মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখলে কত অজানা রহস্যই না চোখে পড়ে! কখনও বিশাল মরুভূমি, কখনও বরফে ঢাকা পাহাড়, আবার কখনও প্রকৃতির তৈরি অদ্ভুত সব নকশা। এবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এমনই এক আশ্চর্য দৃশ্য নজরে এসেছে, যা প্রথম দেখায় মনে হতে পারে বিশাল কোনও মাকড়সা পা ছড়িয়ে বসে রয়েছে। তবে এটি কোনও জীবন্ত প্রাণী নয়। পাথুরে জমির উপর তৈরি হওয়া মাকড়সার মতো এক ভূতাত্ত্বিক গঠন।
অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের কিম্বারলি এলাকায় অবস্থিত এই অদ্ভুত ভূপ্রকৃতির নাম ‘স্পাইডার ক্রেটার’ (Spider Crater)। মহাকাশ থেকে তোলা ছবিতে এর আকৃতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রায় ১৩ কিলোমিটার লম্বা এবং ১১ কিলোমিটার চওড়া এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই ভূপ্রকৃতির মধ্যে প্রায় ৪ কিলোমিটার জুড়ে মাকড়সার মতো নকশা দেখা যায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, কোটি কোটি বছর আগে একটি উল্কাপিণ্ডের আঘাতে এই অঞ্চলে বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিক্ষয়, পাথরের ক্ষয় এবং প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে সেখানে তৈরি হয়েছে মাকড়সার পায়ের মতো ছড়িয়ে থাকা নানা রেখা। ফলে মহাকাশ থেকে গোটা অঞ্চলটিকে দেখতে অনেকটা বিশাল মাকড়সার মতো লাগে।
অস্ট্রেলিয়ার কিম্বারলিতে কোথায় রয়েছে এই বিশাল মাকড়সা?
অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত কিম্বারলি অঞ্চল তার বিস্তীর্ণ পাথুরে ভূখণ্ড, প্রাচীন শিলাস্তর এবং বিচিত্র প্রাকৃতিক গঠনের জন্য পরিচিত। এই অঞ্চলেই রয়েছে স্পাইডার ক্রেটার নামে পরিচিত অদ্ভুত ভূতাত্ত্বিক কাঠামো।
মাটির উপর থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে এই জায়গার সম্পূর্ণ আকৃতি বোঝা কঠিন। কারণ, মাকড়সার মতো দেখতে নকশাটি বেশ বড় এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে গোটা ভূপ্রকৃতির বিন্যাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রায় ১৩ কিলোমিটার লম্বা এবং ১১ কিলোমিটার চওড়া অঞ্চলটির মধ্যে পাথুরে রেখাগুলি বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে রয়েছে। এই রেখাগুলির বিন্যাস অনেকটা মাকড়সার পায়ের মতো। আর সেই কারণেই জায়গাটির নাম হয়েছে স্পাইডার ক্রেটার।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, এই বিশাল আকৃতিটি কোনও প্রাণীর তৈরি নয়। এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক গঠন। দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবীর পৃষ্ঠে ঘটে যাওয়া নানা পরিবর্তনের ফলেই এমন অদ্ভুত নকশা তৈরি হয়েছে।
কোটি কোটি বছর আগে উল্কাপাত থেকেই কি তৈরি হয়েছিল স্পাইডার ক্রেটার?
বিজ্ঞানীদের আগ্রহের অন্যতম কারণ হল এই ভূপ্রকৃতির উৎপত্তি। গবেষকদের ধারণা, কোটি কোটি বছর আগে মহাকাশ থেকে ছুটে আসা একটি উল্কাপিণ্ড এই অঞ্চলে আছড়ে পড়েছিল। সেই প্রবল আঘাতে পাথুরে ভূত্বকে তৈরি হয়েছিল বিশাল গর্ত।
মহাকাশ থেকে আসা কোনও বড় পাথুরে বস্তু পৃথিবীর পৃষ্ঠে আঘাত করলে প্রচুর শক্তি নির্গত হয়। আঘাতের তীব্রতা এবং বস্তুটির আকারের উপর নির্ভর করে তৈরি হতে পারে বড়সড় গর্ত বা ইমপ্যাক্ট ক্রেটার। অনেক ক্ষেত্রে আঘাতের ফলে আশপাশের শিলাস্তর ভেঙে যায়, চ্যাপ্টা হয়ে যায় অথবা উপরের দিকে উঠে আসে।
স্পাইডার ক্রেটারের ক্ষেত্রেও উল্কাপাতের ফলে পাথুরে ভূখণ্ডের কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছিল বলে মনে করা হয়। তবে উল্কাপাতের পরই মাকড়সার মতো বর্তমান আকৃতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল, এমনটা নয়। বরং দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক সময় ধরে নানা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এই গঠনকে বর্তমান চেহারা দিয়েছে।
অর্থাৎ, একটি উল্কাপিণ্ডের আঘাত ছিল এই ভূপ্রকৃতির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু আজ মহাকাশ থেকে যে অদ্ভুত নকশা দেখা যায়, তা তৈরি হওয়ার পেছনে পরবর্তী সময়ের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ।
মাটির নিচের পাথর কীভাবে মাকড়সার পায়ের মতো আকার নিল?
স্পাইডার ক্রেটারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল, এর কেন্দ্রীয় অংশ থেকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে থাকা পাথুরে রেখা। দূর থেকে দেখলে এগুলি মাকড়সার পায়ের মতো মনে হয়।
বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উল্কাপাতের ফলে ওই অঞ্চলের শিলাস্তরে পরিবর্তন ঘটে। ভূগর্ভের কিছু পাথুরে স্তর উপরের দিকে উঠে আসে। এর ফলে আশপাশের তুলনায় উঁচু অংশ তৈরি হয়। পরে দীর্ঘ সময় ধরে বাতাস, বৃষ্টিপাত এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে অপেক্ষাকৃত নরম শিলা ক্ষয় হতে থাকে।
অন্যদিকে, শক্ত পাথরের অংশ তুলনামূলকভাবে বেশি সময় টিকে থাকে। এভাবে নরম ও শক্ত শিলার মধ্যে ক্ষয়ের পার্থক্য তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে ভূখণ্ডে উঁচু-নিচু অংশ এবং লম্বা পাথুরে রেখা তৈরি হতে পারে।
স্পাইডার ক্রেটারের ক্ষেত্রেও এই ধরনের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন মাকড়সার মতো আকৃতি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়। পাথুরে রেখাগুলি বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে যাওয়ায় পুরো অঞ্চলটিকে দেখতে একটি বিশাল মাকড়সার মতো লাগে।
বেলেপাথরের স্তরেও লুকিয়ে রয়েছে রহস্য
এই ভূপ্রকৃতির গঠন বোঝার ক্ষেত্রে বেলেপাথরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বেলেপাথর তৈরি হয় মূলত বালুকণার দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, চাপ এবং প্রাকৃতিক সিমেন্টেশনের ফলে। সময়ের সঙ্গে এই পাথর কখনও শক্ত হয়ে যায়, আবার কখনও আবহাওয়া ও ক্ষয়ের প্রভাবে ভেঙে পড়ে।
কোনও অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের শিলার কঠোরতা এক রকম না হলে ভূমিক্ষয়ও সমানভাবে ঘটে না। তুলনামূলক নরম পাথর দ্রুত ক্ষয়ে যেতে পারে, কিন্তু শক্ত অংশ অনেক দিন টিকে থাকে। ফলে মাটির উপর তৈরি হয় বিচিত্র রেখা, খাঁজ এবং উঁচু কাঠামো।
স্পাইডার ক্রেটারের ক্ষেত্রেও শিলাস্তরের এই বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। উল্কাপাতের ফলে তৈরি হওয়া প্রাচীন কাঠামোকে পরবর্তী ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
তবে এই ধরনের ভূপ্রকৃতির সম্পূর্ণ ইতিহাস জানতে শুধু উপগ্রহের ছবি যথেষ্ট নয়। বিজ্ঞানীদের পাথরের নমুনা পরীক্ষা করতে হয়, শিলাস্তরের বিন্যাস বুঝতে হয় এবং ভূতাত্ত্বিক তথ্যের সঙ্গে ছবির মিল খুঁজতে হয়।
নাসার উপগ্রহ কীভাবে খুঁজে পেল এই অদ্ভুত ভূপ্রকৃতি?
মহাকাশ থেকে পৃথিবীর ছবি তোলার ক্ষেত্রে উপগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি, বনভূমি, মরুভূমি, নদী এবং পাহাড়ের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে উপগ্রহের সাহায্য নেওয়া হয়।
উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে অনেক সময় এমন ভূপ্রকৃতি দেখা যায়, যা মাটির উপর থেকে সহজে বোঝা সম্ভব নয়। বিশাল এলাকা একসঙ্গে দেখা যায় বলে পাথুরে রেখা, গর্ত এবং ভূমির গঠন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
অস্ট্রেলিয়ার স্পাইডার ক্রেটারের মতো ভূপ্রকৃতির ক্ষেত্রেও মহাকাশ থেকে দেখা ছবির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। উপর থেকে এর কেন্দ্রীয় অংশ এবং চারদিকে ছড়িয়ে থাকা রেখাগুলির বিন্যাস সহজে চোখে পড়ে। সেই কারণে গোটা অঞ্চলটিকে মাকড়সার সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব হয়েছে।
তবে উপগ্রহের ছবি কোনও ভূপ্রকৃতির উৎপত্তি সম্পর্কে চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। ছবিতে দেখা আকৃতি বিশ্লেষণের পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা শিলাস্তর, পাথরের নমুনা এবং অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক তথ্যও পরীক্ষা করেন। এভাবেই কোনও প্রাচীন গর্তের উৎপত্তি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ধারণা তৈরি হয়।
পৃথিবীতেই রয়েছে মহাকাশের ইতিহাসের চিহ্ন
পৃথিবীর বুকের বহু প্রাচীন গর্ত ও অদ্ভুত ভূপ্রকৃতির সঙ্গে উল্কাপাতের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। কোটি কোটি বছর আগে মহাকাশ থেকে আসা বিভিন্ন বস্তু পৃথিবীর পৃষ্ঠে আঘাত করেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক গর্ত ক্ষয় হয়ে গিয়েছে, আবার কিছু গঠন এখনও স্পষ্টভাবে টিকে রয়েছে।
এই ধরনের ভূপ্রকৃতি বিজ্ঞানীদের পৃথিবীর অতীত সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে। কোনও গর্তের বয়স, শিলার গঠন এবং চারপাশের ভূখণ্ড পরীক্ষা করে বোঝার চেষ্টা করা হয়, কীভাবে এবং কখন সেই পরিবর্তন ঘটেছিল।
স্পাইডার ক্রেটারও সেই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এর মাকড়সার মতো আকৃতি যেমন মানুষের কৌতূহল বাড়ায়, তেমনই এর পেছনে থাকা ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বিজ্ঞানীদের কাছে গবেষণার বিষয়।
প্রকৃতির তৈরি এমন নকশা দেখিয়ে দেয়, পৃথিবীর পৃষ্ঠ সব সময় এক রকম থাকে না। কোটি কোটি বছর ধরে উল্কাপাত, শিলার পরিবর্তন, বাতাস, জল এবং ভূমিক্ষয়ের মতো প্রক্রিয়া পৃথিবীকে নতুন নতুন রূপ দিয়েছে।
মাকড়সার মতো ভূপ্রকৃতি, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস
অস্ট্রেলিয়ার কিম্বারলি অঞ্চলের স্পাইডার ক্রেটার প্রথম দেখায় বিশাল কোনও মাকড়সার মতো মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস। প্রায় ১৩ কিলোমিটার লম্বা এবং ১১ কিলোমিটার চওড়া এলাকার মধ্যে প্রায় ৪ কিলোমিটার জুড়ে মাকড়সার মতো নকশা দেখা যায়।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রাচীন উল্কাপাতের ফলে ওই অঞ্চলের পাথুরে ভূখণ্ডে পরিবর্তন ঘটেছিল। পরবর্তী সময়ে শিলার ক্ষয় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া সেই কাঠামোকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
এই আবিষ্কার আবারও মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর বুকেই এমন বহু রহস্য লুকিয়ে রয়েছে, যা মহাকাশ থেকে দেখলে নতুনভাবে ধরা পড়ে। কোনও কোনও জায়গা দেখতে জীবন্ত প্রাণীর মতো হলেও বাস্তবে তার পেছনে থাকে লক্ষ লক্ষ বা কোটি কোটি বছরের প্রাকৃতিক ইতিহাস।
মহাকাশ থেকে দেখা এই মাকড়সা তাই কোনও জীবন্ত প্রাণী নয়, বরং পৃথিবীর প্রাচীন অতীতের এক বিস্ময়কর চিহ্ন।



