এনবি সংবাদ ডেস্ক : মৎস্যকন্যা বা জলপরী—অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক মাছের এই কাল্পনিক চরিত্রটি নিয়ে মানুষের কৌতূহল বহু শতাব্দীর। সাহিত্য, লোককথা, পুরাণ থেকে শুরু করে আধুনিক সিনেমা ও অ্যানিমেশন—সব জায়গাতেই নানা রূপে দেখা গেছে জলপরীর উপস্থিতি। কখনও তারা সৌভাগ্যের প্রতীক, কখনও আবার সমুদ্রযাত্রার অশুভ সংকেত। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এই জলজ চরিত্রের নাম ও গল্প বদলেছে, কিন্তু মানুষের কল্পনায় এর আবেদন এখনও অটুট।
সম্প্রতি বাংলাদেশের নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার একটি পুকুরে ‘জলপরী’ দেখা গেছে—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে ওই পুকুরের পাশে ভিড় করেন কৌতূহলী মানুষ। এমনকি স্থানীয়ভাবে পূজা-অর্চনার ঘটনাও ঘটে। পরে প্রশাসন পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরে জানায়, সেখানে জলপরীর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
তাহলে জলপরীর এই ধারণা এল কোথা থেকে? হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বের নানা সভ্যতায় কেন এই অদ্ভুত প্রাণীর গল্প ছড়িয়ে আছে?
নরসিংদীর পুকুরে কি সত্যিই জলপরী দেখা গিয়েছিল?
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার আলালপুর গ্রামের একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুরকে ঘিরেই সম্প্রতি জলপরীর গুজব ছড়ায়। পুকুরটিতে রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ চাষ করা হয়।
স্থানীয় এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ফেসবুকে পুকুরের পানিতে কালো অবয়বের কিছু একটা সাঁতার কাটার ভিডিও প্রকাশ করার পরই গুজবের সূত্রপাত হয় বলে জানিয়েছেন মনোহরদীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। ভিডিওতে পানির উপরিভাগের কাছাকাছি একটি কালো আকৃতির বস্তু নড়াচড়া করতে দেখা যায়। এরপর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ‘জলপরী’ দেখার খবর।
গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ পুকুরের কাছে ভিড় করতে শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রশাসন ও পুলিশ সেখানে যায়। পুকুরের মালিকও বিষয়টি জানতে পেরে গ্রামে ফিরে আসেন এবং প্রশাসনের সহায়তা চান।
পরে পুরো পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা হয়। প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, পুকুরে মাছ ছাড়া অন্য কোনো অস্বাভাবিক প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পানিতে একসঙ্গে মাছের ঝাঁক চলাচল করলে দূর থেকে সেটিকে বড় কোনো প্রাণীর নড়াচড়া বলে মনে হতে পারে।
অর্থাৎ, নরসিংদীর ঘটনাটি জলপরীর অস্তিত্বের প্রমাণ নয়; বরং একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া গুজব হিসেবেই বিষয়টি সামনে এসেছে।
মারমেইড শব্দের অর্থ কী?
ইংরেজি ‘Mermaid’ শব্দটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে তৈরি—‘Mer’ এবং ‘Maid’। ‘Mer’ শব্দটির সঙ্গে সমুদ্রের অর্থ জড়িয়ে আছে, আর ‘Maid’ বলতে মেয়ে বা যুবতীকে বোঝানো হয়।
সাধারণভাবে মারমেইড বলতে এমন একটি পৌরাণিক জলজ প্রাণীকে বোঝানো হয়, যার শরীরের ওপরের অংশ মানুষের মতো এবং নিচের অংশ মাছের মতো। যদিও প্রচলিত ছবিতে সাধারণত নারী মৎস্যকন্যার উপস্থিতিই বেশি দেখা যায়, বিভিন্ন লোককথায় পুরুষ মারমেইড বা ‘মারম্যান’-এরও উল্লেখ রয়েছে।
লোককথায় জলপরীদের কখনও জাদুকরী ক্ষমতাসম্পন্ন, দীর্ঘজীবী ও রহস্যময় প্রাণী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার কোথাও তাদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতার মতো অতিপ্রাকৃত বৈশিষ্ট্যও যুক্ত করা হয়েছে।
জলপরী কি সৌভাগ্যের প্রতীক, নাকি অমঙ্গলের?
জলপরীকে নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা রয়েছে। কোনো কোনো সমাজে তারা সমুদ্র, জীবন, উর্বরতা ও সৌভাগ্যের প্রতীক। আবার অন্য অনেক লোককথায় জলপরী বিপদ, ঝড়, জাহাজডুবি কিংবা মৃত্যুর পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
বিশেষ করে প্রাচীন নাবিকদের গল্পে মৎস্যকন্যার উপস্থিতি ছিল রহস্য ও আতঙ্কে ঘেরা। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা নাবিকদের কাছে পানির ওপর ভেসে আসা কোনো অদ্ভুত শব্দ, ছায়া বা নারীর মতো অবয়ব সহজেই রহস্যময় কাহিনির জন্ম দিতে পারত।
কিছু লোককথায় আবার মানুষের সঙ্গে জলপরীর বিয়ের গল্পও পাওয়া যায়। এমন গল্পে জলপরীর টুপি, বেল্ট, চিরুনি বা আয়নার মতো কোনো জিনিস লুকিয়ে রাখার কথা বলা হয়। যতক্ষণ সেই জিনিসটি জলপরী খুঁজে না পায়, ততক্ষণ সে মানুষের সঙ্গে বসবাস করে—এমন কাহিনিও বিভিন্ন সংস্কৃতিতে প্রচলিত।
জলপরীর মিথের উৎপত্তি কোথায়?
মৎস্যকন্যার গল্প ঠিক কবে এবং কোথায় প্রথম তৈরি হয়েছিল, তার নির্দিষ্ট উত্তর নেই। তবে মানবসভ্যতার বহু প্রাচীন সময় থেকেই পানির সঙ্গে যুক্ত অতিপ্রাকৃত প্রাণী ও দেবতার গল্প পাওয়া যায়।
মেসোপটেমীয় সংস্কৃতিতে পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এক পুরুষ মৎস্যদেবতার কাহিনির উল্লেখ পাওয়া যায়। কেলডীয় সাগরের দেবতা ইয়া বা ওয়ানেস সম্পর্কে বলা হতো, তিনি প্রতিদিন সমুদ্র থেকে উঠে আসতেন এবং রাতে আবার সমুদ্রে ফিরে যেতেন।
এরপর প্রাচীন সিরিয়ার কাহিনিতে আতারগাতিস নামে এক দেবীর গল্প পাওয়া যায়। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, তিনি মাছের রূপ ধারণের জন্য পানিতে ডুব দিয়েছিলেন। কিন্তু তার সৌন্দর্যের কারণে দেবতারা তার পুরো শরীরকে মাছের রূপ দেননি। ফলে শরীরের নিচের অংশ মাছের মতো হলেও ওপরের অংশ মানবীর মতো থেকে যায়।
এ ধরনের গল্প থেকেই পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সভ্যতায় মানুষের সঙ্গে জলজ প্রাণীর মিশ্র রূপের পৌরাণিক ধারণা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
গ্রিক পুরাণের ‘সাইরেন’ কি আসলে জলপরী?
মৎস্যকন্যার ইতিহাসে ‘সাইরেন’ নামটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিক পুরাণে সাইরেনদের এমন প্রাণী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল, যারা নিজেদের আকর্ষণীয় কণ্ঠের মাধ্যমে নাবিকদের প্রলুব্ধ করত।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রাচীনতম বর্ণনায় সাইরেনদের শরীর পুরোপুরি মাছের মতো ছিল না। তাদের পাখির মতো শরীরের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে শিল্প ও লোককথায় তাদের মাছের লেজযুক্ত নারী হিসেবে দেখানো শুরু হয়। ফলে সময়ের সঙ্গে সাইরেন ও মৎস্যকন্যার ধারণা অনেক ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।
আফ্রিকার ‘মামি ওয়াটা’
আফ্রিকার পশ্চিম, দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলেও জল-সম্পর্কিত পৌরাণিক চরিত্রের প্রচলন রয়েছে। ‘মামি ওয়াটা’ তাদের মধ্যে অন্যতম।
‘মামি ওয়াটা’ শব্দের অর্থের সঙ্গে ‘জলের মা’ বা ‘জলই মা’-এর ধারণা যুক্ত। আফ্রিকার বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এই জল-দেবতা বা আত্মার গল্প একেকভাবে প্রচলিত হয়েছে। ঔপনিবেশিকতা ও দাসপ্রথার বিস্তারের সময় এসব কাহিনি আফ্রিকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।
রুসালকি, মেরোজ ও সেলকি—নাম আলাদা, গল্পে মিল
স্লাভিক লোককথায় জলপরী বা জল-দেবতার একটি পরিচিত নাম ‘রুসালকি’। শুরুতে তাদের উর্বরতা ও কৃষির কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা হলেও পরবর্তী সময়ে তাদের অনেক গল্পে ভয়ংকর রূপ দেওয়া হয়।
আয়ারল্যান্ডের লোককথায় আবার জলপরী ‘মেরোজ’ নামে পরিচিত। নারী মেরোজদের সুন্দর চেহারা ও লম্বা সবুজ চুলের কথা বলা হয়। অন্যদিকে পুরুষ মেরোজদের অত্যন্ত কুৎসিত ও নিষ্ঠুর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
স্কটল্যান্ডের ‘সেলকি’ চরিত্রটিও জলপরীর গল্পের সঙ্গে তুলনীয়। সেলকিরা সমুদ্রে সিল মাছের মতো জীবনযাপন করে এবং ডাঙায় উঠে মানুষের রূপ ধারণ করতে পারে—এমন লোককথা প্রচলিত রয়েছে।
ইউরোপের মেলুসিনা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সুবর্ণমচ্ছা
মধ্যযুগীয় ইউরোপের বিভিন্ন কাহিনিতে ‘মেলুসিনা’ নামে এক জলপরীর গল্প পাওয়া যায়। কখনও তার লেজকে সাপের মতো, কখনও মাছের মতো এবং কোথাও আবার ডানাসহ দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লোককথায় রয়েছে ‘সুবর্ণমচ্ছা’। নামটির অর্থ ‘সোনালী মাছ’। রামায়ণের বিভিন্ন সংস্করণে এই চরিত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। কাহিনি অনুযায়ী, হনুমান সমুদ্রের ওপর পাথর দিয়ে সেতু নির্মাণের সময় সুবর্ণমচ্ছা তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয় এবং সুবর্ণমচ্ছা সেতু নির্মাণে সাহায্য করেন।
বর্তমানে কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ও লাওসের বিভিন্ন প্রতীক, তাবিজ ও সাংস্কৃতিক উপস্থাপনায় সুবর্ণমচ্ছার ছবি দেখা যায়।
হ্যানস ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসেন থেকে ডিজনির ‘দ্য লিটল মারমেইড’
আধুনিক বিশ্বে মৎস্যকন্যাকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে সাহিত্যের বড় ভূমিকা রয়েছে। ডেনিশ লেখক হ্যানস ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসেনের ‘দ্য লিটল মারমেইড’ জলপরীকে বিশ্বজুড়ে আরও পরিচিত করে তোলে।
১৮৩৭ সালে প্রকাশিত এই রূপকথা পরবর্তী সময়ে থিয়েটার, অপেরাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে ১৯৮৯ সালে ডিজনির অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ‘দ্য লিটল মারমেইড’ চরিত্রটিকে নতুন প্রজন্মের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলে।
শুধু গল্প বা সিনেমাতেই নয়, ইউরোপের চিত্রকলা ও রাজকীয় প্রতীকেও বিভিন্ন সময়ে মৎস্যকন্যার উপস্থিতি দেখা গেছে। ফলে জলপরী ধীরে ধীরে শুধু লোককথার চরিত্র না থেকে সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি ও জনপ্রিয় বিনোদনের অংশ হয়ে উঠেছে।
তাহলে মানুষ এখনও জলপরীতে বিশ্বাস করে কেন?
সমুদ্র মানুষের কাছে প্রাচীনকাল থেকেই রহস্যময়। বিশাল জলরাশি, অজানা গভীরতা, অদ্ভুত সামুদ্রিক প্রাণী এবং দূর সমুদ্রযাত্রার ঝুঁকি—সব মিলিয়ে সমুদ্রকে ঘিরে অসংখ্য কল্পকাহিনির জন্ম হয়েছে।
প্রাচীনকালে দূর থেকে দেখা সামুদ্রিক প্রাণী, পানিতে ভাসমান কোনো বস্তু কিংবা অস্বাভাবিক ঢেউয়ের গতিবিধি মানুষের চোখে ভিন্ন কিছু মনে হতে পারত। সেই অভিজ্ঞতা মুখে মুখে ছড়িয়ে একসময় লোককথায় পরিণত হয়েছে—এমন ধারণা জলপরীর মিথের ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ।
তবে আধুনিক বিজ্ঞান ও সামুদ্রিক গবেষণায় মানুষের মতো ওপরের অংশ এবং মাছের লেজযুক্ত কোনো বাস্তব প্রাণীর অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই জলপরী মূলত মানবসভ্যতার দীর্ঘদিনের পৌরাণিক কল্পনা, লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক গল্পের অংশ।
নরসিংদীর সাম্প্রতিক ঘটনাটিও দেখিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ভিডিও কত দ্রুত মানুষের মধ্যে কৌতূহল ও গুজব তৈরি করতে পারে। পুকুরের মাছের স্বাভাবিক চলাচলকে জলপরীর উপস্থিতি হিসেবে দেখানো হলে তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই অস্বাভাবিক কোনো দৃশ্য বা ভিডিও দেখলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়ার বদলে তথ্য যাচাই করাই সবচেয়ে জরুরি।



