সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeবিশেষ প্রতিবেদনজামিন পেলেও মুক্তি নয়, জেলগেটে ফের গ্রেফতার: শ্যোন অ্যারেস্টের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন

জামিন পেলেও মুক্তি নয়, জেলগেটে ফের গ্রেফতার: শ্যোন অ্যারেস্টের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন

তার ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তির দিন তিনি ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলেন। স্বজনেরা কারাগারের ফটকে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু মুক্তির প্রস্তুতির মধ্যেই কারাগারের একজন কর্মী তাকে একটি কাগজ দেন। সেখানে তিনি দেখতে পান, অন্য একটি থানায় তার বিরুদ্ধে নতুন মামলা হয়েছে।

এনবি সংবাদ, অনলাইন : জামিন পাওয়ার পর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা একজন আসামির। কিন্তু বাংলাদেশে এমন একাধিক ঘটনার অভিযোগ সামনে এসেছে, যেখানে কোনো মামলায় জামিন পাওয়ার পর কারাগার থেকে বের হওয়ার আগেই তাকে অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। কোথাও আবার কারাগারের ফটক থেকে আটকের অভিযোগ উঠেছে। খবর বিবিসি বাংলা অনলাইনের।

এ ধরনের ঘটনায় ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ বা অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি সব মামলায় জামিন পাওয়ার পরও তাকে কারাগারে আটকে রাখার সুযোগ আইন কতটা দেয়, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

আহসান আহমেদ নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ২০২৫ সালের মার্চে ঢাকায় গ্রেফতার হন। নামটি তার প্রকৃত নাম নয়। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সমর্থক হিসেবে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

গ্রেফতারের পর তার পরিবার আইনজীবী নিয়োগ করে জামিনের চেষ্টা শুরু করে। নিম্ন আদালতে জামিন না পাওয়ার পর উচ্চ আদালতে আবেদন করা হয়। শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে থাকা দুটি মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন মেলে।

পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ছয় মাস সময় লাগে। কিন্তু জামিন পাওয়ার পরও কারাগার থেকে বের হতে পারেননি আহসান।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তির দিন তিনি ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলেন। স্বজনেরা কারাগারের ফটকে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু মুক্তির প্রস্তুতির মধ্যেই কারাগারের একজন কর্মী তাকে একটি কাগজ দেন। সেখানে তিনি দেখতে পান, অন্য একটি থানায় তার বিরুদ্ধে নতুন মামলা হয়েছে।

অর্থাৎ আগের মামলাগুলোতে জামিন পাওয়ার পরও নতুন মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

আহসানের দাবি, নতুন মামলাটিতেও পরে তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন পান। কিন্তু এরপর আবারও নতুন মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

এভাবে কয়েক দফা জামিনের পর নতুন মামলা আসতে থাকে। শেষ পর্যন্ত পঞ্চমবারের চেষ্টায় কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।

ততদিনে প্রায় দেড় বছর কেটে যায়।

আহসানের বক্তব্য, প্রথম দফায় পাওয়া জামিনের পরই তার কারাগার থেকে বের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন করে গ্রেফতার দেখানোর কারণে মুক্তি পেতে আরও প্রায় এক বছর সময় লাগে।

এ ধরনের আরেকটি ঘটনার কথা জানিয়েছেন আশিকুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। এটিও তার ছদ্মনাম।

একটি নাশকতার মামলায় গ্রেফতারের পর ৭২ দিন কারাগারে ছিলেন তিনি। পরে নিম্ন আদালত থেকে জামিন পান। অর্থাৎ ওই মামলায় তার কারাগারে থাকার আইনি বাধা ছিল না।

কিন্তু কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় তিনি দেখতে পান, বাইরে কয়েকজন পুলিশ সদস্য অবস্থান করছেন। তার দাবি, কারাগারের ফটক থেকে কয়েক কদম এগোনোর পর একটি সাদা মাইক্রোবাস এসে থামে। গাড়ি থেকে কয়েকজন ব্যক্তি নেমে তাকে আটক করেন।

আশিকুরের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিরা সাদা পোশাকে ছিলেন। পরে তাকে অন্য একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয় এবং আবারও কারাগারে পাঠানো হয়।

কারাগারে থাকা কোনো ব্যক্তিকে অন্য একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আইনি প্রক্রিয়াকে সাধারণভাবে শ্যোন অ্যারেস্ট বলা হয়।

এ ক্ষেত্রে আদালতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কারাগারে থাকা কাউকে নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখাতে হলে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা।

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শাহজাহান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, কোনো ব্যক্তি জামিন পাওয়ার পর তাকে জেলগেটে গ্রেফতার বা শ্যোন অ্যারেস্ট করার সুযোগ নেই। তবে বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে প্রতিরোধমূলক আটকের বিষয়টি আলাদা।

তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো মামলায় জামিন হয়ে গেলে এবং অন্য কোনো মামলায় আইনগতভাবে আটক রাখার কারণ না থাকলে ওই ব্যক্তির মুক্তি পাওয়ার কথা।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ফৌজদারি কার্যবিধিতে শ্যোন অ্যারেস্টের ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদন ও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

কারাগারে থাকা কাউকে নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হলে তাকে আদালতে হাজির করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সংশ্লিষ্ট মামলার কেস ডায়েরি আদালতে উপস্থাপন করতে হয়।

আসামিপক্ষকেও শুনানির সুযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

আইনজীবী মো. শাহজাহানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো মামলায় গ্রেফতার দেখানোর প্রয়োজনীয়তা প্রমাণের জন্য তদন্তের নথি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য আদালতের সামনে উপস্থাপন করতে হয়। এর মধ্যে সাক্ষীর জবানবন্দি বা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দেওয়া জবানবন্দিতে ওই ব্যক্তির নাম এসেছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে তার বক্তব্য হলো, এসব প্রক্রিয়া জামিনের আগে অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। একজন ব্যক্তি সব মামলায় জামিন পাওয়ার পর শুধু নতুন করে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে তার মুক্তি আটকে রাখার সুযোগ নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে কুষ্টিয়াতেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।

ওয়াসিম আকরামের দাবি, তার বাবা করিম প্রামাণিকসহ আটজন একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর তাদের নতুন একটি নাশকতার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

ওয়াসিমের অভিযোগ, তারা কারাগার থেকে বের হওয়ার আগেই পুলিশ তাদের আটক করে। পরে একই রাতের একটি নাশকতার মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়।

তার প্রশ্ন, কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের কীভাবে বাইরে কোনো নাশকতার ঘটনায় ‘হাতে-নাতে’ গ্রেফতার দেখানো হলো?

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ।

কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ জাকির হোসেন দাবি করেছেন, আসামিদের কারাগারের ভেতর থেকে আটক করার তথ্য সঠিক নয়। এজাহারে যেভাবে ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, পুলিশ সেই তথ্যের ভিত্তিতেই অবস্থান নিয়েছে বলে তিনি জানান।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, আসামিদের কারাগারের ভেতর থেকে কিংবা কারাগারের ফটক থেকে গ্রেফতার করা হয়নি।

তবে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. শরিফুল আলমের বক্তব্যে ঘটনাটির আরেকটি দিক সামনে আসে। তিনি বলেন, কারাগার কর্তৃপক্ষ আসামিদের ছেড়ে দিয়েছিল এবং এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের নিয়ে যায়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারের ভেতর থেকে কাউকে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে কারাগারের অভ্যন্তরীণ গেট দিয়ে বের হওয়ার পর তাদের আটক করা হয়েছে।

এই দুই বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য থাকায় আসামিদের প্রকৃতপক্ষে কোথায় এবং কী পরিস্থিতিতে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

জামিনের পর নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানো বা জেলগেটে আটকের অভিযোগ নিয়ে সরকারের কাছ থেকেও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও সে সময় তিনি বিদেশ সফরে থাকায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

পরে বিষয়টি তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হয়। সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনায় নতুন করে মামলা দেওয়ার বিষয়টি সবসময় একইভাবে ঘটে না। কোনো কোনো মামলায় আরও আসামি যুক্ত করার বিষয় থাকতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও জানান, এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে তার কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে অভিযোগের সত্যতা থাকলে বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে খতিয়ে দেখার কথা বলেন তিনি।

জামিন পাওয়ার পরও কারাগারে থাকা কিংবা জেলগেট থেকে অন্য মামলায় গ্রেফতার হওয়ার অভিযোগ শুধু আইনি প্রক্রিয়ার বিষয় নয়, এর সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নও জড়িত।

একদিকে তদন্তাধীন মামলায় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। অন্যদিকে সেই প্রক্রিয়া যেন জামিনের আদেশকে কার্যত অকার্যকর না করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে একজন ব্যক্তি সব মামলায় জামিন পাওয়ার পর তাকে কোন আইনি ভিত্তিতে আবার আটক রাখা হচ্ছে, তা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। আদালতের আদেশ, তদন্তের নথি এবং গ্রেফতারের সময় ও স্থান নিয়ে স্বচ্ছতা না থাকলে এ ধরনের ঘটনা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়।

আহসান আহমেদের মতো কারও ক্ষেত্রে একের পর এক নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানোর অভিযোগ এবং কুষ্টিয়ার ঘটনায় পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের পার্থক্য—দুটিই বিষয়টির গুরুত্ব সামনে এনেছে।

শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে জামিন দেওয়ার পর তার মুক্তি কীভাবে কার্যকর হচ্ছে এবং নতুন কোনো মামলায় তাকে আটক করতে হলে আইন অনুযায়ী কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে আদালতের নজরদারি, নথিভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি এ ধরনের বিতর্ক এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ