এনবি সংবাদ, লাইফস্টাইল ডেস্ক : একসময় দিনে ৬০টি পর্যন্ত সিগারেট খেতেন অভিনেতা নানা পাটেকর। দীর্ঘদিনের সেই অভ্যাস শেষ পর্যন্ত তিনি ছেড়ে দেন ৫৬ বছর বয়সে। অর্থাৎ, বহু বছর আগে ধূমপান থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধূমপান করার পর হঠাৎ সিগারেট ছেড়ে দিলেই কি হৃদ্যন্ত্র পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত হয়ে যায়?
চিকিৎসকদের মতে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার পর শরীর দ্রুতই সুস্থতার দিকে এগোতে শুরু করে এবং সময়ের সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। তবে দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত ধূমপানের কারণে শরীর ও রক্তনালিতে যে পরিবর্তন তৈরি হতে পারে, তার কিছু প্রভাব দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে।
তাই অতীতে দীর্ঘদিন ধূমপানের অভ্যাস থাকলে সিগারেট ছেড়ে দেওয়ার পরও হৃদ্স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
সিগারেটের ধোঁয়া কীভাবে হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি করে?
ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু ফুসফুসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ রক্তনালির ভেতরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে শরীরে প্রদাহ বাড়াতে এবং ধমনিতে প্লাক জমার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
ধমনিতে প্লাক জমতে থাকলে রক্ত চলাচলের পথ সরু হয়ে যেতে পারে। এর ফলে করোনারি আর্টারি ডিজিজ, হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের মতো কার্ডিওভাসকুলার সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এই কারণেই ধূমপানকে হৃদ্রোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে সিগারেটের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকলে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির উপর এর প্রভাবও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তবে কারও ঝুঁকি কতটা, তা নির্ধারণের সময় শুধু প্রতিদিন কতটি সিগারেট খেতেন, সেটি দেখলেই হয় না।
দিনে কতটি সিগারেট খেতেন, সেটাই কি সব?
একজন মানুষ দিনে কতটি সিগারেট খান, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর পাশাপাশি কত বছর ধরে ধূমপান করেছেন, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এর সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন বা পরিবারে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে সামগ্রিক ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ধূমপানের ইতিহাস থাকলেও সবার হৃদ্রোগের ঝুঁকি এক রকম নয়। ব্যক্তির বয়স, জীবনযাপন, অন্যান্য শারীরিক সমস্যা এবং ধূমপানের মোট ইতিহাস—সবকিছু বিবেচনা করেই ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হয়।
তাই কেউ বহু বছর আগে ধূমপান ছেড়ে দিলেও চিকিৎসকের কাছে নিজের পুরনো ধূমপানের অভ্যাসের কথা জানানো গুরুত্বপূর্ণ।
সিগারেট ছেড়ে দিলেই কি সব বিপদ কেটে যায়?
ধূমপান ছেড়ে দেওয়া অবশ্যই হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। সিগারেট ছাড়ার পর থেকেই শরীর ধীরে ধীরে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু করে।
সময় যত যায়, ধূমপানের কারণে বাড়তে থাকা কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি তত কমতে থাকে। রক্তসঞ্চালন ও শরীরের অন্যান্য স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে দীর্ঘদিন এবং অত্যধিক মাত্রায় ধূমপানের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি একেবারে শূন্যে নেমে যাবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
দীর্ঘদিনের ধূমপানের ফলে রক্তনালিতে যে পরিবর্তন তৈরি হয়েছে, তার কিছু অংশ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার পরও হৃদ্স্বাস্থ্যের অন্যান্য ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
১৯ বছর আগে সিগারেট ছাড়লেও কেন নজরদারি জরুরি?
ধরা যাক, কেউ ১৯ বছর আগে ধূমপান ছেড়েছেন। এই দীর্ঘ সময় ধূমপানমুক্ত থাকার কারণে তাঁর হৃদ্রোগের ঝুঁকি একজন বর্তমান ধূমপায়ীর তুলনায় অনেকটাই কমে যেতে পারে। কিন্তু তাঁর অতীতের ধূমপানের ইতিহাস পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না।
বিশেষ করে যদি বহু বছর ধরে দিনে অনেক সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস থাকে, তাহলে চিকিৎসকের কাছে সেই তথ্য জানানো প্রয়োজন। কারণ অতীতের ধূমপানের অভ্যাসের সঙ্গে অন্যান্য ঝুঁকির কারণ যোগ হলে ভবিষ্যতে হৃদ্রোগের সম্ভাবনা মূল্যায়নে সেটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তচাপ, কোলেস্টেরল এবং রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা যেতে পারে। চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে আরও কিছু হৃদ্যন্ত্রের পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
ধূমপান ছাড়ার বয়স কি গুরুত্বপূর্ণ?
অবশ্যই। যত দ্রুত ধূমপান ছেড়ে দেওয়া যায়, তত বেশি সময় শরীর ক্ষতি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়। তবে অনেক বছর ধূমপান করার পরও সিগারেট ছাড়ার সিদ্ধান্তের গুরুত্ব কমে যায় না।
অনেকেই মনে করেন, ‘এত বছর তো ধূমপান করেছি, এখন ছেড়ে আর কী লাভ?’ চিকিৎসকদের মতে, এই ধারণা ভুল।
ধূমপান ছাড়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতের হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ থাকে। তাই বয়স যতই হোক, সিগারেট ছাড়ার সিদ্ধান্ত শরীরের জন্য ইতিবাচক।
শুধু সিগারেট ছাড়লেই কি হৃদ্যন্ত্র ভালো থাকবে?
সিগারেট ছেড়ে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে আরও কয়েকটি বিষয় নজরে রাখা দরকার।
নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও ডায়াবেটিস থাকলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি।
অর্থাৎ, দীর্ঘদিনের ধূমপানের ইতিহাস থাকলে শুধু সিগারেট ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়ার বদলে সামগ্রিক জীবনযাত্রার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
পুরনো ধূমপানের ক্ষতি কি পুরোপুরি মুছে যায়?
সিগারেট ছেড়ে দেওয়ার পর শরীরের অনেক ক্ষতি সময়ের সঙ্গে কমতে থাকে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। কিন্তু দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত ধূমপানের কারণে রক্তনালি ও শরীরে তৈরি হওয়া সব পরিবর্তন একদিনে বা অল্প সময়ে সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যায় না।
তাই ধূমপান ছাড়ার বিষয়টিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা উচিত। যত দ্রুত ধূমপান ছাড়া যায়, ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তত বেশি।
নানা পাটেকরের হৃদ্সমস্যার সঙ্গে কি ধূমপানের সম্পর্ক ছিল?
নানা পাটেকর অতীতে প্রচুর সিগারেট খেতেন এবং ৫৬ বছর বয়সে ধূমপান ছেড়ে দিয়েছিলেন—এই তথ্য থেকে তাঁর হৃদ্সমস্যার সঙ্গে পুরনো ধূমপানের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়।
কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির হৃদ্রোগের কারণ জানতে হলে তাঁর সম্পূর্ণ চিকিৎসা ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল রিপোর্ট বিশ্লেষণ করতে হয়। অতীতের ধূমপান একটি সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে, কিন্তু সেটিকেই নির্দিষ্ট রোগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের যথাযথ প্রমাণ প্রয়োজন।
তাই নানা পাটেকরের ক্ষেত্রে ধূমপানের অতীত নিয়ে আলোচনা করা গেলেও তাঁর হার্টের সমস্যার সঙ্গে সেই অভ্যাসের সরাসরি যোগ ছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা একটাই—ধূমপান ছাড়তে কখনও দেরি হয় না। বহু বছর সিগারেট খাওয়ার পরও তা ছেড়ে দিলে হৃদ্যন্ত্র ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকার পাওয়া যায়। তবে অতীতে দীর্ঘদিন ধূমপান করে থাকলে সিগারেট ছাড়ার পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং অন্যান্য হৃদ্রোগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি।



