এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানের ককপিটে ভয়াবহ হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত সহকারী পাইলটকে ঘিরে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন প্রশ্ন। ভারতীয় ক্যাপ্টেনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত এবং বিমানটি ভেঙে ফেলার চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সেই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে পর পর দু’টি পোস্ট প্রকাশ্যে আসার খবর সামনে এসেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পোস্টগুলি কি অভিযুক্ত পাইলট নিজেই করেছিলেন? নাকি ঘটনার আগেই সেগুলি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ‘শিডিউল’ করে রাখা হয়েছিল?
এই মুহূর্তে কোনও প্রশ্নেরই নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যায়নি। কারণ যে অ্যাকাউন্টটির সঙ্গে অভিযুক্তের নামের মিল পাওয়া গিয়েছে, সেটি সত্যিই তাঁর কি না, তা এখনও সরকারি ভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে সমাজমাধ্যমের পোস্টগুলিকে তদন্তের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই।
ফ্লাইদুবাইয়ের বিমান FZ1073-এর ককপিটে ৩০ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর গুরুতর আহত হন। অভিযোগ, সহকারী পাইলট ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাঁর উপর হামলা চালান এবং বিমানটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে।
ঘটনার পর অভিযুক্তকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। এখনও পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁর নাম, ছবি বা সম্পূর্ণ পরিচয় আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করেনি।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে সূত্র উদ্ধৃত করে অভিযুক্তের নাম **হামাম আল-হাম্মামি** বলে দাবি করা হয়েছে। তিনি ওমানের নাগরিক বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর নামে একটি লিঙ্কডইন প্রোফাইলও খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। যদিও সেটিই অভিযুক্ত সহকারী পাইলটের প্রকৃত অ্যাকাউন্ট কি না, তা স্বাধীন ভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
প্রকাশ্যে আসা প্রোফাইল অনুযায়ী, হামাম আল-হাম্মামি ইংল্যান্ডের বাকিংহ্যামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটিতে বিমান পরিবহণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। ২০২৩ সালে তাঁর তিন বছরের ডিগ্রি কোর্স শেষ করার তথ্যও ওই প্রোফাইলে ছিল বলে জানা গিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর পড়াশোনার বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রোফাইলে বিমান পরিবহণ ক্ষেত্রে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ ছিল। ওমান এয়ার এবং মরক্কোর রয়্যাল এয়ার মারোকের সঙ্গে কাজের তথ্য সেখানে দেখা গিয়েছিল বলে জানা যায়।
পরে ওই লিঙ্কডইন অ্যাকাউন্টটি সরিয়ে দেওয়া হয়।
অভিযুক্তের অতীত কর্মজীবন নিয়েও বিভিন্ন দাবি সামনে এসেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি দীর্ঘ সময় ওমান এয়ারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তাঁর কথিত উগ্রপন্থী মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার পর তাঁকে বিমান চালানোর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে এই দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত সরকারি বক্তব্য এখনও সামনে আসেনি।
পরবর্তী সময়ে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন। তাঁর কয়েক জন সহকর্মীর দাবি, ঘটনার প্রায় আট মাস আগে তিনি ওই সংস্থায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন।
এই তথ্যগুলি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ওঠা অতীতের অভিযোগ এবং তাঁর বর্তমান মামলার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলা সম্ভব নয়।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে একটি সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্টকে ঘিরে। ওই অ্যাকাউন্টে মাত্র দু’টি পোস্ট পাওয়া গিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
কৌতূহলের বিষয় হল, দু’টি পোস্টই করা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ ফ্লাইদুবাইয়ের ককপিটে হামলার দিন।
প্রথম পোস্টে একাধিক ছবি বা দৃশ্য ছিল বলে জানা গিয়েছে। তার মধ্যে একটি ছবিতে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স বিমানের ককপিট এবং অন্য একটি দৃশ্যে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ছবি দেখা যায়।
এই পোস্টের সময় এবং বিষয়বস্তু তদন্তকারীদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরও বিতর্ক তৈরি করেছে দ্বিতীয় পোস্টটি। ওই পোস্টের ভিডিয়োর শেষ দিকে আল-কায়েদার প্রয়াত নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরির ছবি দেখা গিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আয়মান আল-জাওয়াহিরি দীর্ঘদিন আল-কায়েদার নেতৃত্বে ছিলেন। ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর তিনি সংগঠনটির প্রধান হন। ২০২২ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এই ছবি কেন ওই পোস্টে ব্যবহার করা হয়েছিল, তার কোনও নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে পোস্টটির উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও তদন্তের আগে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন।
এখন তদন্তকারীদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির একটি হল, হামলার পর অভিযুক্ত হেফাজতে থাকলে তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্টগুলি কীভাবে প্রকাশিত হল?
একটি সম্ভাবনা হল, পোস্টগুলি আগে থেকেই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শিডিউল করে রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ ব্যবহারকারী আগেই পোস্ট তৈরি করে নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ে স্বয়ংক্রিয় ভাবে প্রকাশের ব্যবস্থা করে রাখতে পারেন।
তবে এটিও কেবল একটি সম্ভাবনা। পোস্টগুলি অন্য কোনও ব্যক্তি করেছেন কি না, অ্যাকাউন্টটি সত্যিই অভিযুক্তের কি না, কিংবা অ্যাকাউন্টে অন্য কারও প্রবেশাধিকার ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও তদন্তের প্রয়োজন।
তাই শুধু পোস্ট প্রকাশের সময় দেখে অভিযুক্ত আগে থেকেই কোনও পরিকল্পনা করেছিলেন বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।
ঘটনাটি নিয়ে ইজরায়েলের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, অভিযুক্ত ইসলামপন্থী উগ্রপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত ছিলেন এবং বিমানে থাকা ইজরায়েলি নাগরিকদের হত্যার উদ্দেশ্যে বিমানটি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন।
ইজরায়েল ঘটনাটিকে সন্ত্রাসবাদী হামলা হিসেবেও বর্ণনা করেছে।
তবে ঘটনাটির তদন্ত যে দেশে চলছে, সেই সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এখনও অভিযুক্তের উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনও মন্তব্য করেনি। তাদের বক্তব্য, তদন্ত চলাকালীন আগাম কোনও সিদ্ধান্ত প্রকাশ করলে তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে।
এই অবস্থায় ইজরায়েলের অভিযোগ এবং তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তকে আলাদা করে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
তদন্তে সমাজমাধ্যমের পোস্ট গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। বিশেষ করে পোস্টের সময়, আইপি বা লগইন তথ্য, অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ, ডিভাইসের ব্যবহার এবং পোস্ট তৈরির সময়কার ডিজিটাল তথ্য পরীক্ষা করা হলে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।
পোস্টগুলি আগে তৈরি করা হয়েছিল কি না, কে অ্যাকাউন্টে ঢুকেছিল এবং কোনও স্বয়ংক্রিয় প্রকাশের ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছিল কি না—ডিজিটাল ফরেন্সিক পরীক্ষায় এসব বিষয় যাচাই করা সম্ভব।
তবে তদন্তকারীদের হাতে সেই তথ্য প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত সমাজমাধ্যমের পোস্টকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
একদিকে রয়েছে বিমানের ককপিটে ভারতীয় ক্যাপ্টেনের উপর হামলার অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্ত পাইলটের নামে পাওয়া সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্ট এবং ঘটনার দিন প্রকাশিত রহস্যময় দু’টি পোস্ট। সব মিলিয়ে তদন্তের পরিধি আরও বড় হয়েছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও বাকি। অ্যাকাউন্টটি কি সত্যিই অভিযুক্তের? পোস্টগুলি কে তৈরি করেছিলেন? সেগুলি কি আগে থেকেই শিডিউল করা হয়েছিল? আর ককপিটে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্যই বা কী ছিল?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর তদন্ত শেষ হলেই স্পষ্ট হতে পারে। তার আগে সমাজমাধ্যমের পোস্ট, কর্মজীবনের তথ্য কিংবা বিভিন্ন সূত্রের দাবি থেকে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঝুঁকিপূর্ণ।
ফ্লাইদুবাইয়ের এই ঘটনার তদন্ত তাই এখন শুধু ককপিটে কী ঘটেছিল, তা জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অভিযুক্তের ডিজিটাল কার্যকলাপ, অতীত কর্মজীবন এবং ঘটনার আগে-পরে তাঁর গতিবিধিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।



