এনবি সংবাদ, অনলাইন : সূর্যের আয়ু একদিন শেষ হবে। তখন আজকের মতো আলো ও তাপ ছড়াবে না আমাদের নক্ষত্র। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্য ফুলে উঠে বিশাল লাল দৈত্যে পরিণত হবে। পরবর্তী পর্যায়ে বাইরের স্তরের বিপুল পদার্থ মহাকাশে ছড়িয়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি শ্বেত বামনে পরিণত হবে সূর্য। কিন্তু সূর্যের এই পরিবর্তনের পর সৌরমণ্ডলের বাকি গ্রহগুলির কী হবে?
বিশেষ করে বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। সূর্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করায় এই চারটি বৃহৎ গ্রহ সরাসরি সূর্যের বাইরের স্তরের সঙ্গে একইভাবে মিথস্ক্রিয়া করবে না। কিন্তু সূর্যের ভর কমে গেলে তাদের কক্ষপথে পরিবর্তন আসতে পারে। সেই পরিবর্তন কি শেষ পর্যন্ত গ্রহগুলিকে সৌরজগৎ থেকে ছিটকে বের করে দেবে?
ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণায় এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। কম্পিউটারে তৈরি ৬৭২টি পৃথক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখেছেন, সূর্যের শেষ জীবনের পরিবর্তন সৌরমণ্ডলের বাইরের গ্রহগুলির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এই ফলাফল কোনও নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। বরং সূর্যের বিবর্তনের বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে গ্রহগুলির গতিপথ কীভাবে বদলাতে পারে, তারই একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
সূর্যের ভবিষ্যৎ বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে, তার জীবনের শেষ পর্যায়ে কী ঘটতে পারে। বর্তমানে সূর্যের কেন্দ্রে নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম তৈরি হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াতেই বিপুল শক্তি উৎপন্ন হয়, যা পৃথিবীসহ সৌরমণ্ডলের গ্রহগুলিকে আলো ও তাপ দেয়।
কিন্তু সূর্যের কেন্দ্রে ব্যবহারযোগ্য হাইড্রোজেন একসময় কমে আসবে। তখন তার অভ্যন্তরীণ গঠন ও শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটবে। সূর্য ধীরে ধীরে ফুলে উঠবে এবং লাল দৈত্যে পরিণত হবে।
এই পর্যায়ে সূর্যের ব্যাস বর্তমানের তুলনায় অনেক বেড়ে যেতে পারে। তার বাইরের স্তরের তাপমাত্রা কমলেও মোট উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পাবে। সূর্যের এই বিবর্তনের সময় পৃথিবী ও তার আশপাশের গ্রহগুলির পরিবেশ ব্যাপকভাবে বদলে যাবে।
পরবর্তী পর্যায়ে সূর্য তার বাইরের স্তরের অনেকটা অংশ মহাকাশে ছড়িয়ে দেবে। শেষ পর্যন্ত অবশিষ্ট কেন্দ্রটি শ্বেত বামনে পরিণত হবে। এই শ্বেত বামন আর বর্তমান সূর্যের মতো শক্তি উৎপাদন করতে পারবে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি ধীরে ধীরে ঠান্ডা হবে।
বিজ্ঞানীদের মতে, সূর্যের এই শেষ পর্যায়ে পৌঁছতে এখনও কয়েকশো কোটি বছর বাকি। ফলে বিষয়টি বর্তমান পৃথিবীর জন্য তাৎক্ষণিক বিপদের কারণ নয়। তবে সৌরমণ্ডলের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ বুঝতে এই প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সূর্যের চারপাশে গ্রহগুলির কক্ষপথ নির্ভর করে মূলত সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং গ্রহগুলির নিজস্ব গতির উপর। সূর্যের ভর কমে গেলে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণও দুর্বল হবে। এর ফলে গ্রহগুলির কক্ষপথ প্রসারিত হতে পারে।
সহজভাবে বললে, সূর্য যদি ধীরে ধীরে ভর হারায়, তবে তার চারপাশে ঘুরতে থাকা গ্রহগুলি আগের তুলনায় আরও দূরের কক্ষপথে চলে যেতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি গ্রহই সৌরজগৎ ছেড়ে বেরিয়ে যাবে।
বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন সূর্য থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। তাই সূর্যের বাইরের স্তর প্রসারিত হওয়ার সময় এই গ্রহগুলি সরাসরি তার মধ্যে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা নেই বলেই বর্তমান মডেলগুলি ইঙ্গিত দেয়। তবে সূর্যের ভর হারানোর ধরন এবং গ্রহগুলির পারস্পরিক মহাকর্ষীয় প্রভাব তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
এখানেই বিজ্ঞানীদের নতুন গবেষণার গুরুত্ব। আগে ধারণা করা হতো, সূর্য ধীরে ধীরে ভর হারালে বাইরের গ্রহগুলির কক্ষপথ প্রসারিত হলেও সেগুলি দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল থাকতে পারে। কিন্তু সূর্যের ভর হ্রাস যদি সব সময় সমান গতিতে না ঘটে, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
গবেষকেরা কম্পিউটারে ৬৭২টি পৃথক পরিস্থিতি তৈরি করে সৌরমণ্ডলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিভিন্ন সম্ভাবনা পরীক্ষা করেছেন। তাঁদের বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, সূর্য কীভাবে তার বাইরের স্তরের পদার্থ হারাচ্ছে।
সূর্যের ভর কমার প্রক্রিয়াকে সব ক্ষেত্রে একই রকম ধরে না নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন বিবেচনা করা হয়েছে। কিছু পরিস্থিতিতে ভর হ্রাস তুলনামূলকভাবে মসৃণভাবে ঘটেছে। অন্য কিছু মডেলে সূর্যের ভর হারানোর প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক দ্রুত পরিবর্তন বা ঝাঁকুনির মতো পরিস্থিতি পরীক্ষা করা হয়েছে।
এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। সূর্যের ভর ধীরে ধীরে কমলে গ্রহগুলির কক্ষপথ সাধারণত সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। কিন্তু ভর দ্রুত কমে গেলে গ্রহগুলির গতিপথে সাময়িক বা দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এর পাশাপাশি বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুনের পারস্পরিক মহাকর্ষীয় আকর্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। এই চারটি গ্রহ একে অপরের উপর প্রভাব বিস্তার করে। সূর্যের আকর্ষণ দুর্বল হয়ে গেলে তাদের পারস্পরিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ছোট ছোট পরিবর্তন জমতে জমতে কোনও কোনও পরিস্থিতিতে গ্রহগুলির কক্ষপথ অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে।
গবেষণার বিভিন্ন কম্পিউটার মডেলে সৌরমণ্ডলের বাইরের গ্রহগুলির ভবিষ্যৎ একরকম দেখা যায়নি। কিছু পরিস্থিতিতে গ্রহগুলির কক্ষপথ দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল থেকেছে। আবার কিছু পরিস্থিতিতে তাদের গতিপথে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা গিয়েছে।
যেমন, কোনও কোনও মডেলে গ্রহ সৌরজগতের মহাকর্ষীয় বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে বাইরে চলে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অন্য কিছু মডেলে ইউরেনাস ও নেপচুনের কক্ষপথের বিন্যাসে পরিবর্তন দেখা গিয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে, সূর্য শ্বেত বামনে পরিণত হলেই বৃহস্পতি বা শনির মতো গ্রহগুলি নিশ্চিতভাবে সৌরজগৎ ছেড়ে চলে যাবে। বরং গবেষকেরা দেখানোর চেষ্টা করেছেন, সূর্যের ভর হারানোর ধরন এবং গ্রহগুলির পারস্পরিক আকর্ষণের উপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি কতটা আলাদা হতে পারে।
কিছু পরীক্ষায় সূর্যের বিবর্তনের শেষ পর্যায় সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই গ্রহগুলির মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ, সূর্যের পরিবর্তন এবং গ্রহগুলির পারস্পরিক গতিবিধি মিলিয়ে সৌরমণ্ডলের ভবিষ্যৎ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই ফলাফল নির্দিষ্ট কিছু মডেলের উপর নির্ভরশীল। বাস্তবে সূর্য ঠিক কীভাবে ভর হারাবে এবং সেই সময় গ্রহগুলির গতিবিধি কী হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
এই প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। গবেষণায় এমন সম্ভাবনা উঠে এসেছে যে, সূর্যের শেষ পর্যায়ের পরিবর্তনের পরও সৌরমণ্ডলের কিছু বিন্যাস দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল থাকতে পারে। আবার কিছু পরিস্থিতিতে গ্রহগুলির কক্ষপথে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে।
গবেষণায় আলোচিত একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে সূর্য শ্বেত বামনে পরিণত হওয়ার পরবর্তী ৩০০ কোটি বছরের মধ্যে গ্রহব্যবস্থার অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। কিছু মডেলের ক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতার হার সর্বোচ্চ ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানকে বাস্তব সৌরমণ্ডলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সরাসরি সম্ভাব্যতার হিসাব হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি নির্দিষ্ট মডেল ও অনুমানের উপর নির্ভরশীল ফলাফল।
এখানে ‘অস্থিতিশীল’ বলতে সব গ্রহের ধ্বংস হয়ে যাওয়াকে বোঝানো হচ্ছে না। এর অর্থ হতে পারে কক্ষপথের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন, গ্রহগুলির মধ্যে মহাকর্ষীয় সম্পর্কের বদল অথবা কোনও গ্রহের সৌরমণ্ডল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা।
গবেষণাটি দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটারস নামের জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সূর্যের ভবিষ্যৎ বিবর্তন এবং তার প্রভাবে গ্রহগুলির গতিবিধি বোঝার ক্ষেত্রে এই ধরনের কম্পিউটার সিমুলেশন গুরুত্বপূর্ণ।
সৌরমণ্ডলের ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা শুধু কৌতূহল মেটানোর বিষয় নয়। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, একটি নক্ষত্রের জীবনচক্র কীভাবে তার চারপাশে থাকা গ্রহগুলির দীর্ঘমেয়াদি গতিবিধিকে প্রভাবিত করে।
আমাদের সৌরমণ্ডলের মতো অন্য নক্ষত্রের চারপাশেও গ্রহ রয়েছে। সেই নক্ষত্রগুলি যখন জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছবে, তখন তাদের গ্রহগুলির কী হতে পারে, তা বোঝার জন্য সূর্যের ভবিষ্যৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক উদাহরণ।
তবে মনে রাখতে হবে, কম্পিউটার মডেল ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে। সেটি কোনও নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। সূর্যের ভর হ্রাসের প্রকৃত ধরন, গ্রহগুলির পারস্পরিক প্রভাব এবং দীর্ঘ সময়ের মধ্যে অন্যান্য মহাজাগতিক প্রভাবের কারণে বাস্তব ফলাফল আলাদা হতে পারে।
সব মিলিয়ে, সূর্য একদিন শ্বেত বামনে পরিণত হলেও বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুনের ভবিষ্যৎ ঠিক কী হবে, তার চূড়ান্ত উত্তর এখনও বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। নতুন গবেষণা শুধু দেখাচ্ছে, সূর্যের মৃত্যু মানেই সৌরমণ্ডলের বাইরের গ্রহগুলি চিরকাল একই কক্ষপথে ঘুরতে থাকবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।



