দুর্গাপুজো মানেই আলোর রোশনাই, চোখধাঁধানো মণ্ডপ, সাবেকি প্রতিমা আর অভিনব থিমের আকর্ষণ। কলকাতার দুর্গাপুজোর জাঁকজমক দেখতে প্রতি বছরই ভিড় জমান অসংখ্য মানুষ। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতেও থিমের পুজো ঘিরে থাকে ব্যাপক উন্মাদনা। তবে এবার শুধু বাংলাতেই নয়, প্রতিবেশী বিহারেও দুর্গাপুজোর মণ্ডপসজ্জায় দেখা যাচ্ছে তাক লাগানো আয়োজন। কোথাও তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রদেশের বিখ্যাত খাজুরাহো মন্দিরের আদলে মণ্ডপ, কোথাও ফুটে উঠেছে বাংলার ফারাক্কা ব্যারেজ। আবার কোথাও মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে মালয়েশিয়ার বিখ্যাত পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের আদলে তৈরি বিশাল প্যান্ডেল।
বিহারের পাটনা, মুঙ্গের, কাটিহার-সহ বিভিন্ন এলাকায় দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ। অভিনব স্থাপত্য, নিখুঁত কারুকাজ এবং ব্যতিক্রমী ভাবনার টানে দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন পুজোমণ্ডপগুলিতে। পুজোর এই আকর্ষণ সামাল দিতে আয়োজকদেরও যথেষ্ট ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।
বিহারের রাজধানী পাটনায় দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে ডাকবাংলো মোড়ের মণ্ডপ। মধ্যপ্রদেশের ঐতিহাসিক খাজুরাহো মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করে তৈরি হয়েছে এই মণ্ডপ। প্রায় ৮০ ফুট উঁচু এই প্যান্ডেল দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে।
খাজুরাহোর মন্দিরগুলি তাদের অনন্য স্থাপত্য, সূক্ষ্ম ভাস্কর্য এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সেই স্থাপত্যের আদলে দুর্গাপুজোর মণ্ডপ তৈরি করা সহজ কাজ নয়। মণ্ডপের নকশা, উচ্চতা এবং কারুকাজে ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের ছাপ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন উদ্যোক্তারা।
দুর্গাপুজোর মতো উৎসবের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক স্থাপত্যকে মিলিয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ দর্শকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে। মণ্ডপের নকশা কাছ থেকে দেখতে এবং ছবি তুলতে ভিড় করছেন বহু মানুষ। উৎসবের মরসুমে পাটনার এই পুজো দর্শনার্থীদের অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
বিহারের দুর্গাপুজোয় বাংলার ছোঁয়াও রয়েছে। পাটনার বোরিং রোডের একটি পুজোয় মণ্ডপ তৈরি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা ব্যারেজের আদলে। প্রায় ৫৫ ফুট উঁচু এবং ৫৫ ফুট চওড়া এই মণ্ডপে স্থান পেয়েছে নদী, জলপ্রবাহ এবং বাঁধকেন্দ্রিক ভাবনা।
ফারাক্কা ব্যারেজ পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলসম্পদ পরিকাঠামো। গঙ্গার জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং নদী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এই ব্যারেজের সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে, বিহারের বহু এলাকায় বন্যা, নদীভাঙন এবং কৃষিকাজের উপর জলপ্রবাহের প্রভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা।
এই প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখেই মণ্ডপের থিমে নদী ও জলসম্পদের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। বন্যার কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, নদীর পাড় ভাঙনের সমস্যা এবং কৃষকদের নানা চ্যালেঞ্জের মতো বিষয়ও এই ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
ফলে মণ্ডপটি শুধু উৎসবের সাজসজ্জার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর মাধ্যমে জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের জীবনের সম্পর্কের কথাও তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। অভিনব এই থিম দেখতে পুজোমণ্ডপে ভিড় জমাচ্ছেন দর্শনার্থীরা।
পাটনার বোরিং ক্যানেল রোডের দুর্গাপুজোও এবার বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। এখানকার মণ্ডপের উচ্চতা প্রায় ১০০ ফুট এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০ মিটার। মণ্ডপ সাজাতে ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার ঘণ্টা। বিশাল এই আয়োজনের মধ্যে রয়েছে ১৬ ফুটের দুর্গাপ্রতিমা।
মণ্ডপসজ্জায় বিপুল সংখ্যক ঘণ্টার ব্যবহার এই পুজোকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। সাধারণত দুর্গাপুজোর মণ্ডপে আলো, কাপড়, কাঠামো এবং বিভিন্ন ধরনের শিল্পকর্মের মাধ্যমে থিম ফুটিয়ে তোলা হয়। কিন্তু হাজার হাজার ঘণ্টা দিয়ে বিশাল পরিসরে মণ্ডপ সাজানোর ভাবনা দর্শকদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।
মণ্ডপের বিশাল আকার, ঘণ্টার সাজ এবং দুর্গাপ্রতিমার উপস্থিতি মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে অন্য রকম পরিবেশ। পুজো দেখতে আসা মানুষের কাছে এই মণ্ডপ হয়ে উঠেছে অন্যতম আকর্ষণ। বিশেষ করে অভিনব সাজসজ্জা দেখতে এবং ছবি তুলতে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ছে।
বিহারের মুঙ্গের জেলার বারিয়ারপুর ব্লকের দুর্গাপুজোও এবার আলোচনায়। এখানে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বিখ্যাত পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের আদলে তৈরি হয়েছে বিশাল মণ্ডপ। প্রায় ২৫০ ফুট উচ্চতার এই প্যান্ডেল দুর্গাপুজোর অন্যতম নজরকাড়া আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার বিশ্বের পরিচিত আধুনিক স্থাপত্যগুলির মধ্যে অন্যতম। দুটি সুউচ্চ ভবনের নকশা এবং বিশেষ স্থাপত্যশৈলীর জন্য এই স্থাপনা আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত। সেই আদলে দুর্গাপুজোর মণ্ডপ তৈরি করতে গেলে প্রয়োজন হয় পরিকল্পনা, কাঠামোগত দক্ষতা এবং বিপুল পরিশ্রম।
বারিয়ারপুরের পুজো উদ্যোক্তারা সেই স্থাপত্যের আদলে বিশাল মণ্ডপ তৈরি করে দর্শকদের সামনে ব্যতিক্রমী আয়োজন তুলে ধরেছেন। দূর থেকে নজর কাড়ার মতো উচ্চতা এবং পরিচিত স্থাপত্যের অনুকরণ এই প্যান্ডেলের প্রধান আকর্ষণ।
দুর্গাপুজোর সময় এমন বিশাল মণ্ডপ দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছেন। ফলে বারিয়ারপুরের পুজোকে ঘিরেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ। বিহারের পুজোয় থিমের বৈচিত্র্য যে ক্রমশ বাড়ছে, এই আয়োজন তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
মুঙ্গেরের দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বড়ি দুর্গা মহারানির পরিচিতি। এখানকার বিশাল দুর্গাপ্রতিমা স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। পুজোর সময় প্রতিমা দর্শন করতে বহু মানুষ ভিড় করেন।
দুর্গাপুজো শুধু মণ্ডপসজ্জা বা থিমের প্রতিযোগিতা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্থানীয় ঐতিহ্য, মানুষের আবেগ এবং দীর্ঘদিনের ধর্মীয় রীতিনীতি। বড়ি দুর্গা মহারানির পুজোতেও সেই ঐতিহ্যের প্রতিফলন দেখা যায়।
একদিকে আধুনিক স্থাপত্যের আদলে তৈরি বিশাল প্যান্ডেল, অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপ্রতিমা—এই দুইয়ের সমন্বয় মুঙ্গেরের পুজোকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। নতুন প্রজন্মের দর্শনার্থীদের কাছে যেমন এই আয়োজন আকর্ষণীয়, তেমনই স্থানীয় মানুষের কাছেও পুজোর ঐতিহ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একসময় কলকাতার বড় বাজেটের দুর্গাপুজো এবং অভিনব মণ্ডপসজ্জাই বিশেষভাবে আলোচনায় থাকত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা, এমনকি বাংলার বাইরের রাজ্যগুলিতেও থিমের পুজোর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। বিহারের এবারের আয়োজন সেই প্রবণতাকেই সামনে এনেছে।
কোথাও ঐতিহাসিক মন্দিরের স্থাপত্য, কোথাও গুরুত্বপূর্ণ জলসম্পদ পরিকাঠামো, আবার কোথাও আধুনিক আন্তর্জাতিক স্থাপনার প্রতিরূপ—বিভিন্ন ভাবনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে প্যান্ডেল। এর ফলে দুর্গাপুজো এখন শুধু ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিল্প, স্থাপত্য, ইতিহাস এবং সামাজিক বার্তা তুলে ধরারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
পুজোর মণ্ডপ দেখতে গিয়ে দর্শনার্থীরা একদিকে যেমন দুর্গাপ্রতিমার দর্শন করছেন, অন্যদিকে তেমনই পরিচিত ও অপরিচিত নানা স্থাপত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বিশেষ করে পরিবারের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরোনো মানুষদের কাছে এই ধরনের থিমের পুজো আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে।
তবে বিশাল মণ্ডপের জনপ্রিয়তার সঙ্গে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিপুল সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে পুজোমণ্ডপে পৌঁছলে সুষ্ঠু প্রবেশ ও বেরোনোর ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়।
পাটনার ডাকবাংলো মোড়ের খাজুরাহো মন্দিরের আদলে তৈরি মণ্ডপ, বোরিং রোডের ফারাক্কা ব্যারেজের থিম, বোরিং ক্যানেল রোডের ঘণ্টায় সাজানো বিশাল প্যান্ডেল এবং মুঙ্গেরের বারিয়ারপুরে পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের আদলে তৈরি ২৫০ ফুটের মণ্ডপ—সব মিলিয়ে বিহারের দুর্গাপুজোয় এবার বৈচিত্র্যের ছড়াছড়ি।
কাটিহার-সহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকাতেও পুজো ঘিরে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। থিমের অভিনবত্ব এবং প্রতিমার আকর্ষণ দর্শনার্থীদের প্যান্ডেলমুখী করছে। বাংলার বাইরে দুর্গাপুজোর এমন জাঁকজমক প্রমাণ করছে, এই উৎসবের জনপ্রিয়তা ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে।
দুর্গাপুজোকে ঘিরে শিল্পী, কারিগর, আয়োজক এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। মণ্ডপ নির্মাণ থেকে শুরু করে আলোকসজ্জা, প্রতিমা তৈরি এবং আনুষঙ্গিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন বহু মানুষ। ফলে এই উৎসব স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে।
সব মিলিয়ে বিহারের দুর্গাপুজোয় এবার নজর কেড়েছে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন। খাজুরাহোর মন্দির থেকে পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার, ফারাক্কা ব্যারেজ থেকে হাজার হাজার ঘণ্টায় সাজানো মণ্ডপ—প্রতিটি আয়োজনেই রয়েছে আলাদা ভাবনা। আর সেই অভিনবত্বের টানেই বাংলার বাইরেও দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে উপচে পড়ছে দর্শনার্থীদের ভিড়।



