এনবি সংবাদ,স্পোটস ডেস্ক : আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলার পর মাইক্রোফোন হাতে যখন দাঁড়ালেন লিয়োনেল মেসি, তখন তাঁর কণ্ঠে ছিল আবেগ। চোখেমুখে বিদায়ের ছাপ। কী বলবেন, তা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজেকেই গুছিয়ে নিতে হচ্ছিল তাঁকে। কিন্তু কথা শুরু করার পর একে একে উঠে এল তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ফুটবল জীবনের নানা স্মৃতি।
সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, সমর্থকদের ভালোবাসা, বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি, কঠিন সময়ের লড়াই— সবই উঠে এল মেসির বক্তব্যে। সেই সঙ্গে এল একটি মন্তব্য, যা দ্রুতই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। মেসি বলেন, অনেকেই চান আর্জেন্টিনা জাতীয় দল ব্যর্থ হোক। তবে তাঁদের সেই আনন্দ দিতে চান না তিনি।
বিদায়ী ম্যাচের পর মেসির বক্তব্য তাই শুধু আবেগের বিদায় ভাষণ হয়ে থাকেনি। এর মধ্যে ছিল তাঁর ফুটবলজীবনের ফিরে দেখা, সতীর্থদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উদ্দেশে বিশেষ বার্তা।
আর্জেন্টিনার জার্সির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মেসি বলেন, এই জার্সির কাছে তাঁর ঋণ শোধ করার মতো আর কিছু বাকি নেই। প্রায় দুই দশক ধরে দেশের হয়ে খেলেছেন তিনি। কঠিন সময়েও লড়াই থেকে কখনও পিছিয়ে যাননি।
মেসির কথায়, যত কঠিন পরিস্থিতিই এসেছে, তিনি নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেই দীর্ঘ পথ পেরিয়েই আজকের জায়গায় পৌঁছেছেন।
তবে সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, এবার থেকে আর নিয়মিত আর্জেন্টিনা দলের সঙ্গে থাকা হবে না। দেশের জার্সি পরে মাঠে নামার সেই অভিজ্ঞতা আর ফিরে আসবে না— এই ভাবনাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি আবেগপ্রবণ করে তুলেছে।
মেসি জানান, নিজের হাতে সব কিছু থাকলে হয়তো সারা জীবন আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেই যেতেন। তাঁর কাছে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার চেয়ে সুন্দর অনুভূতি আর কিছু নেই।
মেসির বক্তব্যে বার বার ফিরে এসেছে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দল নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিল। ফাইনালে ওঠার পরও লড়াইয়ের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল দল।
বিশ্বকাপ জয়ের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে মেসি এবং তাঁর সতীর্থেরা কতটা পরিশ্রম করেছিলেন, সেটিও স্মরণ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ট্রফি হাতে নিয়ে দেশে ফেরার মাধ্যমে পূরণ হয়েছিল বহু বছরের অপেক্ষা।
মেসির কাছে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয় শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। ছিল গোটা দেশের স্বপ্নপূরণ।
এর পাশাপাশি কোপা আমেরিকা এবং ফাইনালিসিমা জয়ের কথাও উল্লেখ করেন আর্জেন্টিনার তারকা। জাতীয় দলের হয়ে একের পর এক বড় ট্রফি জয়ের মুহূর্তগুলো তাঁর ফুটবলজীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলির মধ্যে থাকবে বলেই জানান তিনি।
নিজের বক্তব্যে একটি কঠিন বিশ্বকাপ ম্যাচের কথাও তুলে ধরেন মেসি। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচ নিয়ে বিশ্বকাপের পর অনেক আলোচনা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
মেসির মতে, সেই সময় দলের খেলোয়াড়েরা মানসিক ও শারীরিক ভাবে নিজেদের সীমার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন। প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে লড়াই করতে হয়েছিল।
সতীর্থদের পাশে নিয়ে সেই কঠিন সময় পার করার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেসি বোঝাতে চেয়েছেন, জাতীয় দলের সাফল্যের পেছনে শুধু তারকারা নন, পুরো দলের সম্মিলিত লড়াই কাজ করে।
মেসি তাঁর বক্তব্যে সতীর্থদের বিশেষ ভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাঁর মতে, কোনও বড় সাফল্যের জন্য শুধু একজন অসাধারণ ফুটবলার যথেষ্ট নয়। দরকার শক্তিশালী এবং ঐক্যবদ্ধ একটি দল।
বিশেষ করে কঠিন সময়েই বোঝা যায় একটি দলের আসল চরিত্র। মেসির মতে, তিনি যে সমস্ত সাফল্য অর্জন করেছেন, তার নেপথ্যে রয়েছে তাঁর সতীর্থদের অবদান।
বর্তমান দলের খেলোয়াড়দের ধন্যবাদ জানিয়ে মেসি বলেন, ছোটবেলা থেকে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন পূরণে সতীর্থেরা তাঁকে সাহায্য করেছেন। তাঁরাই তাঁকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।
মাঠের পাশাপাশি মাঠের বাইরেও সতীর্থদের সঙ্গে কাটানো সময় তাঁর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। দেশের হয়ে যত বার মাঠে নেমেছেন, তত বারই বিশ্বাস করেছেন যে যে কোনও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা তাঁদের রয়েছে।
মেসির বক্তব্যের সবচেয়ে আবেগঘন অংশগুলির একটি ছিল আর্জেন্টিনার সমর্থকদের নিয়ে। দেশের বিভিন্ন শহরে খেলার অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি জানান, যেখানেই গিয়েছেন, সেখানেই পেয়েছেন বিপুল ভালোবাসা।
শুধু আর্জেন্টিনায় নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আর্জেন্টিনার ম্যাচ দেখতে সমর্থকেরা হাজির হয়েছেন। দূরত্ব এবং নানা অসুবিধা সত্ত্বেও তাঁরা দলের পাশে থেকেছেন।
মেসির কাছে সবচেয়ে বিশেষ বিষয় ছিল, বিশ্বের যে প্রান্তেই আর্জেন্টিনা খেলুক না কেন, সমর্থকদের উপস্থিতির কারণে তাঁর মনে হয়েছে যেন নিজের দেশেই খেলছেন।
তাই বিদায়ের মুহূর্তে সমর্থকদের প্রতি তাঁর অনুরোধ, এই সমর্থন যেন কখনও কমে না যায়। কঠিন সময় এলে বরং আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
মেসির বক্তব্যের এই অংশটিই সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কঠিন সময় আসবে। তখন আরও বেশি শক্তিশালী এবং ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
এর পরেই তাঁর মন্তব্য, অনেকেই চান জাতীয় দল ব্যর্থ হোক। কিন্তু তাঁদের সেই সন্তুষ্টি আর্জেন্টিনা দেবে না।
মেসির এই বক্তব্যকে ঘিরেই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি অবশ্য কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করেননি। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল জাতীয় দলের পাশে থাকা এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও সমর্থকদের ঐক্য ধরে রাখা।
বিদায়ী ম্যাচের স্টেডিয়ামটির সঙ্গেও মেসির রয়েছে বিশেষ স্মৃতি। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম ম্যাচগুলির একটি এই মাঠেই খেলেছিলেন তিনি।
সেই দিনের কথা মনে করে মেসি জানান, সেটি ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম আনন্দের মুহূর্ত। বিশ্বকাপ জয়ের পর দেশের সমর্থকদের সামনে ফিরে আসার অনুভূতি ছিল অসাধারণ।
এবার সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়েই তাঁকে বিদায় নিতে হল।
গ্যালারির দর্শকেরা যখন আবেগে ভেঙে পড়েছেন, মেসিও তখন জানিয়ে দেন, তিনি তাঁদের মিস করবেন। তবে আর্জেন্টিনা দলের এই প্রজন্মের খেলোয়াড়দের পাশে তিনি ভবিষ্যতেও থাকবেন।
শেষের দিকে আবেগ সামলানো আরও কঠিন হয়ে যায় মেসির জন্য। তিনি স্বীকার করেন, এত আবেগের মধ্যে নিজের বক্তব্যের অনেক কথাই ভুলে যাচ্ছেন। কথা বলাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
সেই মুহূর্তে তাঁর মনে পড়ে যায় বাবার কথা। দেশের হয়ে এই মাঠে খেলতে আসার অভিজ্ঞতা আর হবে না— এই বাস্তবতাই তাঁকে আরও আবেগপ্রবণ করে তোলে।
শেষে মেসি বলেন, তিনি একজন গর্বিত আর্জেন্টিনীয়। দেশের জার্সিতে এত বছর খেলতে পেরে তিনি আপ্লুত এবং গর্বিত। কিন্তু বিদায়ের সময় তাঁর মনে কোনও আক্ষেপ নেই।
বরং দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষে তিনি শান্তি নিয়েই সরে দাঁড়াচ্ছেন।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর শেষ ম্যাচ শেষ হয়েছে। মাঠে গোল করে বিদায় নিয়েছেন। এরপর মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলির কথা বলেছেন। ২১ বছরের সেই যাত্রার শেষে মেসির কণ্ঠে ছিল কৃতজ্ঞতা, গর্ব, স্মৃতি এবং বিদায়ের ব্যথা— সব একসঙ্গে।



