ফ্রান্সের অর্থনীতি এখন এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যার সঙ্গে অনেকেই মিল খুঁজে পাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতির। সরকারের বিপুল ঋণ, সেই ঋণের সুদ পরিশোধে বাড়তে থাকা ব্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক মতবিরোধ—সব মিলিয়ে চাপে পড়েছে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে কর বাড়ানো কিংবা সরকারি ব্যয় কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আর্থিক সংকট মোকাবিলায় যে ধরনের রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন, ফ্রান্সের বিভক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে তা তৈরি করা সহজ নয়। ফলে সরকারের সামনে একদিকে ঋণের বোঝা কমানোর চাপ, অন্যদিকে জনরোষ সামলানোর চ্যালেঞ্জ।
এই পরিস্থিতি কি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও সতর্কবার্তা? আমেরিকার সরকারি ঋণ, বাজেট ঘাটতি এবং সুদ পরিশোধের ব্যয়ও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই ধরনের আর্থিক চাপের মুখে রয়েছে যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি পশ্চিমা অর্থনীতি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ফ্রান্সের মতো সংকটে কি একসময় পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রও?
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুই দেশের সমস্যার মধ্যে কিছু মিল থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলারের অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল অর্থনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি আমেরিকাকে আপাতত বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। তাই ফ্রান্সের মতো পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রে অবিলম্বে তৈরি হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক কম। তবে এর অর্থ এই নয় যে আমেরিকার ঋণসংকটের ঝুঁকি নেই।
ফ্রান্সের বর্তমান আর্থিক সমস্যার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সরকারি ব্যয়, ক্রমবর্ধমান ঋণ এবং সেই ঋণ পরিশোধের বাড়তি খরচ। কয়েক দশক ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য জনকল্যাণমূলক খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকেরা নানা সুবিধা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও কিছু রাজনীতিক বহু বছর ধরেই সতর্ক করে আসছেন, সরকারি ব্যয় এবং আয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে একসময় তার মূল্য দিতে হবে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় নয়—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন সেই সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি। সরকার যখন নতুন ঋণ নেয় কিংবা পুরোনো ঋণ পুনরায় অর্থায়ন করে, তখন সুদের হার বেশি হলে ব্যয়ও বেড়ে যায়। অর্থাৎ, আগের মতো একই পরিমাণ ঋণ বজায় রাখতেও সরকারকে বেশি অর্থ খরচ করতে হয়।
মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১১৯ শতাংশে পৌঁছেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত ৬০ শতাংশ ঋণ-জিডিপি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি প্রায় দ্বিগুণ। অন্যদিকে, দেশটির বার্ষিক বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫.৪ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ফ্রান্সের অর্থনীতিতে সরকারের ঋণের বোঝা কতটা বড় হয়ে উঠেছে। সরকারের আয় দিয়ে ব্যয়ের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হলে ঘাটতি পূরণে আরও ঋণ নিতে হয়। এর ফলে ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের খরচও বাড়তে পারে।
কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক নীতিবিষয়ক অধ্যাপক পিটার টেলর-গুবির বক্তব্য অনুযায়ী, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সরকারগুলোর ঋণ নেওয়ার খরচ এবং বন্ডের সুদের হার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তাঁর মতে, সমস্যাটিকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা হলে তা আরও গুরুতর সংকটে পরিণত হতে পারে।
এখানে বন্ডের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যখন অর্থ সংগ্রহের জন্য সরকারি বন্ড বিক্রি করে, তখন বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট শর্তে সেই বন্ড কেনেন। সরকারকে পরে নির্ধারিত সুদসহ অর্থ ফেরত দিতে হয়। বিনিয়োগকারীরা যদি বেশি সুদ দাবি করেন, তাহলে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যায়।
অর্থাৎ, শুধু ঋণের পরিমাণ বেশি হলেই সমস্যা তৈরি হয় না। সেই ঋণের জন্য সরকারকে কত সুদ দিতে হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের ঋণসংকটের সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সম্পর্কও রয়েছে। মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ পরিস্থিতি পশ্চিমা দেশগুলোর আর্থিক সমস্যাকে আরও জটিল করেছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, উৎপাদন, বিদ্যুৎ এবং বিভিন্ন পরিষেবার খরচও বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়।
জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলে সরকারকে নাগরিকদের সহায়তা দিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে সরকারের কর আদায়ের গতিও কমে যেতে পারে। ফলে একদিকে ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে একাধিক কঠিন সিদ্ধান্তের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। জ্বালানির বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে সহায়তা দেওয়া হলে বাজেটের ওপর চাপ বাড়তে পারে। আবার ব্যয় কমানোর জন্য সহায়তা প্রত্যাহার করা হলে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বেড়ে গেলে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়তে পারে। ফলে জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং ঋণের সুদ—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করলে সরকারি অর্থব্যবস্থা আরও চাপে পড়ে।
ফ্রান্সের সমস্যা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি পশ্চিমা অর্থনীতিতে সরকারি ঋণ এবং সুদ পরিশোধের ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের তথ্য উদ্ধৃত করে মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জি৭ দেশগুলোর ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের গড় সুদের হার ১ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর ফলে হারটি প্রায় ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জি৭ হলো বিশ্বের কয়েকটি প্রধান উন্নত অর্থনীতির একটি জোট। এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, কানাডা ও জাপান।
মূল প্রতিবেদনে আইএমএফের পূর্বাভাসের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দশকের শেষ নাগাদ এই সাত দেশের সম্মিলিত সরকারি ঋণ তাদের সম্মিলিত অর্থনৈতিক উৎপাদনকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন পরিস্থিতি এই প্রথম দেখা যেতে পারে বলে সেখানে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এ ধরনের পূর্বাভাস সরকারি অর্থব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির দিকে ইঙ্গিত করে। তবে সব দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এক নয়। কোনো দেশের ঋণ বেশি হলেও তার অর্থনীতি দ্রুত বাড়তে পারে, আবার কোনো দেশের ঋণের পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকলে ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সরকারের ঋণের ঝুঁকি নির্ধারণে তাই শুধু মোট ঋণের পরিমাণ নয়, প্রবৃদ্ধির হার, সুদের ব্যয়, রাজস্ব আদায় এবং ঋণ নেওয়ার শর্তও বিবেচনা করতে হয়।
ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবে সহজ নয়।
কর বাড়ানো হলে নাগরিকদের হাতে ব্যয়ের জন্য কম অর্থ থাকতে পারে। আবার সরকারি ব্যয় কমানো হলে সামাজিক নিরাপত্তা, জনসেবা কিংবা অন্যান্য সরকারি সুবিধায় প্রভাব পড়তে পারে। ফলে আর্থিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ জনমতের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে যেতে পারে।
প্রথম দেখায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ফ্রান্সের অনেক মিল রয়েছে। আমেরিকার সরকারি ঋণও বিশাল, বাজেট ঘাটতিও বড় এবং ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।
মূল প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির ঋণের পরিমাণ তার বার্ষিক জিডিপির প্রায় সমান। এ ছাড়া সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি ছিল প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৬ শতাংশেরও বেশি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের বার্ষিক ব্যয় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এটি দেশটির মোট কেন্দ্রীয় বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ।
অর্থাৎ, সরকারের রাজস্বের বড় একটি অংশ শুধু আগের নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই ব্যয় হচ্ছে। এই অর্থ সরাসরি নতুন কোনো জনসেবা, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ব্যবহার করা যায় না।
সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় যত বাড়ে, অন্যান্য খাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে তত বেশি চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে ঘাটতি মেটাতে নতুন ঋণ নিতে হলে ভবিষ্যতে সুদের বোঝাও আরও বাড়তে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। দেশটি বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলারের অবস্থান থেকে সুবিধা পায়। পাশাপাশি এর অর্থনীতি বিশাল এবং বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত।
এই দুই বৈশিষ্ট্য যুক্তরাষ্ট্রকে আপাতত ফ্রান্সের তুলনায় বেশি আর্থিক সুবিধা দিচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা হলো, এই সুবিধাকে দায়িত্বশীল আর্থিক নীতির বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি হলো মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন পণ্যের লেনদেনে ডলারের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। তেল ও সোনার মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারেও ডলারের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
বিশ্বের বহু প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারে সম্পদ ধরে রাখে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো, দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ডলারকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম নির্ভরযোগ্য মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
এই চাহিদা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বিশেষ সুবিধা দেয়। মার্কিন সরকার যখন ঋণ সংগ্রহের জন্য ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে, তখন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সেই বন্ড কেনেন। মার্কিন ট্রেজারি বন্ডকে সাধারণত বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ফলে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়লেও বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মার্কিন সরকারি বন্ডের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এর ফলে বন্ডের চাহিদা বজায় থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র অন্য অনেক দেশের তুলনায় কম সুদে ঋণ সংগ্রহের সুযোগ পেতে পারে।
মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন পশ্চিমা অর্থনীতিতে সরকারি বন্ডের সুদের হার বাড়লেও মার্কিন বন্ডের হার তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে। শেয়ারবাজারে দরপতনের সময়ও বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকেছেন, যার ফলে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের চাহিদা বেড়েছে।
তবে এই সুবিধা স্থায়ী বা সীমাহীন নয়। বিনিয়োগকারীরা যদি ভবিষ্যতে মার্কিন সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আস্থা হারান, তাহলে বন্ডের সুদের হার বাড়তে পারে। তাতে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়ে যাবে।
অর্থাৎ, ডলারের আন্তর্জাতিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি সময় ও সুবিধা দিলেও তা ঋণসংকটের সব ঝুঁকি দূর করে না।
যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বড় সুবিধা হলো তার বিশাল ও বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি। দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রযুক্তি, শিল্প, পরিষেবা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি এবং আরও নানা খাতে বিস্তৃত।
কোনো একটি খাতে দুর্বলতা দেখা দিলেও অন্য খাতের প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে ঘিরে বিনিয়োগ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
এআই প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য ডেটা সেন্টার, কম্পিউটিং অবকাঠামো, উন্নত চিপ, সফটওয়্যার এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজন হয়। এসব ক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগ নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করতে পারে।
মূল প্রতিবেদনে অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, এআই খাতে বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করছে। অন্য কয়েকটি খাতে স্থবিরতা বা দুর্বলতা দেখা গেলেও প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মুডিজ অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডির মতে, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে মিল থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এআইয়ের অবদান ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক চাপ মোকাবিলাকে তুলনামূলক সহজ করে তুলতে পারে।
এর পেছনের যুক্তিটি হলো, অর্থনীতির আকার দ্রুত বাড়তে থাকলে একই পরিমাণ ঋণ মোট উৎপাদনের তুলনায় ছোট হয়ে দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঋণের বোঝা সামলানোর সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
তবে এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে বলেই যুক্তরাষ্ট্রের ঋণসংকট কখনও তৈরি হবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই। ভবিষ্যতে প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে কিংবা অন্য খাতে বড় ধাক্কা এলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
তাই এআইকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হিসেবে দেখা গেলেও সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন থেকেই যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ফ্রান্সের তুলনায় বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে—এমন বিশ্লেষণের অর্থ এই নয় যে দেশটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা আদর্শ।
অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডি সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে অবিলম্বে ফ্রান্সের মতো ঋণসংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা কম হলেও এ থেকে আত্মতুষ্টির কোনো কারণ নেই। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে অন্য অবস্থানে রয়েছে, কিন্তু ঋণসংক্রান্ত সমস্যাগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
দীর্ঘদিন ধরে বাজেট ঘাটতি বজায় থাকলে সরকারের মোট ঋণ বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে সুদের হার বৃদ্ধি পেলে ঋণ পরিশোধের খরচও বাড়ে। তখন সরকারকে নতুন ঋণ নেওয়া, কর বাড়ানো কিংবা ব্যয় কমানোর মতো সিদ্ধান্তের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা প্রযোজ্য। ডলারের আন্তর্জাতিক চাহিদা এবং এআই খাতের প্রবৃদ্ধি সরকারকে সুবিধা দিলেও তা অনির্দিষ্টকাল ধরে একইভাবে কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সুদের ব্যয় অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সীমিত করতে পারে।
এই কারণেই অর্থনীতিবিদদের মতে, আর্থিক সংকট এখনই আসছে না বলে ঋণের সমস্যাকে অবহেলা করা উচিত নয়।
ইউরোপের একটি বড় অর্থনীতি আর্থিক সংকটে পড়লে অন্য দেশগুলোর ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আর্থিক ব্যবস্থার পারস্পরিক সংযোগ রয়েছে।
ফ্রান্সের সরকারি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে বিনিয়োগকারীরা দেশটির বন্ডের ঝুঁকি নতুন করে মূল্যায়ন করতে পারেন। এতে বন্ডের সুদের হার আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা অন্য দেশের ঋণ নিয়েও সতর্ক হয়ে উঠতে পারেন।
তবে অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ফ্রান্সের বর্তমান আর্থিক সমস্যার প্রভাব ইউরোপজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তুলনামূলক কম।
মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফ্রান্সের আর্থিক পরিস্থিতিতে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন দেখছে না। তবে পরিস্থিতি গুরুতর হলে সদস্য দেশগুলোর বন্ড কেনার মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু কেনিংহামের মতে, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনে বন্ড কেনার মাধ্যমে সম্ভাব্য আর্থিক সংক্রমণ সীমিত করতে পারে।
এ ধরনের পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হতে পারে বাজারে অতিরিক্ত অস্থিরতা কমানো এবং কোনো একটি দেশের বন্ডসংক্রান্ত সংকট যাতে অন্য দেশগুলোর অর্থায়নের খরচ বাড়িয়ে না দেয়, তা নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া ইউরোপের সব দেশের আর্থিক অবস্থাও এক নয়। মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েকটি দেশের বাজেট ঘাটতি ফ্রান্সের তুলনায় অনেক কম। কিছু দেশ চলতি বছরে বাজেট উদ্বৃত্তও অর্জন করতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
ফলে ফ্রান্সের সমস্যা থাকলেও ইউরোপের প্রতিটি দেশ একই ধরনের পরিস্থিতিতে রয়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
ফ্রান্সের আর্থিক পরিস্থিতির সঙ্গে দেশটির রাজনৈতিক অবস্থানেরও সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে ফ্রান্স একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ। এই কাঠামোর মধ্যে দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নীতিগত সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে।
মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের বাম ও ডান—দুই রাজনৈতিক ধারার দলই ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। এর মধ্যে কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিক মেরিন লে পেনও রয়েছেন, যিনি একসময় ফ্রান্সকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের করে আনার পক্ষে কথা বলেছিলেন।
তবে তাঁর অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জার্মানির কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে কথা বললেও দলটি এখনই সরকার গঠনের কাছাকাছি নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই রাজনৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবেও প্রভাব পড়তে পারে। তবে ফ্রান্সের বর্তমান আর্থিক সংকটকে সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার সংকেত হিসেবে দেখা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থায় একটি বিশেষ রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে, যার নাম ঋণসীমা বা ডেট সিলিং। মার্কিন সরকার কতটা ঋণ নিতে পারবে, তার একটি আইনি সীমা রয়েছে। সরকার সেই সীমায় পৌঁছালে কংগ্রেসকে ঋণসীমা বাড়ানো বা স্থগিত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
এই প্রক্রিয়া কখনও কখনও তীব্র রাজনৈতিক বিরোধের কারণ হয়ে ওঠে। ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে ঋণসীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আটকে যেতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঋণসীমা নিয়ে সমস্যা তৈরি হওয়া মানেই সরকার স্বাভাবিক অর্থনৈতিক অর্থে ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়েছে, এমন নয়। অনেক সময় সরকারের হাতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা থাকলেও আইনি সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে অর্থ পরিশোধে বাধা তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। এমনকি দেশটির সরকারি বন্ডকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করার দীর্ঘদিনের ধারণাও চাপে পড়তে পারে।
মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও ঋণসীমার মুখোমুখি হতে হতে পারে। তখন নতুন কংগ্রেসকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঋণসীমা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করতে হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের মেয়াদের শেষ পর্যায় এবং কংগ্রেসে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে এই আলোচনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন এলে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা তৈরির পথ জটিল হতে পারে।
মার্ক জান্ডি এমন একটি পরিস্থিতির আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে পরের বছরের অক্টোবরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র ঋণসীমার সমস্যায় পড়তে পারে। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তবে এটি একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির বিশ্লেষণ, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণসীমা সময়মতো না বাড়ানো হলে সরকারকে আর্থিক দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
সরকারের আয় এবং হাতে থাকা অর্থ দিয়ে সব দায় পরিশোধ করা সম্ভব না হলে কিছু অর্থপ্রদান বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে সরকারি কর্মসূচি, বিভিন্ন অর্থপ্রদান এবং আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, মার্কিন সরকার তার ঋণের নির্ধারিত অর্থ সময়মতো পরিশোধ করতে না পারলে সেটি ঋণখেলাপি পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এই ধরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে, কারণ বিশ্বের বহু বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠান মার্কিন ট্রেজারি বন্ডকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা তাই শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
তবে ঋণসীমা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দিলেই যে ঋণখেলাপি ঘটবে, এমন নয়। অতীতেও এ ধরনের বিরোধের মধ্যে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয়েছে। ফলে মূল ঝুঁকি হলো, রাজনৈতিক আলোচনা কতটা দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং সরকার সময়মতো প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারছে কি না।
এই কারণেই ঋণসীমা নিয়ে রাজনৈতিক দর-কষাকষিকে অর্থনীতিবিদেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করেন।
বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ফ্রান্সের মতো তাৎক্ষণিক আর্থিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক কম। মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক অবস্থান, বিশাল অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ দেশটিকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
কিন্তু এই সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রকে ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা থেকে মুক্তি দেয় না। সরকারি ঋণ বাড়তে থাকলে এবং সুদ পরিশোধের ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলে ভবিষ্যতে বাজেটের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
ফ্রান্সের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ব্যয় ও রাজস্বের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা বজায় থাকলে একসময় কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়। সেই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় না হলেও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও মূল প্রশ্ন হলো, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঋণের বোঝা সামলানোর মতো যথেষ্ট শক্তিশালী থাকবে কি না এবং সরকার দীর্ঘমেয়াদে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে কি না।
এআই খাতের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। সুদের হার, উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, কর আদায়, সরকারি ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি—সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে ঋণসীমা নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা এড়ানোও জরুরি। কারণ, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী একটি দেশও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতার কারণে অপ্রয়োজনীয় আর্থিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ফ্রান্সের আর্থিক সংকট যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি সতর্কবার্তা হলেও দুই দেশের পরিস্থিতি এক নয়। ফ্রান্সের ঋণের বোঝা, বাজেট ঘাটতি এবং সরকারি ব্যয়ের চাপ এখন অনেক বেশি প্রকট। যুক্তরাষ্ট্রও বিপুল ঋণ ও সুদ পরিশোধের ব্যয়ের মুখে থাকলেও ডলারের আন্তর্জাতিক চাহিদা এবং অর্থনীতির বৈচিত্র্য তাকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা স্পষ্ট—এই সুবিধার ওপর নির্ভর করে ঋণসংক্রান্ত সমস্যাকে উপেক্ষা করা যাবে না। দীর্ঘমেয়াদে ঋণের সুদ বাড়তে থাকলে এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে না এলে আমেরিকার আর্থিক স্বাধীনতার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দায়িত্বশীল সরকারি ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। একটি দেশের অর্থনীতি যত বড়ই হোক না কেন, ক্রমবর্ধমান ঋণ, ব্যয়বহুল সুদ এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা একসময় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তাই যুক্তরাষ্ট্র এখনই ফ্রান্সের মতো সংকটের মুখে না পড়লেও ভবিষ্যতের ঝুঁকি এড়াতে ঋণ ব্যবস্থাপনা, বাজেট ঘাটতি এবং রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।



