আজ যেখানে নীল সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে, হাজার হাজার বছর আগে সেখানেই ছিল শুকনো জমি। সেই ভূখণ্ডের বুক চিরে বয়ে যেত নদী, ছিল মিষ্টি জলের উৎস। প্রাচীন মানুষের বসবাস ও দৈনন্দিন কাজকর্মের জন্য পরিবেশটিও ছিল উপযোগী। সময়ের সঙ্গে সমুদ্রের জলস্তর বেড়েছে, ডুবে গিয়েছে সেই পরিচিত ভূখণ্ড। কিন্তু মানুষের ব্যবহৃত পাথরের সরঞ্জাম আজও ধরে রেখেছে হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর স্মৃতি।
অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূলে মুরুজুগা অঞ্চলের সমুদ্রতলে এমনই এক প্রাচীন জগতের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। সেখানে শনাক্ত করা হয়েছে দুটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। জলের নিচে পাওয়া গিয়েছে মানুষের তৈরি পাথরের সরঞ্জাম। তবে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব শুধু প্রাচীন নিদর্শন উদ্ধারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রত্নস্থলগুলির অবস্থান এবং অতীতের ভূপ্রকৃতি থেকে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে সমুদ্রের নিচে থাকা এই অঞ্চল একসময় মানুষের জীবনযাপনের উপযোগী স্থলভূমি ছিল।
ফ্লিন্ডার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উঠে আসা এই তথ্য অস্ট্রেলিয়ার প্রাচীন উপকূলীয় পরিবেশ এবং মানুষের অতীত জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
মুরুজুগার সমুদ্রতলে মিলল দুটি প্রাচীন প্রত্নস্থল
অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূলের মুরুজুগা অঞ্চল প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের জন্য পরিচিত। এবার এই অঞ্চলের সমুদ্রতলে দুটি প্রাচীন প্রত্নস্থল শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। সেখানে পাওয়া গিয়েছে মানুষের তৈরি পাথরের সরঞ্জাম, যা ওই ভূখণ্ডে প্রাচীন মানুষের উপস্থিতি ও কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, প্রত্নস্থল দুটি এমন জায়গায় অবস্থিত, যেগুলির পরিবেশ হাজার হাজার বছর আগে বর্তমানের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। তখন সেখানে সমুদ্রের বিস্তীর্ণ জলরাশি ছিল না। বরং ছিল স্থলভূমি, মিষ্টি জলের উৎস এবং নদীঘেরা ভূপ্রকৃতি।
গবেষকদের কাছে এই ধরনের আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রাচীন মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে এত দিন মূলত স্থলভাগে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। কিন্তু সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির ফলে বহু প্রাচীন বসতি, যাতায়াতের পথ এবং মানুষের ব্যবহৃত জায়গা এখন জলের নিচে চলে গিয়েছে।
মুরুজুগার আবিষ্কার সেই হারিয়ে যাওয়া ভূখণ্ডের ইতিহাস জানার নতুন দরজা খুলে দিয়েছে।
একটি প্রত্নস্থল ছিল মিষ্টি জলের উৎসের কাছে
গবেষণায় উঠে এসেছে, দুটি প্রত্নস্থলের একটি ছিল প্রাচীন মিষ্টি জলের উৎসের কাছাকাছি। অন্যটি অবস্থিত ছিল অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে, যার পাশ দিয়ে একসময় নদী বয়ে যেত।
এই তথ্য প্রাচীন ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। মানুষের জীবনধারণের জন্য মিষ্টি জল ছিল অপরিহার্য। পানীয় জল সংগ্রহ, খাবার তৈরি এবং দৈনন্দিন নানা প্রয়োজনে প্রাচীন মানুষকে জলের উৎসের ওপর নির্ভর করতে হতো। তাই মিষ্টি জলের কাছাকাছি কোনও স্থান মানুষের চলাচল কিংবা বিভিন্ন কাজকর্মের জন্য উপযোগী হয়ে উঠতে পারত।
অন্যদিকে, নদীর পাশের উঁচু জমিও মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নদী পরিবেশের অংশ হিসেবে খাদ্য ও জলের জোগান দিতে পারত। উঁচু জমি আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের জন্য সুবিধাজনক হতে পারত। তবে মুরুজুগার এই নির্দিষ্ট স্থানগুলিতে ঠিক কী ধরনের কাজ করা হতো, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য প্রয়োজন।
দুটি প্রত্নস্থলের অবস্থান থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, আজকের সমুদ্রতল একসময় এমন এক ভূদৃশ্যের অংশ ছিল, যেখানে মিষ্টি জলের উৎস ও নদীর মতো প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল।
২৩ কিলোমিটার দূর থেকে আনা হয়েছিল পাথর?
আবিষ্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে পাথরের সরঞ্জামগুলির উপাদান বিশ্লেষণ করে। গবেষকেরা জানতে পেরেছেন, কিছু সরঞ্জাম তৈরির জন্য ব্যবহৃত পাথরের উৎস ছিল প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে।
এই তথ্য প্রাচীন মানুষের চলাচল এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের ধরন সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। কোনও সরঞ্জাম তৈরির পাথর যদি স্থানীয় এলাকায় না পাওয়া যায়, তবে তার উপাদান অন্য অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়ে থাকতে পারে। মুরুজুগার ক্ষেত্রে পাথরের উৎসের দূরত্ব থেকে বোঝা যায়, প্রাচীন মানুষ প্রয়োজনীয় উপকরণের জন্য আশপাশের এলাকার বাইরেও যাতায়াত করতেন বা অন্য কোনও উপায়ে সেই উপাদান সংগ্রহ করতেন।
তবে পাথরগুলি ঠিক কীভাবে প্রত্নস্থলে পৌঁছেছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মানুষ নিজেরাই সেগুলি বহন করে নিয়ে এসেছিলেন, নাকি অন্য কোনও প্রক্রিয়ায় সেগুলি সেখানে পৌঁছেছিল—এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন।
তা সত্ত্বেও, পাথরের উৎসের এই তথ্য প্রাচীন মানুষের সম্পদ সংগ্রহের পরিসর সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। এটি দেখায়, প্রাচীন মানুষের জীবন শুধু তাঁদের বসবাসের আশপাশের ছোট্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল—এমন ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়।
সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে ডুবে যায় প্রাচীন ভূখণ্ড
আজ যে জায়গাগুলি সমুদ্রের নিচে, সেগুলি একসময় স্থলভাগের অংশ ছিল। জলবায়ু ও সমুদ্রের জলস্তরের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ফলে উপকূলের ভূপ্রকৃতি বদলে যেতে পারে। মুরুজুগার ক্ষেত্রেও সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির ফলে প্রাচীন স্থলভূমির অন্তত কিছু অংশ জলের নিচে চলে যায় বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
গবেষণা অনুযায়ী, এই ভূখণ্ড অন্তত ৯ হাজার বছর আগে সমুদ্রের নিচে চলে যায়। ফলে যে জায়গায় একসময় শুকনো জমি, নদী এবং মিষ্টি জলের উৎস ছিল, সেখানে পরে তৈরি হয় সমুদ্রতলের নতুন ভূদৃশ্য।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। প্রত্নস্থলগুলি প্রায় ৯ হাজার বছর আগে জলের নিচে চলে গিয়েছিল বলেই সেখান থেকে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি পাথরের সরঞ্জামের বয়সও ঠিক ৯ হাজার বছর—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। কোনও নিদর্শনের নির্দিষ্ট বয়স নির্ধারণ করতে আলাদা প্রমাণ ও বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়।
অতএব, ভূখণ্ড ডুবে যাওয়ার সময় এবং প্রতিটি নিদর্শন তৈরির সময়কে একই বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে রয়েছে প্রাচীন মানুষের ইতিহাস
বিশ্বের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির কারণে একসময়কার স্থলভূমি ডুবে গিয়েছে। সেই সব অঞ্চলে প্রাচীন মানুষের চলাচল, বসতি কিংবা দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের চিহ্ন জলের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে।
স্থলভাগে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে গবেষকেরা সাধারণত এমন জায়গা খোঁজেন, যেখানে মানুষের তৈরি সরঞ্জাম, বসতির অবশেষ বা অন্য নিদর্শন পাওয়া যায়। কিন্তু উপকূলীয় ভূখণ্ড ডুবে গেলে সেই চিহ্নগুলি খুঁজে পাওয়া অনেক বেশি কঠিন হয়ে ওঠে। সমুদ্রের নিচে অনুসন্ধানের জন্য বিশেষ প্রযুক্তি, ভূপ্রকৃতি বিশ্লেষণ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের সমন্বয় প্রয়োজন।
মুরুজুগায় দুটি প্রত্নস্থল শনাক্ত হওয়ার ঘটনা দেখাচ্ছে, সমুদ্রের নিচেও প্রাচীন মানুষের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া সম্ভব। এই ধরনের আবিষ্কার অতীতের উপকূলীয় পরিবেশ এবং মানুষের সঙ্গে সেই পরিবেশের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, বর্তমানে সমুদ্রের অংশ হয়ে থাকা প্রতিটি অঞ্চল যে চিরকাল জলমগ্ন ছিল, এমন নয়। পৃথিবীর ভূপ্রকৃতি সময়ের সঙ্গে বদলায়, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় মানুষের বসবাসের জায়গাও।
ফ্লিন্ডার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?
মুরুজুগার সমুদ্রতলে পাথরের সরঞ্জাম আবিষ্কার শুধু প্রাচীন নিদর্শন উদ্ধারের ঘটনা নয়। এর মাধ্যমে একই সঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে—প্রাচীন ভূপ্রকৃতি, মানুষের উপকরণ সংগ্রহ এবং সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির প্রভাব।
প্রথমত, মিষ্টি জলের উৎস ও নদীর পাশের উঁচু জমির অবস্থান থেকে অতীতের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরের পাথরের উৎস প্রাচীন মানুষের সম্পদ সংগ্রহের পরিসর সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তুলছে। তৃতীয়ত, প্রায় ৯ হাজার বছর আগে ভূখণ্ডটি জলের নিচে চলে যাওয়ার তথ্য উপকূলীয় পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের গুরুত্ব তুলে ধরছে।
তবে এই আবিষ্কার থেকে প্রাচীন মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি দিক সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। তাঁদের দৈনন্দিন কাজকর্মের প্রকৃতি, পাথর পরিবহণের পদ্ধতি কিংবা প্রতিটি সরঞ্জামের নির্দিষ্ট বয়স জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন হতে পারে।
তার পরও মুরুজুগার আবিষ্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—মানুষের অতীত ইতিহাসের অনেকটাই এখনও অনাবিষ্কৃত। সেই ইতিহাসের কিছু অংশ হয়তো লুকিয়ে রয়েছে সমুদ্রের গভীরে, যেখানে পৌঁছনোর সুযোগ তৈরি হলে সামনে আসতে পারে হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর আরও অজানা কাহিনি।



