সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeসর্বশেষ সংবাদপাখির উড়ান নিয়ে নতুন আবিষ্কার, ডানা উপরে তুলেও কীভাবে সামনে এগোয় নাইটজার?

পাখির উড়ান নিয়ে নতুন আবিষ্কার, ডানা উপরে তুলেও কীভাবে সামনে এগোয় নাইটজার?

নাইটজারের উড়ানের কৌশল সেই গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে, ডানা উপরে তোলার সময়ও কীভাবে কার্যকর বল তৈরি করা যায়, তা বুঝতে পারলে ডানার নকশা এবং নড়াচড়ার ধরন সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা পাওয়া সম্ভব।

এনবি সংবাদ, অনলাইন : পাখি সাধারণত ডানা ঝাপটে আকাশে উড়ে বেড়ায়। ডানা নিচের দিকে নামানোর সময় তৈরি হয় সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয় বল। কিন্তু ডানা উপরের দিকে তোলার সময়ও যদি সেই পাখি সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি তৈরি করতে পারে, তা হলে? শুনতে অবাক লাগলেও প্রকৃতিতে এমনই এক অসাধারণ কৌশল ব্যবহার করে ইউরোপীয় নাইটজার নামে এক নিশাচর পাখি। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে এই পাখির উড়ানের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য, যা পাখির ওড়ার প্রচলিত ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেছে।

সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বিশেষ উইন্ড টানেলে এই পাখির উড়ান পরীক্ষা করে ডানার নড়াচড়া এবং তার পিছনে তৈরি হওয়া বাতাসের প্রবাহ বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, ডানা উপরের দিকে তোলার সময়ও নাইটজার এমনভাবে ডানা নাড়ায়, যাতে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বল তৈরি হতে পারে।

এই কৌশল পাখিটির ধীরগতিতে উড়তে এবং সন্ধ্যার অন্ধকারে উড়ন্ত পোকামাকড় শিকার করতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে ডানা ঝাপটিয়ে উড়তে সক্ষম রোবট তৈরির গবেষণাতেও নতুন দিশা দেখাতে পারে।

ইউরোপীয় নাইটজার: রাতের আকাশের দক্ষ শিকারি

ইউরোপীয় নাইটজার (European nightjar) এমন একটি পাখি, যার জীবনযাত্রার সঙ্গে রাতের পরিবেশ গভীরভাবে জড়িত। দিনের আলোয় গাছের ডালপালা কিংবা মাটির সঙ্গে মিশে থাকা ছদ্মবেশী পালকের কারণে পাখিটিকে সহজে চেনা যায় না। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় তার ব্যস্ততা। তখন উড়ন্ত পোকামাকড় শিকারের জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠে এই নিশাচর পাখি।

নাইটজারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এটি প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে উড়তে পারে। বাতাসে ভেসে থেকে পোকামাকড়ের গতিবিধি অনুসরণ করতেও সক্ষম। শিকার ধরার সময় এই দক্ষতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পোকামাকড়ের অবস্থান অনুযায়ী পাখিটিকে কখনও গতি কমাতে হয়, আবার কখনও দ্রুত দিক পরিবর্তন করতে হয়।

প্রতিবছর ইউরোপ থেকে আফ্রিকার দক্ষিণাংশ পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয় ইউরোপীয় নাইটজার। পরিযায়ী এই পাখির এমন দীর্ঘ যাত্রা এবং রাতের বেলায় শিকার করার ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরেই গবেষকদের আগ্রহের বিষয়। এবার তার ডানার নড়াচড়া নিয়ে গবেষণায় সামনে এল আরও একটি চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য।

ডানা উপরে তুলেও কীভাবে সামনের দিকে এগোয় নাইটজার?

পাখির উড়ানের সাধারণ প্রক্রিয়ায় ডানা নিচের দিকে নামানোর সময় বাতাসকে পিছনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এর ফলে পাখির শরীরে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বল তৈরি হয়। পাশাপাশি ডানার আকৃতি ও বাতাসের প্রবাহের কারণে তৈরি হওয়া উত্তোলন বল পাখিকে আকাশে ভেসে থাকতে সাহায্য করে।

অন্যদিকে, ডানা উপরের দিকে তোলার সময় অনেক পাখির ক্ষেত্রে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কার্যকর বল তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু নাইটজারের ডানার নড়াচড়া এই পরিচিত ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম তুলে ধরেছে।

লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বিশেষ উইন্ড টানেলের সাহায্যে পাখিটির ওড়ার সময় ডানার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। উইন্ড টানেল এমন একটি পরীক্ষাগার, যেখানে নিয়ন্ত্রিতভাবে বাতাসের প্রবাহ তৈরি করে কোনও প্রাণী বা বস্তুর ওপর তার প্রভাব পরীক্ষা করা যায়।

এই পরীক্ষায় গবেষকেরা শুধু ডানার ওঠানামা দেখেননি, ডানা নাড়ানোর ফলে পাখিটির পিছনে বাতাস কীভাবে প্রবাহিত হচ্ছে, তাও বিশ্লেষণ করেছেন। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ডানা উপরের দিকে ওঠার সময়ও নাইটজারের ডানার বাইরের অংশ এমনভাবে নড়াচড়া করে, যা সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বল তৈরিতে সাহায্য করে।

অর্থাৎ, পাখিটির উড়ানের কৌশলে শুধু ডানা নিচে নামানোর সময়ই নয়, ডানা উপরে তোলার সময়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য নাইটজারের ধীরগতির উড়ানকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।

ডানা বেশি গুটিয়ে নেয় না এই নিশাচর পাখি

নাইটজারের উড়ানের রহস্য বুঝতে গিয়ে গবেষকেরা ডানার নড়াচড়ার একটি বিশেষ দিকেও নজর দিয়েছেন। ডানা উপরে তোলার সময় পাখিটি ডানাকে খুব বেশি গুটিয়ে নেয় না। এর ফলে ডানার বাইরের অংশ বাতাসের সঙ্গে এমনভাবে ক্রিয়া করতে পারে, যা সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয় বল তৈরিতে সহায়তা করে।

সাধারণভাবে ডানা ঝাপটানোর সময় পাখির ডানার আকৃতি এবং অবস্থান বদলে যায়। এই পরিবর্তনের সঙ্গে বাতাসের প্রবাহও পাল্টে যায়। ফলে ডানা কখন, কতটা এবং কোন দিকে নড়ছে, তার ওপর উড়ানের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে।

নাইটজারের ক্ষেত্রে ডানা উপরে তোলার সময়ও ডানার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কার্যকর অবস্থায় থাকে। এর ফলে ওই পর্যায়েও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো বল তৈরি হতে পারে।

এই কৌশলের গুরুত্ব বিশেষ করে ধীরগতির উড়ানের ক্ষেত্রে বোঝা যায়। পোকামাকড় শিকার করার সময় নাইটজারকে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত গতিতে উড়তে হয়। অতিরিক্ত দ্রুত উড়লে শিকার ধরার সুযোগ কমে যেতে পারে। তাই ডানার নড়াচড়ার মাধ্যমে ধীরগতিতে উড়ে থাকার পাশাপাশি সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ধরে রাখা পাখিটির জন্য সুবিধাজনক।

বাদুড় ও হামিংবার্ডের সঙ্গে কোথায় মিল?

ডানা উপরে তোলার সময়ও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বল তৈরির কৌশল একেবারে অজানা নয়। এর আগে বাদুড়, কিছু পতঙ্গ এবং হামিংবার্ডের উড়ানের ক্ষেত্রেও ডানার বিশেষ নড়াচড়া নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

হামিংবার্ডের উড়ান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ছোট এই পাখি দ্রুত ডানা ঝাপটিয়ে বাতাসে প্রায় একই জায়গায় স্থির থাকতে পারে। ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করার সময় তার এই ক্ষমতা কাজে লাগে। অন্যদিকে, বাদুড়ের ডানার গঠন ও নড়াচড়া তাদের ধীরগতির উড়ান এবং জটিল পরিবেশে চলাচলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নাইটজারের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পাখিটির ডানার নড়াচড়ার মধ্যেও এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এই প্রাণীদের উড়ানের কৌশলের সঙ্গে তুলনা করা যায়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে নাইটজার, বাদুড় এবং হামিংবার্ড একই পদ্ধতিতে উড়ে। তাদের শরীরের গঠন, ডানার আকৃতি এবং উড়ানের ধরনে পার্থক্য রয়েছে। গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, ভিন্ন ধরনের প্রাণীও ডানার নড়াচড়া ও বাতাসের প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে একই ধরনের কিছু উড়ানগত সুবিধা অর্জন করতে পারে।

বিশেষ কৌশলের বিনিময়ে কিছুটা কমে দ্রুত উড়ানের দক্ষতা

প্রকৃতিতে কোনও বিশেষ বৈশিষ্ট্য অনেক সময় একদিকে সুবিধা দেয়, অন্যদিকে কিছু সীমাবদ্ধতাও তৈরি করে। নাইটজারের ক্ষেত্রেও তেমন একটি বিষয় উঠে এসেছে।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ডানা উপরে তোলার সময়ও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বল তৈরির কৌশল পাখিটিকে ধীরগতিতে উড়তে সাহায্য করে। কিন্তু দ্রুতগতিতে উড়ার সময় এই একই কৌশল ডানার কার্যকারিতায় কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।

এর কারণ, ধীরগতিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং দ্রুতগতিতে সর্বোচ্চ কার্যকারিতায় উড়ে চলা এক বিষয় নয়। পাখির ডানার নড়াচড়া, বাতাসের প্রতিরোধ এবং শক্তি ব্যবহারের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়। যে কৌশল একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সুবিধা দেয়, অন্য পরিস্থিতিতে তা সমান কার্যকর নাও হতে পারে।

নাইটজারের জীবনযাত্রায় ধীরগতিতে উড়ে পোকামাকড় শিকার করার গুরুত্ব রয়েছে। তাই দ্রুতগতির উড়ানে কিছুটা সীমাবদ্ধতা থাকলেও তার বিশেষ ডানার কৌশল রাতের শিকারের সময় কার্যকর সুবিধা দিতে পারে।

পাখির উড়ানের গবেষণায় কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

পাখিরা কীভাবে আকাশে ওড়ে, তা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে ডানার গঠন, বাতাসের প্রবাহ এবং শরীরের গতিবিধি নিয়ে গবেষণা করছেন। এই গবেষণা শুধু প্রাণীদের জীবনযাত্রা বোঝার জন্য নয়, প্রকৃতির নকশা থেকে নতুন প্রযুক্তি তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

নাইটজারের উড়ানের কৌশল সেই গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে, ডানা উপরে তোলার সময়ও কীভাবে কার্যকর বল তৈরি করা যায়, তা বুঝতে পারলে ডানার নকশা এবং নড়াচড়ার ধরন সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা পাওয়া সম্ভব।

এর প্রভাব পড়তে পারে ডানা ঝাপটিয়ে উড়তে সক্ষম রোবট তৈরির গবেষণায়। সাধারণ ড্রোনে সাধারণত ঘূর্ণায়মান প্রপেলার ব্যবহার করা হয়। কিন্তু পাখির মতো ডানা ঝাপটিয়ে উড়তে পারে এমন যন্ত্র তৈরি করতে হলে ডানার প্রতিটি নড়াচড়া কীভাবে বাতাসকে প্রভাবিত করে, তা বুঝতে হবে।

নাইটজারের কৌশল অনুকরণ করতে পারলে ভবিষ্যতে এমন উড়ন্ত রোবট তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যেগুলি কম গতিতে চলাচল করতে পারবে এবং সীমিত জায়গায় আরও ভালোভাবে উড়ান নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তবে বাস্তবে এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে আরও গবেষণা ও পরীক্ষা প্রয়োজন।

প্রকৃতির কাছেই মিলছে নতুন প্রযুক্তির সূত্র

নাইটজারের উড়ান নিয়ে এই গবেষণা মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির বহু পরিচিত প্রাণীর মধ্যেও এমন দক্ষতা লুকিয়ে রয়েছে, যা এখনও বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

সন্ধ্যার অন্ধকারে পোকামাকড় শিকার করা এই নিশাচর পাখি শুধু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতেই সক্ষম নয়, তার ডানার নড়াচড়ার মধ্যেও রয়েছে বিশেষ কৌশল। ডানা উপরে তোলার সময়ও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বল তৈরি করার ক্ষমতা তার ধীরগতির উড়ানকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।

এই আবিষ্কার পাখির উড়ানের প্রচলিত ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে ডানার নড়াচড়া, বাতাসের প্রবাহ এবং উড়ানের কার্যকারিতা নিয়ে ভবিষ্যতের গবেষণার নতুন পথ খুলে দিয়েছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ