এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : আকাশে তখন ভয়াবহ পরিস্থিতি। দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের বিমান ছুটছে গন্তব্যের দিকে। আচমকাই ককপিটের ভিতরে শুরু হল হামলা। সহ-পাইলটের আক্রমণে গুরুতর আহত হলেন ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর। কিন্তু রক্তাক্ত অবস্থাতেও তিনি হাল ছাড়েননি। বরং ককপিটের দরজা খোলার ব্যবস্থা করে এমন একটি সুযোগ তৈরি করেন, যার ফলে যাত্রী ও অন্য পাইলটরা ভিতরে ঢুকে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন।
FZ1073 নম্বর ওই বিমানে ছিলেন ১৭৪ জন যাত্রী। হামলার পর বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারাতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত যাত্রী ও বিমানে থাকা অন্য প্রশিক্ষিত পাইলটদের সহায়তায় বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে। গুরুতর আহত স্মিত মচ্ছরকে পরে চিকিৎসার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে স্থানান্তর করা হয়।
এই ঘটনার পর ভারতের বিমানচালক স্মিত মচ্ছরের সাহসিকতা আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনায় এসেছে। তাঁর এই ঘটনা প্রায় চার দশক আগে করাচিতে নীরজা ভানোটের আত্মত্যাগের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ওই ঘটনায় ককপিটের ভিতরেই ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের উপর হামলা হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পর বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারাতে শুরু করে এবং জরুরি পরিস্থিতির সংকেত পাঠানো হয়।
গুরুতর আহত অবস্থাতেও মচ্ছর ককপিটের দরজা খোলার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হন। এর পর যাত্রী এবং বিমানটিতে থাকা অন্য পাইলটরা ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে বিকল্প পাইলটরা বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেটিকে তাবুকে নামিয়ে আনেন।
এই কারণেই মচ্ছরের ভূমিকা নিয়ে প্রশংসা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর দফতর জানায়, গুরুতর আহত হয়েও অন্যদের জীবন রক্ষায় মচ্ছরের সাহস ও দৃঢ়তার প্রশংসা করেছেন মোদি।
২ অক্টোবর স্মিত মচ্ছরের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই কথোপকথনে তিনি আহত পাইলটের সাহসিকতার প্রশংসা করেন এবং বলেন, মচ্ছর নিজের জীবনের কথা না ভেবে বিমানে থাকা মানুষের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
মোদি আরও বলেন, ভারতীয়রা অন্যের প্রাণ নেওয়ার মানুষ নয়; বরং প্রয়োজন হলে নিজের জীবন ঝুঁকিতে রেখে অন্যের প্রাণ বাঁচাতে প্রস্তুত। এই মন্তব্যের পাশাপাশি তিনি মচ্ছরের সাহসকে ভারতের গর্বের সঙ্গে যুক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী ১ অক্টোবরও মচ্ছরকে ‘হিরো’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছিলেন, তাঁর সাহস ও অন্যদের জীবন রক্ষার দৃঢ়তা একটি বড় বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করেছে।
স্মিত মচ্ছরের ঘটনার সঙ্গে অনেকেরই মনে পড়ছে নীরজা ভানোটের কথা। কারণ দু’টি ঘটনাতেই বিমানযাত্রীদের নিরাপত্তাকে নিজের জীবনের চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
১৯৮৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর করাচি বিমানবন্দরে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েছিল প্যান অ্যাম ফ্লাইট ৭৩। সেই বিমানের সিনিয়র ফ্লাইট পার্সার ছিলেন ভারতীয় বিমানসেবিকা নীরজা ভানোট।
ছিনতাইকারীরা বিমানে ঢোকার পর নীরজা ককপিটের পাইলটদের সতর্ক করেছিলেন। পাইলটরা যাতে বিমানটি নিয়ে উড়তে না পারেন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। পরে জরুরি দরজা খুলে যাত্রীদের বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। যাত্রীদের নিরাপদে বের করে দেওয়ার সময় ছিনতাইকারীদের গুলিতে প্রাণ হারান মাত্র ২৩ বছরের নীরজা।
তাঁর সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৭ সালে তাঁকে অশোক চক্র দেওয়া হয়। তিনি এই সম্মান পাওয়া সবচেয়ে কমবয়সী এবং প্রথম নারী ছিলেন।
নীরজা ভানোট এবং স্মিত মচ্ছরের ঘটনা এক নয়। সময় আলাদা, পরিস্থিতি আলাদা এবং বিমান দুর্ঘটনা বা ছিনতাইয়ের ধরনও আলাদা।
তবু একটি জায়গায় দু’জনের ঘটনা একে অপরের কথা মনে করিয়ে দেয়। দু’জনই ভয়াবহ বিপদের মধ্যে বিমানে থাকা অন্য মানুষের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
নীরজা নিজের জীবন দিয়ে বহু যাত্রীকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আর স্মিত গুরুতর আহত হয়েও ককপিটের দরজা খুলে দেন, যাতে অন্যরা ভিতরে ঢুকে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ঘটনার পর কো-পাইলটের পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিয়ে নানা দাবি সামনে এসেছে। কিছু ইজরায়েলি কর্মকর্তা ঘটনাটিকে সন্ত্রাসবাদী হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে হামলাকারীর প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং ঘটনার পূর্ণ পটভূমি নিয়ে তদন্ত চলছে।
তাই এই মুহূর্তে তাকে নিশ্চিতভাবে আত্মঘাতী জঙ্গি বা নির্দিষ্ট কোনও উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তদন্তে ককপিটে কো-পাইলটের হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ঘটনার সম্পূর্ণ কারণ জানতে তদন্ত শেষ হওয়া প্রয়োজন।
হামলার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে বিমানের যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, বিমানে থাকা অন্য পাইলটরাও পরে বিমানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। শেষ পর্যন্ত ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে।
এই ঘটনায় মচ্ছর গুরুতর আহত হলেও যাত্রীরা বেঁচে যান। পরে তাঁকে তাবুক থেকে আবুধাবিতে চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষও তাঁর চিকিৎসার বিষয়ে নজর রাখছে বলে জানিয়েছে।
নীরজা ভানোটের আত্মত্যাগের প্রায় ৪০ বছর পর স্মিত মচ্ছরের ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, বিমানে জরুরি পরিস্থিতিতে পাইলট ও ক্রু সদস্যদের উপস্থিত বুদ্ধি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
নীরজা ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন নিজের জীবন উৎসর্গ করে যাত্রীদের বাঁচানোর জন্য। আর স্মিত মচ্ছর গুরুতর আহত অবস্থাতেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন।
দুই ঘটনার মধ্যে সরাসরি ঐতিহাসিক যোগসূত্র নেই। কিন্তু দু’জনের কাজের কেন্দ্রবিন্দু ছিল একই—বিপদের মুহূর্তে অন্য মানুষের জীবন রক্ষা করা।
স্মিত মচ্ছরের ঘটনা নিয়ে তদন্ত এখনও চলছে। তাই ঘটনার প্রতিটি দিক স্পষ্ট হওয়ার জন্য তদন্তের ফলের অপেক্ষা করাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এতটুকু নিশ্চিত যে, ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্ত বিমানটিতে থাকা মানুষদের নিরাপদে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করেছিল।



