এনবি সংবাদ, অনলাইন : বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর এক লাখ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে জাপান সরকার সম্মতি দিয়েছে—এমন খবরকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জাপানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে বছরে এক লাখ কর্মী নিয়োগের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এমনকি গত ২৭ অক্টোবর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও এ বিষয়ে কোনো সমঝোতা বা চুক্তি হয়নি।
জাপানের এই বক্তব্যের পর বাংলাদেশ থেকে দেশটির শ্রমবাজারে বিপুলসংখ্যক কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক লাখ কর্মী পাঠানোর খবরের সঙ্গে জাপান সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস সেক্রেটারি কিতামুরা তোশিহিরো এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার খবর নাকচ করেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর এক লাখ কর্মী গ্রহণের বিষয়ে জাপান সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত নেই। গত ২৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ও জাপানের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকেও এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বৈঠকের আনুষ্ঠানিক বিবরণ দেখার পরামর্শ দেন তিনি।
জাপানের এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মী পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর অনেকের মধ্যে জাপানে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার প্রত্যাশা জন্মেছিল। কিন্তু টোকিওর আনুষ্ঠানিক অবস্থান বলছে, এক লাখ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেশটির শ্রমবাজারে এক লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়।
কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদনে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, জাপানের শ্রমবাজারে কর্মীর চাহিদা বিবেচনা করে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর এক লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়, জাপানে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কয়েকটি নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে কারিগরি প্রশিক্ষণার্থী, নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী এবং বিভিন্ন পেশায় অভিজ্ঞ জনশক্তি।
তবে এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা জরুরি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এক লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা করা এবং জাপান সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবছর ওই সংখ্যক কর্মী গ্রহণে সম্মতি দেওয়া এক বিষয় নয়।
কোনো দেশ তার নাগরিকদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা, নিয়োগনীতি, ভিসা প্রক্রিয়া এবং দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা প্রয়োজন।
While recent social media posts have falsely suggested that the Government of Japan agreed to accept 100,000 workers from Bangladesh, no such fact exists, including within the discussions during the Japan-Bangladesh Summit Meeting on Oct. 27. For details on the Japan-Bangladesh Summit Meeting, please visit the MOFA website. https://t.co/PBuEd9sbm7
— 北村 俊博 KITAMURA TOSHIHIRO (@PressSec_MofaJP) October 29, 2026
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে এই পার্থক্যই পরিষ্কার হয়েছে।
গত ২৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ও জাপানের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠককে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।
তবে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বৈঠকের আনুষ্ঠানিক বিবরণে বাংলাদেশ থেকে বছরে এক লাখ কর্মী নেওয়ার কোনো সিদ্ধান্তের উল্লেখ নেই।
বৈঠকে মূলত অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জাপানি বিনিয়োগ, আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাপানের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
বিশেষ করে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। ফলে বৈঠকটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সেখানে আসেনি।
বাংলাদেশ-জাপান বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাতের মাধ্যমে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা জানান।
এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়।
বিনিয়োগের এই সম্ভাবনা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি এবং উৎপাদন খাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়লে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
তবে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। একটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের ফলে চাকরির সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কর্মীরা জাপানে গিয়ে কাজ করার সুযোগ পাবেন।
এই দুই বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
এক লাখ কর্মী নেওয়ার খবর অস্বীকার করলেও জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ একেবারে বন্ধ নয়। বরং নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকলে বাংলাদেশিরা দেশটিতে কাজ করার সুযোগ পেতে পারেন।
বর্তমানে জাপানে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি রয়েছে। এগুলো হলো স্পেসিফায়েড স্কিলড ওয়ার্কার (এসএসডব্লিউ) এবং টেকনিক্যাল ইন্টার্ন কর্মসূচি।
স্পেসিফায়েড স্কিলড ওয়ার্কার (SSW): এই কর্মসূচির মাধ্যমে জাপানের বিভিন্ন খাতে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। দেশটির যেসব শিল্প ও পেশায় কর্মীর ঘাটতি রয়েছে, সেখানে নির্দিষ্ট দক্ষতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন বিদেশিরা কাজের সুযোগ পান।
টেকনিক্যাল ইন্টার্ন কর্মসূচি: এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশি কর্মীরা জাপানে গিয়ে নির্দিষ্ট পেশায় প্রশিক্ষণ ও কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো দক্ষতা উন্নয়ন এবং কারিগরি জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করা।
২০১৯ সালে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে এ বিষয়ে একটি সহযোগিতা স্মারক সই হয়েছিল। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে দক্ষ কর্মী পাঠানো এবং কর্মসংস্থানসংক্রান্ত সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়।
তবে এসব কর্মসূচির আওতায় জাপানে যেতে হলে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। শুধু কাজ করার আগ্রহ থাকলেই দেশটিতে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া যায় না।
জাপানের শ্রমবাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভাষাগত দক্ষতা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। দেশটিতে কাজ করতে গেলে জাপানি ভাষায় যোগাযোগ করার সক্ষমতা প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে নির্দেশনা বোঝা, সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনের জন্য ভাষাজ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাশাপাশি নির্দিষ্ট পেশায় কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ থাকতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দক্ষতা যাচাইয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি ভাষাগত যোগ্যতার প্রমাণও দিতে হয়।
এ কারণে জাপানে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া বেশ নিয়ন্ত্রিত। সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির নিয়ম, ভিসার শর্ত এবং নিয়োগকর্তার চাহিদা পূরণ করেই একজন বাংলাদেশি কর্মীকে দেশটিতে যাওয়ার সুযোগ পেতে হয়।
বাংলাদেশের জন্য জাপানের শ্রমবাজারে আরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হলে প্রশিক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা, জাপানি ভাষা শেখানোর সুযোগ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী তৈরি করা জরুরি।
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর এক লাখ কর্মী জাপানে পাঠানোর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও স্পষ্ট করে দিয়েছে, গত ২৭ অক্টোবরের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তাই এক লাখ কর্মী নেওয়ার খবরকে নিশ্চিত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রচার করা সঠিক নয়। বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা থাকলেও জাপান সরকারের আনুষ্ঠানিক সম্মতি, নির্দিষ্ট নিয়োগনীতি এবং বাস্তবায়নযোগ্য চুক্তি ছাড়া সেটিকে চূড়ান্ত সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
সব মিলিয়ে, জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা থাকলেও প্রতিবছর এক লাখ কর্মী নেওয়ার খবর এখনো ভিত্তিহীন। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও শ্রমবাজারের সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত চাকরিপ্রত্যাশীদের যাচাই করা সরকারি তথ্যের ওপর নির্ভর করাই সবচেয়ে নিরাপদ।



