এনবি সংবাদ, অনলাইন : প্রাচীনকালে রোগ থেকে মুক্তি, বিপদ এড়ানো কিংবা অজানা ভবিষ্যতের ভয় কাটাতে মানুষ নানা ধরনের তাবিজ ব্যবহার করতেন। আশ্চর্যের বিষয়, ধর্মীয় নেতাদের একাংশের কঠোর বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রায় ৬০০ বছর ধরে এই প্রথা টিকে ছিল প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে। তাবিজের গায়ে লেখা বিভিন্ন বার্তা, ব্যবহারের ধরন এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পরীক্ষা করে গবেষকেরা সেই সময়ের মানুষের বিশ্বাস ও দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে নতুন তথ্য পেয়েছেন।
খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর গোড়ার দিক পর্যন্ত তাবিজের ব্যবহার চালু ছিল বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। শুধু ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য গলায় তাবিজ ঝোলানোই নয়, বাড়ির দেওয়ালে কিংবা কৃষিজমির কাছেও এগুলি রাখা হতো। খ্রিস্টধর্মের প্রসার ঘটার পরেও এই অভ্যাস বন্ধ হয়নি। বরং তাবিজের গায়ে লেখা কথার ধরন এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্যে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়।
বর্তমান সময়েও অনেকে নানা বিশ্বাস থেকে তাবিজ ধারণ করেন। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যেও মানুষের মধ্যে এমন প্রবণতা দেখা যেত। তবে সেই সময় তাবিজের ব্যবহার কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অসুস্থতা, দৈনন্দিন বিপদ এবং অনিশ্চয়তার মুখে মানসিক ভরসা পাওয়ার জন্যও মানুষ তাবিজের উপর নির্ভর করতেন।
গবেষকেরা প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের প্রায় ৩০০টি তাবিজ পরীক্ষা করে এই প্রথার বিভিন্ন দিক বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাতে দেখা যায়, তাবিজের ব্যবহার ছিল বহুমুখী। কেউ রোগ সারানোর আশায় এটি ব্যবহার করতেন, আবার কেউ অশুভ শক্তি কিংবা সম্ভাব্য বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য তাবিজ সঙ্গে রাখতেন।
তাবিজের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো। ব্যক্তির গলায় ঝোলানো তাবিজের পাশাপাশি বাড়ির দেওয়ালে এবং জমির পাশে এগুলি রাখা হতো। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা থেকে শুরু করে বসতবাড়ি ও কৃষিজমির নিরাপত্তা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাবিজের উপর মানুষের আস্থা ছিল।
সেই সময়ের চিকিৎসাব্যবস্থা এবং রোগ সম্পর্কে মানুষের সীমিত জ্ঞানের কারণে তাবিজ অনেকের কাছে আশ্রয়ের মতো হয়ে উঠেছিল বলে মনে করা যায়। তবে তাবিজ ব্যবহার করলেই রোগ সেরে যেত, এমন কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এই গবেষণা দেয়নি। বরং প্রাচীন সমাজে মানুষের বিশ্বাস, ভয় এবং নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা বোঝার ক্ষেত্রে এই নিদর্শনগুলি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাচীন রোমে খ্রিস্টধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ধর্মীয় জীবন ও আচার-আচরণে পরিবর্তন আসে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা তাবিজ ব্যবহারের অভ্যাস সহজে মুছে যায়নি।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, খ্রিস্টধর্মের প্রসারের পরেও বিভিন্ন ধরনের তাবিজ তৈরি ও ব্যবহার করা হতো। তবে আগের তুলনায় তাবিজের গায়ে লেখা বার্তায় পরিবর্তন আসে। কিছু তাবিজে বাইবেলের অংশবিশেষ লেখা থাকত। আবার কোনও কোনও তাবিজ তৈরি করা হতো ক্রসের আকৃতিতে।
ধাতুর পাত কিংবা প্যাপিরাসের মতো উপকরণে তৈরি এই তাবিজগুলি ধর্মীয় বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত সুরক্ষার ধারণাকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছিল। অনেকের কাছে এগুলি হয়তো পবিত্র ধর্মীয় বাণী সঙ্গে রাখার একটি মাধ্যম ছিল।
এই পরিবর্তন থেকে বোঝা যায়, নতুন ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রসার ঘটলেও পুরনো অভ্যাসের সঙ্গে তার সম্পর্ক সব সময় সরল ছিল না। কোথাও পুরনো প্রথা পরিত্যক্ত হয়েছে, আবার কোথাও সেই প্রথাই নতুন ধর্মীয় প্রতীক ও ভাষার সঙ্গে মিশে গিয়েছে।
তাবিজের জনপ্রিয়তা থাকলেও ধর্মীয় নেতাদের একাংশ এই প্রথার বিরোধিতা করতেন। তাঁদের কাছে তাবিজের মাধ্যমে রোগ সারানো কিংবা বিপদ দূর করার চেষ্টা ধর্মীয় বিশ্বাসের সঠিক চর্চা হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
কিছু ক্ষেত্রে তাবিজ ব্যবহারকারীদের ধর্মচ্যুত করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হতো বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। অর্থাৎ, তাবিজের ব্যবহার শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় ছিল না; এটি ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং প্রচলিত আচার-অনুশাসনের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছিল।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ধর্মীয় নেতাদের একাংশ তাবিজের বিরোধিতা করলেও সবাই যে একই অবস্থান নিয়েছিলেন, তা নয়। গবেষণায় এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গিয়েছে যে, নিষেধাজ্ঞা ও আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ধর্মযাজকদের একাংশ নিজেরাই তাবিজ তৈরি করতেন।
এই তথ্য প্রাচীন সমাজের ধর্মীয় জীবনের একটি জটিল দিক তুলে ধরে। প্রকাশ্যে কোনও প্রথার বিরোধিতা করা হলেও বাস্তবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে সেই প্রথার ব্যবহার চলতে পারে। একই ব্যক্তির ধর্মীয় দায়িত্ব এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের মধ্যে কখনও কখনও এমন দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়াও অসম্ভব নয়।
প্রাচীন রোমান তাবিজগুলির মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলির একটি হল সেগুলিতে ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্য। কিছু তাবিজে এমন শব্দ পাওয়া গিয়েছে, যেগুলি রোগ সারানো কিংবা অশুভ প্রভাব দূর করার উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘আব্রাক্যাডাব্রা’ শব্দটি। কোনও কোনও তাবিজে জ্বর কমানোর আশায় এই শব্দটি খুব ছোট করে লেখা থাকত। শব্দটির আকার ক্রমশ ছোট করার মতো পদ্ধতিও প্রাচীন জাদুবিশ্বাসের বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় দেখা যায়। তবে আলোচ্য তাবিজগুলিতে ঠিক কীভাবে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল, তা বুঝতে সংশ্লিষ্ট নিদর্শনের নির্দিষ্ট বিবরণ গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের দিনে ‘আব্রাক্যাডাব্রা’ শব্দটি সাধারণত জাদু দেখানোর সময় শোনা যায়। কিন্তু প্রাচীনকালে শব্দটির সঙ্গে রোগ নিরাময় ও সুরক্ষার মতো বিশ্বাসও যুক্ত ছিল। ফলে একই শব্দের অর্থ ও ব্যবহার সময়ের সঙ্গে কীভাবে বদলেছে, তা নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়।
অবশ্য এই শব্দ লেখা তাবিজ জ্বর কমাতে পারত, এমন প্রমাণ নেই। এটি বরং দেখায়, অসুস্থতার মতো সমস্যার মোকাবিলায় প্রাচীন মানুষ কখনও প্রতীক, শব্দ এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর নির্ভর করতেন।
গবেষণায় পাওয়া একটি পুরনো ধাতব তাবিজে আধকপালি বা মাইগ্রেনের মতো মাথাব্যথা দূর করার উদ্দেশ্যে লেখা বার্তার সন্ধান মিলেছে। এই তথ্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি প্রাচীন মানুষের দৈনন্দিন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত উদ্বেগের সঙ্গে তাবিজের সম্পর্ক তুলে ধরে।
বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাইগ্রেন একটি স্বীকৃত স্নায়বিক সমস্যা। এর চিকিৎসায় রোগীর উপসর্গ, ব্যথার ধরন এবং অন্যান্য শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়। কিন্তু প্রাচীন রোমের মানুষদের হাতে আজকের মতো আধুনিক চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের সুবিধা ছিল না।
সেই পরিস্থিতিতে মাথাব্যথার মতো কষ্টকর সমস্যার সমাধান খুঁজতে তাঁরা বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। ধাতব তাবিজে রোগ দূর করার বার্তা লেখা ছিল সেই চেষ্টারই একটি নিদর্শন।
এখানে তাবিজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু চিকিৎসাগত কার্যকারিতার প্রমাণ নেই। আধুনিক চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে তাবিজের উপর নির্ভর করা উচিত নয়। গবেষকদের মূল আগ্রহ হল, অসুস্থতার অভিজ্ঞতা এবং তা থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রাচীন মানুষের সংস্কৃতিকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল, তা বোঝা।
নেদারল্যান্ডসের লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক প্যাট্রিসিয়া ক্রেটের মতে, সাধারণ মানুষের কাছে তাবিজ ছিল বিশ্বাসযোগ্য একটি বস্তু। তাঁর পর্যবেক্ষণে এমন সম্ভাবনাও উঠে এসেছে যে, অনেকের কাছে তাবিজের মাধ্যমে বাইবেলের কিছু অংশ নিজের কাছে রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
প্রাচীনকালে প্রত্যেক মানুষের পক্ষে ধর্মীয় গ্রন্থ সংগ্রহ করা বা দীর্ঘ ধর্মীয় লেখা পড়ার সুযোগ ছিল না। সেই প্রেক্ষাপটে ছোট ধাতব পাত কিংবা প্যাপিরাসে লেখা ধর্মীয় বাণী সহজে সঙ্গে রাখার উপযোগী হতে পারত। যদিও তাবিজ ব্যবহারকারীদের প্রত্যেকের শিক্ষাগত অবস্থা কিংবা ধর্মীয় গ্রন্থে প্রবেশাধিকারের বিষয়ে এই নিদর্শনগুলি একা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
তবু গবেষকের এই ব্যাখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। ধর্মীয় বিশ্বাস কি শুধু উপাসনালয় কিংবা ধর্মীয় নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, নাকি সাধারণ মানুষ নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেই বিশ্বাসকে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করতেন?
তাবিজের গায়ে লেখা বাইবেলের অংশ, ক্রসের আকৃতি এবং রোগ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে তৈরি বার্তাগুলি ইঙ্গিত দেয়, ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেও গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল।
প্রায় ৬০০ বছর ধরে তাবিজের ব্যবহার টিকে থাকার ঘটনা শুধু একটি প্রাচীন রীতির ইতিহাস নয়। এটি মানুষের ভয়, আশা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষার কথাও বলে।
রোগ হলে সুস্থ হওয়ার আশা, বিপদ এড়ানোর চেষ্টা কিংবা অজানা পরিস্থিতিতে মানসিক ভরসা খোঁজা—এসব প্রবণতা মানবসমাজে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। প্রাচীন রোমের তাবিজগুলি সেই প্রবণতার বস্তুগত প্রমাণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে এই নিদর্শনগুলি দেখায়, ধর্মীয় নেতাদের আপত্তি থাকলেও সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও অভ্যাস সব সময় নির্দেশ মেনে বদলে যায় না। বরং সময়ের সঙ্গে পুরনো প্রথা নতুন ধর্মীয় প্রতীক, ভাষা ও সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।
গবেষক প্যাট্রিসিয়া ক্রেটের পর্যবেক্ষণের মূল তাৎপর্য এখানেই। তাবিজগুলি অতীতের মানুষের বিশ্বাসের ইতিহাস জানতে সাহায্য করে। কিন্তু সেগুলি অলৌকিক শক্তির অস্তিত্ব কিংবা রোগ সারানোর ক্ষমতার প্রমাণ নয়।
প্রাচীন রোমের এই তাবিজগুলি তাই শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে নয়, মানুষের মানসিক জগৎ ও সামাজিক ইতিহাস বোঝার উপাদান হিসেবেও মূল্যবান। শত শত বছর আগে মানুষ কীসে ভরসা পেতেন, কীভাবে অসুস্থতা ও বিপদের মোকাবিলা করতে চাইতেন এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে ব্যবহার করতেন—সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে এই গবেষণা নতুন দিশা দেখায়।



