সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমঙ্গলে প্রাণের সূত্র মিলতে পারে? ফোবোসের নমুনা নিয়ে আশায় বিজ্ঞানীরা

মঙ্গলে প্রাণের সূত্র মিলতে পারে? ফোবোসের নমুনা নিয়ে আশায় বিজ্ঞানীরা

দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহাকাশযান মঙ্গলের কক্ষপথ থেকে এই উপগ্রহগুলোর ছবি তুলেছে। মঙ্গলের পৃষ্ঠে কাজ করা রোভারও সূর্যের সামনে ফোবোসের অবস্থানের কারণে তৈরি হওয়া গ্রহণের দৃশ্য ধারণ করেছে। কিন্তু এত পর্যবেক্ষণের পরও উপগ্রহ দুটির জন্মের ইতিহাস নিশ্চিতভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি।

মঙ্গলগ্রহকে ঘিরে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। লাল এই গ্রহে একসময় প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, সেখানে পানি ছিল কতটা, কিংবা ভবিষ্যতে মানুষ বসবাস করতে পারবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা। তবে মঙ্গলকে ঘিরে রয়েছে আরও দুটি ছোট অথচ বিস্ময়কর জগৎ, যাদের অস্তিত্ব ও উৎপত্তি আজও বিজ্ঞানীদের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। এরা হলো মঙ্গলের দুই প্রাকৃতিক উপগ্রহ—ফোবোস ও ডেইমোস।

আকারে ছোট, দেখতে অনেকটা অনিয়মিত পাথরের মতো এই দুই উপগ্রহ বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করলেও কীভাবে তারা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই দুই উপগ্রহের গঠন ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করতে পারলে মঙ্গলের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যেতে পারে।

এই রহস্যের সমাধান খুঁজতে জাপানের নেতৃত্বে শুরু হয়েছে মার্টিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন বা MMX অভিযান। এই অভিযানের লক্ষ্য শুধু মঙ্গলের উপগ্রহ দুটির ছবি তোলা নয়; বরং ফোবোসের পৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। সংগৃহীত নমুনায় যদি মঙ্গলের নিজস্ব পাথরের টুকরো পাওয়া যায়, তবে তা লাল গ্রহটির অতীত সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে। এমনকি নমুনায় জৈব অণুর উপস্থিতি পাওয়া গেলে প্রাণের উৎপত্তি সম্পর্কিত গবেষণাতেও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।

কেন মঙ্গলের দুই উপগ্রহকে ঘিরে এত রহস্য?

মঙ্গলের দুই উপগ্রহের মধ্যে ফোবোস আকারে বড় এবং গ্রহটির কাছাকাছি অবস্থান করে। অন্যদিকে, ডেইমোস তুলনামূলক ছোট এবং মঙ্গল থেকে কিছুটা দূরে। দেখতে পাথুরে হলেও এই দুই উপগ্রহের গঠন, পৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্য এবং কক্ষপথের আচরণ বিজ্ঞানীদের সামনে বেশ কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেছে।

মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী আসাফ হল ১৮৭৭ সালে মঙ্গলের এই দুই উপগ্রহ আবিষ্কার করেন। গ্রিক শব্দমূল থেকে আসা ফোবোস নামের অর্থ ভয়, আর ডেইমোসের অর্থ আতঙ্ক। নাম দুটি প্রাচীন রোমান পুরাণে যুদ্ধের দেবতা মার্সের দুই পুত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত।

দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহাকাশযান মঙ্গলের কক্ষপথ থেকে এই উপগ্রহগুলোর ছবি তুলেছে। মঙ্গলের পৃষ্ঠে কাজ করা রোভারও সূর্যের সামনে ফোবোসের অবস্থানের কারণে তৈরি হওয়া গ্রহণের দৃশ্য ধারণ করেছে। কিন্তু এত পর্যবেক্ষণের পরও উপগ্রহ দুটির জন্মের ইতিহাস নিশ্চিতভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি।

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল গ্লাভিনের মতে, ফোবোস ও ডেইমোসের উৎপত্তি সৌরজগতের গঠনসংক্রান্ত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত রহস্য। এই দুই উপগ্রহের নমুনা সরাসরি পরীক্ষা করতে পারলে রহস্যের সমাধানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হতে পারে।

ফোবোসের পরিণতি কী? একদিন কি মঙ্গলে আছড়ে পড়বে?

ফোবোস শুধু রহস্যময় নয়, এর ভবিষ্যৎও বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয়। উপগ্রহটি ধীরে ধীরে মঙ্গলের আরও কাছে চলে আসছে। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১০০ বছরে এটি প্রায় ১ দশমিক ৮ মিটার করে মঙ্গলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান ধারণা অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ কোটি বছর পর ফোবোস মঙ্গলের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে পারে। অন্য সম্ভাবনা হলো, মঙ্গলের কাছাকাছি পৌঁছে মহাকর্ষীয় প্রভাবে ভেঙে গিয়ে গ্রহটিকে ঘিরে পাথুরে বলয় তৈরি করতে পারে।

ফোবোসের পৃষ্ঠে রয়েছে স্টিকনি নামের একটি বিশাল গহ্বর। এর প্রস্থ প্রায় ৯ দশমিক ৭ কিলোমিটার, যা উপগ্রহটির আকারের তুলনায় অত্যন্ত বড়। দীর্ঘ সময় ধরে উল্কাপিণ্ডের আঘাতে এর পৃষ্ঠে অসংখ্য গর্ত তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, ডেইমোসের পৃষ্ঠ ফোবোসের তুলনায় কিছুটা মসৃণ। তবে সেখানেও প্রচুর গর্ত ও ধুলোর উপস্থিতি রয়েছে। দুই উপগ্রহের পৃষ্ঠের গঠন ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের তুলনা করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে চান, তাদের জন্ম একই প্রক্রিয়ায় হয়েছিল কি না।

কীভাবে তৈরি হয়েছিল ফোবোস ও ডেইমোস?

বিজ্ঞানীদের সামনে এখন পর্যন্ত দুটি প্রধান ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথম তত্ত্ব অনুযায়ী, অতীতে একটি বড় মহাজাগতিক বস্তু মঙ্গলে আছড়ে পড়েছিল। সেই সংঘর্ষে মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে বিপুল পরিমাণ পাথর ও অন্যান্য পদার্থ মহাকাশে ছিটকে যায়। পরে সেসব পদার্থ একত্রিত হয়ে ফোবোস ও ডেইমোসের মতো উপগ্রহ তৈরি করতে পারে।

দ্বিতীয় তত্ত্ব অনুযায়ী, উপগ্রহ দুটি আসলে গ্রহাণু। সৌরজগতের অন্য অঞ্চল থেকে আসার সময় এগুলো মঙ্গলের খুব কাছে চলে এসেছিল। তখন মঙ্গলের মহাকর্ষীয় আকর্ষণে আটকা পড়ে গ্রহটিকে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করে।

দুটি ব্যাখ্যারই কিছু যুক্তি রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য কোনো একটি তত্ত্বকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। বিজ্ঞানীদের মতে, ফোবোস ও ডেইমোসের রাসায়নিক গঠন এবং পাথরের নমুনা বিশ্লেষণ করতে পারলে তাদের উৎপত্তি সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

জাপানের MMX অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। নমুনায় কী ধরনের খনিজ, রাসায়নিক উপাদান ও জৈব পদার্থ রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা উপগ্রহ দুটির জন্মের সম্ভাব্য ইতিহাস পুনর্গঠনের চেষ্টা করবেন।

ফোবোসের মাটি সংগ্রহ করবে MMX মহাকাশযান

জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা JAXA-এর নেতৃত্বে পরিচালিত MMX অভিযান আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এতে নাসা, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা, ফ্রান্সের জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা এবং জার্মান মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা যুক্ত রয়েছে।

অভিযানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাকাশযানটি ফোবোস থেকে অন্তত ১০ গ্রাম নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবে। নির্ধারিত পরিকল্পনা সফল হলে ২০৩১ সালে নমুনাগুলো পৃথিবীতে পৌঁছানোর কথা।

মহাকাশযানটিতে রয়েছে তিনটি প্রধান অংশ। এর একটি অংশ মহাকাশযানকে চালনা করবে, একটি অংশ উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ ও নমুনা সংগ্রহের কাজ করবে এবং অন্য অংশ নমুনা নিয়ে পৃথিবীতে ফেরার জন্য ব্যবহৃত হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, মঙ্গলে পৌঁছানোর পর মহাকাশযানটি ফোবোসকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন বছর পর্যবেক্ষণ চালাবে। এ সময় উপগ্রহটির ভূপ্রকৃতি, খনিজ, রাসায়নিক উপাদান এবং মহাকাশের বিকিরণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হবে।

অভিযানের লক্ষ্য মূলত ফোবোস হলেও ডেইমোসকেও পর্যবেক্ষণ করা হবে। দুই উপগ্রহের মিল ও অমিল বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা তাদের উৎপত্তি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়ার আশা করছেন।

ফোবোসের মাটিতে নামবে ছোট রোভার আইডেফিক্স

MMX অভিযানের অন্যতম আকর্ষণ হলো আইডেফিক্স নামের একটি ছোট রোভার। জার্মান মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র এবং ফ্রান্সের জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা যৌথভাবে এটি তৈরি করেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের শুরুর দিকে রোভারটিকে ফোবোসের পৃষ্ঠে নামানো হবে। এর কাজ হবে উপগ্রহটির ভূপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা, বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল চিহ্নিত করা এবং নমুনা সংগ্রহের জন্য উপযুক্ত জায়গা বাছাইয়ে সহায়তা করা।

ফোবোসের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ অত্যন্ত দুর্বল। ফলে রোভারটি পৃষ্ঠে নামার সময় পৃথিবীর মতো শক্তভাবে মাটিতে আছড়ে পড়বে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ৪০ থেকে ১০০ মিটার উচ্চতা থেকে নামার পর এটি লাফিয়ে বা গড়িয়ে স্থিতিশীল অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।

রোভারটির ভর প্রায় ২৫ কিলোগ্রাম। কিন্তু ফোবোসের দুর্বল মহাকর্ষের কারণে সেখানে এর কার্যকর ওজন হবে মাত্র প্রায় ১৫ গ্রাম। এই বৈশিষ্ট্য রোভারটির চলাচল ও পৃষ্ঠে কাজ করার ধরনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করবে।

ফোবোসে অবতরণের পর আইডেফিক্স প্রায় ১০০ দিন ধরে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি সম্ভাব্য নমুনা সংগ্রহের স্থানগুলো পর্যবেক্ষণ করবে এবং মহাকাশযানের মূল অবতরণযন্ত্রের জন্য নিরাপদ জায়গা বাছাইয়ে সাহায্য করবে।

কীভাবে সংগ্রহ করা হবে পাথর ও ধুলোর নমুনা?

ফোবোসের পৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহের জন্য MMX অভিযানে দুটি পদ্ধতি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রথম পদ্ধতিতে একটি বিশেষ কোরিং যন্ত্র দিয়ে পৃষ্ঠের প্রায় ২ সেন্টিমিটার গভীর পর্যন্ত খনন করে নিচের স্তর থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হবে। এই নমুনা একটি বিশেষ নলের মধ্যে সংরক্ষণ করা হবে।

দ্বিতীয় পদ্ধতিতে চাপযুক্ত গ্যাস ব্যবহার করে উপগ্রহের পৃষ্ঠের ধুলো ও ছোট কণাকে ওপরে তুলে সংগ্রহ করা হবে। এভাবেও নমুনা বিশেষ পাত্রে রাখা হবে, যাতে সেগুলো পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা যায়।

বিজ্ঞানীরা ফোবোসের দুটি ভিন্ন অঞ্চল থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে চান। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, উপগ্রহটির পৃষ্ঠের কিছু অংশ তুলনামূলক উজ্জ্বল, অন্য অংশ গাঢ়। এই পার্থক্য দুটি অঞ্চলের উপাদান ও গঠনে ভিন্নতার ইঙ্গিত দিতে পারে।

একটি নমুনা মঙ্গলের দিকে মুখ করে থাকা অংশ থেকে এবং অন্যটি বিপরীত দিক থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে উপগ্রহটির বিভিন্ন অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য তুলনা করার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে ফোবোসে অবতরণ ও নমুনা সংগ্রহ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই প্রথম নমুনা সংগ্রহের পর মহাকাশযানকে আবার কক্ষপথে ফিরে যেতে হবে। পরবর্তী অবতরণস্থল খুঁজে বের করা এবং দ্বিতীয়বার নমুনা সংগ্রহের প্রস্তুতি নিতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করে মিলতে পারে উৎপত্তির সূত্র

ফোবোসের নমুনা পৃথিবীতে পৌঁছানোর আগেই মহাকাশযানে থাকা বিভিন্ন যন্ত্র থেকে বিজ্ঞানীরা তথ্য পাবেন। এসব যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে MEGANE নামের গামা রশ্মি ও নিউট্রন বিশ্লেষক।

এই যন্ত্রের সাহায্যে ফোবোস ও ডেইমোসের পৃষ্ঠে হাইড্রোজেন, সোডিয়াম ও ক্লোরিনের মতো বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে সহজে বাষ্পীভূত হতে পারে এমন উপাদানের পরিমাণ উপগ্রহ দুটির উৎপত্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।

যদি কোনো বড় সংঘর্ষের ফলে মঙ্গলের উপাদান ছিটকে গিয়ে উপগ্রহ তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সংঘর্ষের সময় প্রচণ্ড তাপের কারণে কিছু উদ্বায়ী উপাদান হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, কিছু গ্রহাণুতে এসব উপাদানের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।

তাই ফোবোসে কোন উপাদান কতটা রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সংঘর্ষের তত্ত্ব ও গ্রহাণু আটকে পড়ার তত্ত্বের মধ্যে কোনটি বেশি গ্রহণযোগ্য, সে সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।

এ ছাড়া MMX মহাকাশযানে থাকা ইনফ্রারেড স্পেকট্রোমিটারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই যন্ত্রের সাহায্যে ফোবোসের খনিজ, জৈব পদার্থ এবং পানির সঙ্গে সম্পর্কিত উপাদান শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে।

এসব তথ্য শুধু উপগ্রহ দুটির ইতিহাস বোঝার জন্য নয়, মঙ্গলের প্রাচীন পরিবেশ সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ফোবোসে কি মঙ্গলের পাথরের টুকরো পাওয়া যাবে?

বিজ্ঞানীদের অন্যতম আগ্রহের বিষয় হলো, ফোবোসের পৃষ্ঠে মঙ্গলের নিজস্ব উপাদান মিশে রয়েছে কি না।

মঙ্গলের পৃষ্ঠে উল্কাপিণ্ডের আঘাত বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় পাথর ও ধুলো মহাকাশে ছিটকে যেতে পারে। সেসব উপাদানের কিছু অংশ ফোবোসের মহাকর্ষীয় আকর্ষণে এর পৃষ্ঠে জমা হয়ে থাকতে পারে।

যদি ফোবোসের নমুনায় মঙ্গলের পাথরের টুকরো পাওয়া যায়, তাহলে পৃথিবীতে বসেই সেগুলো পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি হবে। এতে মঙ্গলের প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক গঠন, খনিজ এবং পরিবেশ সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য জানা যেতে পারে, যা সরাসরি মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে সংগ্রহ করা নমুনা ছাড়া পাওয়া কঠিন।

ফোবোসের নমুনা তাই একই সঙ্গে দুটি জগতের ইতিহাস জানার সুযোগ তৈরি করতে পারে—একদিকে মঙ্গলের উপগ্রহের উৎপত্তি, অন্যদিকে লাল গ্রহটির অতীত।

প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা

MMX অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ফোবোসের নমুনায় অ্যামিনো অ্যাসিড এবং প্রাণের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য জৈব অণুর সন্ধান করা।

অ্যামিনো অ্যাসিড হলো প্রোটিন তৈরির মৌলিক উপাদান। পৃথিবীর জীবজগতে প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে কোনো গ্রহ বা উপগ্রহে অ্যামিনো অ্যাসিড পাওয়া গেলেই সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এসব অণু কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং কোন পরিবেশে এসেছে, তা বোঝার জন্য আরও বিশদ বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

বিজ্ঞানীরা যদি ফোবোসের নমুনায় জৈব অণু খুঁজে পান, তাহলে সেগুলোর সংখ্যা, গঠনগত জটিলতা এবং পারস্পরিক অনুপাত বিশ্লেষণ করবেন। এসব বৈশিষ্ট্য থেকে অণুগুলোর সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

ফোবোস যদি গ্রহাণু বা ধূমকেতু থেকে আসা কোনো বস্তু হয়ে থাকে, তাহলে সেটি সৌরজগতের বাইরের অঞ্চল থেকে পানি ও জৈব উপাদান বহন করে এনে থাকতে পারে। অন্যদিকে, উপগ্রহটি যদি মঙ্গলের পাথর থেকে তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে এর নমুনা লাল গ্রহটির প্রাচীন পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে।

বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বড় জায়গা এখানেই। মঙ্গলে অতীতে প্রাণের উদ্ভব হয়েছিল কি না, অথবা প্রাণ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সেখানে পৌঁছেছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফোবোসের নমুনা নতুন সূত্র দিতে পারে।

তবে এই অভিযান সরাসরি মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্ব প্রমাণ করার অভিযান নয়। বরং মঙ্গলের ইতিহাস, উপগ্রহের উৎপত্তি এবং প্রাণ সৃষ্টির উপযোগী রাসায়নিক উপাদানের সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা।

চীনের মঙ্গল অভিযানও গুরুত্বপূর্ণ

মঙ্গলের উপাদান পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার প্রতিযোগিতায় জাপানের MMX একমাত্র অভিযান নয়। চীনও তিয়ানওয়েন-৩ নামে একটি অভিযানের পরিকল্পনা করেছে, যার লক্ষ্য সরাসরি মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পরিকল্পনা অনুযায়ী, চীনের অভিযান ২০২৮ সালে উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছিল এবং ২০৩১ সালে নমুনা পৃথিবীতে ফেরানোর পরিকল্পনা ছিল।

MMX ও তিয়ানওয়েন-৩-এর লক্ষ্য এক নয়। জাপানের অভিযান মূলত ফোবোস থেকে নমুনা সংগ্রহ করবে, আর চীনের পরিকল্পনা সরাসরি মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে নমুনা আনার। দুটি অভিযান সফল হলে মঙ্গল ও তার পরিবেশ সম্পর্কে গবেষণায় নতুন তথ্য যুক্ত হতে পারে।

মঙ্গল সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষা

ফোবোস ও ডেইমোস দেখতে ছোট হলেও তাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে সৌরজগতের প্রাচীন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। এই দুই উপগ্রহের উৎপত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা পাওয়া গেলে মঙ্গল কীভাবে গঠিত হয়েছিল, তার প্রাথমিক পরিবেশ কেমন ছিল এবং সৌরজগতের অন্যান্য পাথুরে বস্তু কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সুবিধা হবে।

MMX অভিযানের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা শুধু দূর থেকে ছবি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবেন না। ফোবোসের পৃষ্ঠে রোভার পাঠানো, বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ এবং সেগুলো পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে পরীক্ষার পরিকল্পনা রয়েছে।

অভিযানের ফলাফল নির্ভর করবে নমুনা সংগ্রহের সাফল্য এবং পরবর্তী বিশ্লেষণের ওপর। তবে নমুনায় মঙ্গলের পাথর, বিশেষ খনিজ কিংবা জৈব অণু পাওয়া গেলে তা মহাকাশবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আগামী দশকের শুরুতে এই অভিযানের ফলাফল বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন প্রশ্নের পাশাপাশি কিছু পুরোনো রহস্যের উত্তরও তুলে ধরতে পারে। মঙ্গলের দুই ছোট উপগ্রহের উৎপত্তি থেকে শুরু করে লাল গ্রহের অতীত—সব মিলিয়ে ফোবোস ও ডেইমোসের অনুসন্ধান সৌরজগতকে বোঝার ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ