামিব মরুভূমি পৃথিবীর প্রাচীনতম মরুভূমিগুলির মধ্যে অন্যতম।

সাধারণ গাছের মতো এই উদ্ভিদের ডালপালা বা পাতার ঘন সমাহার নেই। মাটির কাছাকাছি থাকা মোটা, কাঠের মতো কাণ্ড থেকে বেরিয়ে আসে দুটি লম্বা পাতা। সময়ের সঙ্গে পাতাগুলি বাড়তে থাকে এবং একসময় মাটির উপর ছড়িয়ে পড়ে।

ওয়েলউইটচিয়া মিরাবিলিসের আয়ু সাধারণত কয়েকশো বছরের বেশি হতে পারে। কিছু গাছের বয়স এক হাজার বছর ছাড়িয়ে যায় বলেও জানা যায়। নির্দিষ্ট কিছু নমুনার বয়স কয়েক হাজার বছর পর্যন্ত হতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।

অর্থাৎ, একটি গাছ যখন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বেঁচে থাকে, তখন তার সেই দীর্ঘ জীবনযাত্রার সঙ্গী হয়ে থাকে ওই একই দুটি পাতা। এই অসাধারণ বৈশিষ্ট্যই উদ্ভিদজগতে তাকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে।

সারাজীবন মাত্র দুটি পাতা, কীভাবে সম্ভব?

ওয়েলউইটচিয়া মিরাবিলিসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল এর পাতার সংখ্যা। সাধারণত একটি গাছের পুরনো পাতা ঝরে যায় এবং নতুন পাতা গজায়। কিন্তু এই উদ্ভিদের ক্ষেত্রে ঘটনাটি সম্পূর্ণ আলাদা।

গাছটির অঙ্কুরোদ্গমের পর থেকেই দুটি প্রাথমিক পাতা তৈরি হয়। এরপর গাছের বৃদ্ধি চলতে থাকলেও নতুন পাতার একটি দীর্ঘ সারি তৈরি হয় না। বরং ওই দুটি পাতার গোড়ার কাছের বিশেষ বৃদ্ধিশীল অংশ থেকে পাতা ক্রমাগত লম্বা হতে থাকে।

এই পাতাগুলি গাছের জীবনকালের পুরোটা সময় ধরে সক্রিয় থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাতার দৈর্ঘ্যও বাড়ে। অনুকূল পরিস্থিতিতে পাতাগুলি কয়েক মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।

কিন্তু এত বছর ধরে একই পাতা কীভাবে টিকে থাকে? এর অন্যতম কারণ হল পাতার গোড়ায় থাকা বৃদ্ধিশীল অংশ। এই অংশের সাহায্যে পাতা ক্রমাগত নতুন কোষ তৈরি করে দৈর্ঘ্যে বাড়তে পারে। পাতার ডগা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও গোড়ার দিকের বৃদ্ধিশীল অংশ সক্রিয় থাকলে পাতা বাড়তে থাকে।

এই কারণেই ওয়েলউইটচিয়া মিরাবিলিসের পাতা সাধারণ গাছের পাতার মতো নির্দিষ্ট সময় পরে ঝরে পড়ে না। বরং গাছটির জীবদ্দশায় দীর্ঘ সময় ধরে বেড়ে চলে।

দুটি পাতা দেখেই কেন মনে হয় অনেকগুলি পাতা রয়েছে?

ওয়েলউইটচিয়া মিরাবিলিসের একটি পূর্ণবয়স্ক গাছের কাছে গেলে অনেক সময় মনে হতে পারে, সেখানে অসংখ্য লম্বা পাতা ছড়িয়ে রয়েছে। পাতাগুলি মাটির উপর এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন জায়গায় ছেঁড়া ফিতের মতো আকার ধারণ করে।

কিন্তু বাস্তবে গাছটির পাতা মাত্র দুটি। দীর্ঘ সময় ধরে বাড়তে থাকার পাশাপাশি মরুভূমির প্রবল বাতাস, বালির ঘর্ষণ এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণে পাতাগুলির বিভিন্ন অংশ ছিঁড়ে যায়। পাতার ডগাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ফলে দুটি লম্বা পাতাই সময়ের সঙ্গে একাধিক সরু অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, গাছটিতে বুঝি অনেকগুলি পাতা রয়েছে। আসলে সেগুলি একই দুটি পাতার ছিন্নভিন্ন অংশ।

এই অদ্ভুত চেহারার কারণে ওয়েলউইটচিয়া মিরাবিলিসকে সহজেই অন্য গাছের থেকে আলাদা করা যায়। মরুভূমির বুকে মাটির উপর ছড়িয়ে থাকা তার লম্বা, ছেঁড়া পাতাগুলি যেন প্রকৃতির তৈরি এক বিশেষ নকশা।

নামিব মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশেও কীভাবে বেঁচে থাকে এই গাছ?

নামিব মরুভূমির পরিবেশ উদ্ভিদের জন্য অত্যন্ত কঠিন। এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম। দিনের বেলায় তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে, আবার উপকূলবর্তী অঞ্চলে সমুদ্র থেকে আসা ঠান্ডা কুয়াশা দেখা যায়।

এমন পরিবেশে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার জন্য ওয়েলউইটচিয়া মিরাবিলিস বিশেষভাবে অভিযোজিত হয়েছে। এই উদ্ভিদ শুষ্ক পরিবেশে টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে।

নামিব মরুভূমির উপকূলবর্তী অঞ্চলে সমুদ্র থেকে আসা কুয়াশা আর্দ্রতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এই কুয়াশা এবং পরিবেশের আর্দ্রতা গাছটির জল পাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি মাটির গভীরে থাকা আর্দ্রতাও তার বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এর দীর্ঘস্থায়ী পাতাগুলি গাছের খাদ্য তৈরির কাজেও সাহায্য করে। পাতার মাধ্যমে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় সূর্যের আলো ব্যবহার করে উদ্ভিদ নিজের খাদ্য তৈরি করে। নতুন পাতা তৈরি করার জন্য অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় না করে পুরনো দুটি পাতাকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা এই গাছের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

তবে গাছটির দীর্ঘায়ুর পেছনে শুধু দুটি পাতার ভূমিকা রয়েছে, এমনটা বলা ঠিক হবে না। এর বৃদ্ধি, শিকড়ের গঠন, পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

হাজার বছরের আয়ু, কিন্তু ধীরে ধীরে বাড়ে এই উদ্ভিদ

ওয়েলউইটচিয়া মিরাবিলিসের আরেকটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হল এর ধীর বৃদ্ধি। অনেক গাছ কয়েক বছরের মধ্যেই বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু এই উদ্ভিদ সাধারণত অত্যন্ত ধীরে বাড়ে এবং দীর্ঘ সময় ধরে নিজের স্বতন্ত্র গঠন বজায় রাখে।

একটি গাছের বয়স যত বাড়ে, তার পাতাও তত দীর্ঘ হতে পারে। কয়েক দশক বা শতাব্দী ধরে বেড়ে ওঠা পাতাগুলি একসময় মাটির উপর বিস্তৃত হয়ে যায়। প্রতিকূল পরিবেশে পাতার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও গাছটি বেঁচে থাকতে পারে।

বিজ্ঞানীদের কাছে এই উদ্ভিদ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় কীভাবে কোনও উদ্ভিদ চরম শুষ্ক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। মরুভূমিতে জলস্বল্পতা, তাপমাত্রার ওঠানামা এবং বাতাসের মতো চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এর টিকে থাকার ক্ষমতা উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে গবেষণার আকর্ষণীয় বিষয়।

এ ছাড়া, ওয়েলউইটচিয়া মিরাবিলিস উদ্ভিদজগতের বিবর্তনীয় ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি জিমনোস্পার্ম বা নগ্নবীজী উদ্ভিদগোষ্ঠীর সদস্য। এই গোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন প্রাচীন উদ্ভিদবংশের প্রতিনিধিদের দেখা যায়। ওয়েলউইটচিয়ার স্বতন্ত্র গঠন তাই উদ্ভিদের বিবর্তন নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

পৃথিবীর বিরল উদ্ভিদগুলির মধ্যে কেন বিশেষ ওয়েলউইটচিয়া?

ওয়েলউইটচিয়া মিরাবিলিস শুধু দীর্ঘায়ুর জন্যই পরিচিত নয়। এর গঠন, বৃদ্ধির ধরন এবং পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা একে উদ্ভিদজগতের অন্যতম ব্যতিক্রমী সদস্য করে তুলেছে।

সাধারণ গাছের ক্ষেত্রে পাতা ঝরে পড়া এবং নতুন পাতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ওয়েলউইটচিয়া সেই পরিচিত ধারণাকে বদলে দেয়। জীবনের শুরুতে তৈরি হওয়া দুটি পাতা নিয়েই এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বেড়ে চলে।

এর পাতাগুলি ক্রমাগত লম্বা হয়, ছিঁড়ে যায় এবং মাটির উপর ছড়িয়ে পড়ে। ফলে গাছটির চেহারা সময়ের সঙ্গে বদলালেও পাতার মূল সংখ্যা বদলায় না।

প্রকৃতির এই বিশেষ অভিযোজন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য সব উদ্ভিদকে একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয় না। কোনও উদ্ভিদ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে টিকে থাকে, আবার কোনও উদ্ভিদ অত্যন্ত ধীরগতিতে বেড়ে দীর্ঘায়ু অর্জন করে।

ওয়েলউইটচিয়া মিরাবিলিস সেই দ্বিতীয় ধরনের উদ্ভিদের এক অসাধারণ উদাহরণ।

প্রকৃতির বিস্ময়, যা এক হাজার বছর পরেও একই গল্প বলে

একটি গাছের জীবনকাল এক হাজার বছরেরও বেশি হতে পারে। আর সেই দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মাত্র দুটি পাতা। সময়ের সঙ্গে পাতাগুলি বাড়ে, ছিঁড়ে যায়, মাটির উপর ছড়িয়ে পড়ে। বাইরে থেকে মনে হয় যেন অসংখ্য পাতা রয়েছে। অথচ গোড়ার হিসাব করলে দেখা যাবে, সেই একই দুটি পাতা গাছটির সঙ্গে রয়েছে।

আফ্রিকার নামিব মরুভূমিতে জন্মানো ওয়েলউইটচিয়া মিরাবিলিস তাই শুধু একটি বিরল উদ্ভিদ নয়, বরং প্রকৃতির অভিযোজন ক্ষমতার এক অসাধারণ নিদর্শন।

প্রতিকূল পরিবেশেও কীভাবে জীবন টিকে থাকতে পারে, কীভাবে একটি উদ্ভিদ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজের স্বতন্ত্র গঠন বজায় রাখতে পারে—এই গাছ সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে সাহায্য করে।

মরুভূমির বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই উদ্ভিদ যেন নীরবে জানিয়ে দেয়, প্রকৃতির বিস্ময়ের কোনও শেষ নেই। কখনও সেই বিস্ময় লুকিয়ে থাকে বিশাল কোনও বৃক্ষে, আবার কখনও হাজার বছরের জীবন ধরে রাখা মাত্র দুটি পাতার মধ্যে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ