এনবি সংবাদ, অনলাইন : বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফের চাদর ক্রমশ গলে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু বরফ গলার প্রক্রিয়ায় এমন একটি প্রাকৃতিক উপাদানও ভূমিকা রাখতে পারে, যা শুনলে অনেকেই অবাক হবেন। সেটি হল পেঙ্গুইনের মল! গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পেঙ্গুইনের মল থেকে পাওয়া পুষ্টি বরফের উপরিভাগে থাকা শৈবালের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এই শৈবাল বরফের রং গাঢ় করে দেয়। ফলে বরফ বেশি সূর্যালোক শোষণ করে এবং গলনের গতি বাড়তে পারে।
বিষয়টি নিয়ে প্রকাশিত গবেষণার সূত্র ধরে পিপল ম্যাগাজিনেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে অ্যান্টার্কটিকার পরিবেশে পেঙ্গুইনের মল, শৈবালের বৃদ্ধি এবং বরফ গলার মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলার প্রধান কারণ পেঙ্গুইনের মল। বিশ্ব উষ্ণায়ন, বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বরফের উপরিভাগের পরিবর্তন এখনও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পেঙ্গুইনের মল থেকে পাওয়া পুষ্টি বরফ গলার প্রক্রিয়াকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা বুঝতে গবেষকদের পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলার নেপথ্যে পেঙ্গুইনের মল কীভাবে কাজ করে?
অ্যান্টার্কটিকা পৃথিবীর দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে অবস্থিত বিশাল বরফাচ্ছাদিত মহাদেশ। এখানকার বিস্তীর্ণ এলাকা পুরু বরফে ঢাকা। পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণে এই বরফের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
এই বরফাচ্ছাদিত পরিবেশেই বাস করে বিভিন্ন প্রজাতির পেঙ্গুইন। তাদের বিপুল সংখ্যক সদস্য একসঙ্গে বসবাস করলে নির্দিষ্ট এলাকায় প্রচুর মল জমা হয়। পেঙ্গুইনের এই মলে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের মতো পুষ্টি উপাদান থাকে, যা বিভিন্ন অণুজীব এবং শৈবালের বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে।
সাধারণত বরফের উপরিভাগকে প্রাণহীন পরিবেশ বলে মনে হলেও বাস্তবে সেখানে নানা ধরনের অণুজীব বাস করতে পারে। উপযুক্ত তাপমাত্রা, আলো, জল এবং পুষ্টি পেলে এসব জীব সক্রিয় হয়ে ওঠে।
পেঙ্গুইনের মল থেকে নির্গত পুষ্টি বাতাসের মাধ্যমে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে বরফের উপরিভাগে থাকা শৈবাল ও অন্যান্য অণুজীবের বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পেঙ্গুইনের একটি স্বাভাবিক জৈবিক কার্যকলাপ অ্যান্টার্কটিকার স্থানীয় পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।
শৈবালের কারণে বরফের রং বদলে যায় কেন?
অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলার সঙ্গে শৈবালের সম্পর্ক বুঝতে হলে সূর্যালোক কীভাবে বরফের উপরিভাগে প্রভাব ফেলে, তা জানা প্রয়োজন।
সাদা বরফ সাধারণত সূর্যের আলোর একটি বড় অংশ প্রতিফলিত করে। ফলে বরফের উপরিভাগ তুলনামূলক কম সৌরশক্তি শোষণ করে। কিন্তু বরফের উপর শৈবাল জমলে বা শৈবালের ঘনত্ব বাড়লে তার রং সবুজ, বাদামি কিংবা অন্য কোনও গাঢ় রূপ নিতে পারে।
এই পরিবর্তনের ফলে বরফের উপরিভাগের সূর্যালোক প্রতিফলনের ক্ষমতা কমে যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা এই বৈশিষ্ট্যকে অ্যালবেডো বা প্রতিফলনক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করেন।
বরফের রং যত গাঢ় হয়, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেটি তত বেশি সৌরশক্তি শোষণ করতে পারে। সেই শক্তির একটি অংশ তাপে রূপান্তরিত হলে বরফ গলার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হতে পারে।
এখানেই পেঙ্গুইনের মলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মল থেকে পাওয়া পুষ্টি শৈবালের বৃদ্ধি বাড়ালে বরফের উপরিভাগে রঙের পরিবর্তন ঘটতে পারে। ফলে শৈবাল সরাসরি বরফ গলিয়ে দেয়—বিষয়টি এমন নয়। বরং তারা বরফের উপরিভাগের বৈশিষ্ট্য বদলে সূর্যালোক শোষণের পরিমাণ বাড়াতে পারে।
অবশ্য সব ধরনের শৈবাল একইভাবে বরফের রং বদলায় না। তাদের প্রজাতি, ঘনত্ব, পরিবেশ এবং বরফের অবস্থার উপর নির্ভর করে প্রভাবের মাত্রা বদলে যেতে পারে।
পেঙ্গুইনের মল কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে বরফের উপরিভাগে?
পেঙ্গুইনের মল থেকে পাওয়া পুষ্টি শুধু যেখানে মল জমে, সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বাতাসের প্রবাহের মাধ্যমে এর কিছু উপাদান আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে পেঙ্গুইনের বড় বসতির কাছাকাছি অঞ্চলে এই প্রভাব বেশি দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
অ্যান্টার্কটিকার মতো কঠিন পরিবেশে পুষ্টির জোগান সীমিত। তাই বাইরে থেকে পাওয়া সামান্য পুষ্টিও কিছু অণুজীবের বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
পেঙ্গুইনের বসতির আশপাশে মল থেকে নির্গত পুষ্টি শৈবালের বৃদ্ধিতে সাহায্য করলে তার প্রভাব বরফের উপরিভাগে দেখা যেতে পারে। এভাবে একটি প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
তবে পেঙ্গুইনের মল থেকে পাওয়া পুষ্টি কত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, কতটা শৈবাল জন্মায় এবং তার ফলে কতখানি বরফ গলে—এসব বিষয় নির্দিষ্ট স্থান ও পরিবেশ অনুযায়ী আলাদা হতে পারে। তাই এই প্রক্রিয়াকে পুরো অ্যান্টার্কটিকার জন্য একই রকম ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার সম্পর্ক কী?
অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলার অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ হল পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি। বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্রের উষ্ণতা বাড়লে বরফের উপরিভাগ এবং বরফের চাদরের নিচের অংশে গলনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এর পাশাপাশি বরফের উপরিভাগের প্রতিফলনক্ষমতা কমে গেলে স্থানীয়ভাবে গলনের হার আরও বাড়তে পারে। শৈবাল, ধুলো, অন্যান্য জৈব পদার্থ এবং বরফের পৃষ্ঠে জমা বিভিন্ন উপাদান এই প্রতিফলনক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
পেঙ্গুইনের মল থেকে পাওয়া পুষ্টির কারণে শৈবালের বৃদ্ধি এবং তার ফলে বরফের রং গাঢ় হওয়ার প্রক্রিয়াটি এই বৃহত্তর পরিবেশগত ব্যবস্থার একটি অংশ হতে পারে।
অর্থাৎ, বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং শৈবালের প্রভাবকে আলাদা করে দেখার পরিবর্তে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা প্রয়োজন। উষ্ণতা বাড়লে কোথাও শৈবালের বৃদ্ধির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আবার শৈবাল বরফের উপরিভাগে বেশি ছড়িয়ে পড়লে সূর্যালোক শোষণ বাড়তে পারে। তবে এই সম্পর্ক সব জায়গায় একইভাবে কাজ করবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।
অ্যান্টার্কটিকার বরফ গললে কেন বাড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা?
অ্যান্টার্কটিকার বরফ নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি। মহাদেশটির স্থলভাগের উপর জমে থাকা বরফ গলে সমুদ্রে প্রবাহিত হলে সমুদ্রের পানির পরিমাণ বাড়তে পারে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে নিচু উপকূলীয় অঞ্চল, দ্বীপ এবং বদ্বীপ এলাকায় বন্যা ও উপকূলীয় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বাংলাদেশের মতো বদ্বীপপ্রধান দেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার পরিবর্তনের মতো ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
তবে ভাসমান সামুদ্রিক বরফ গলে যাওয়া এবং স্থলভাগের বরফ গলে সমুদ্রে পানি যোগ হওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্থলভাগের বরফ গলে সমুদ্রে প্রবাহিত হলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সরাসরি বাড়তে পারে। অন্যদিকে, ভাসমান বরফ গলার প্রভাব তুলনামূলক আলাদা।
এ কারণে অ্যান্টার্কটিকার বরফের কোন অংশ গলছে, কত দ্রুত গলছে এবং সেই পানি কোথায় যাচ্ছে—এসব তথ্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পেঙ্গুইনের মল নিয়ে গবেষণা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত, এই গবেষণা তা বোঝার সুযোগ করে দেয়। সাধারণভাবে পেঙ্গুইনের মলকে বর্জ্য হিসেবে দেখা হলেও পরিবেশে এটি পুষ্টির উৎস হিসেবেও কাজ করে। সেই পুষ্টি আবার শৈবাল ও অণুজীবের বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
শৈবালের বৃদ্ধি বরফের উপরিভাগের রং বদলে দিলে সূর্যালোক শোষণের পরিমাণও পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে একটি প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে শুরু হওয়া প্রক্রিয়া স্থানীয় বরফ গলার পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই ধরনের গবেষণা জলবায়ু পরিবর্তনের মডেল তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ, বরফ গলার হার হিসাব করার সময় শুধু তাপমাত্রা নয়, বরফের উপরিভাগের বৈশিষ্ট্য এবং জীবজগতের প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
তবে পেঙ্গুইনের মল অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলার কতটা কারণ, তা নির্ধারণ করতে আরও পরিমাপ ও গবেষণার প্রয়োজন। বরফের বিশাল চাদরের গলনকে শুধু এই একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক হবে না।
প্রকৃতির ছোট পরিবর্তনেও বড় প্রভাব পড়তে পারে
অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলার সঙ্গে পেঙ্গুইনের মলের সম্ভাব্য সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে। প্রকৃতিতে কোনও উপাদান একা কাজ করে না। প্রাণী, উদ্ভিদ, অণুজীব, বাতাস, সূর্যালোক এবং তাপমাত্রা—সবকিছুই কোনও না কোনওভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।
পেঙ্গুইনের মল থেকে পাওয়া পুষ্টি শৈবালের বৃদ্ধিতে সাহায্য করতে পারে। শৈবাল বরফের উপরিভাগের রং বদলে সূর্যালোক শোষণ বাড়াতে পারে। আর উপযুক্ত পরিস্থিতিতে সেই বাড়তি তাপ বরফ গলার গতি বাড়াতে পারে।
তবে এই প্রক্রিয়া বিশ্ব উষ্ণায়নের বিকল্প ব্যাখ্যা নয়। বরং এটি দেখায়, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জটিল বিষয় বুঝতে হলে প্রকৃতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রক্রিয়াগুলিকেও গুরুত্ব দিতে হয়।



