এনবি সংবাদ, অনলাইন : একসময় পৃথিবীর তীব্র ঠান্ডায় দাপিয়ে বেড়াত বিশালাকার লোমশ হাতি ম্যামথ। ঘন লোমে ঢাকা শরীর, বিশাল বাঁকানো দাঁত আর শক্তিশালী গড়নের জন্য প্রাগৈতিহাসিক এই প্রাণী আজও মানুষের কৌতূহলের অন্যতম কেন্দ্র। কিন্তু হাজার হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় ম্যামথ।
এবার সেই বিলুপ্ত প্রাণীর বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। আধুনিক জিন এডিটিং প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং উন্নত বায়োটেকনোলজির সাহায্যে ম্যামথের মতো প্রাণী তৈরির পরিকল্পনা চলছে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা ২০২৮ সালের মধ্যে প্রথম ম্যামথ-সদৃশ শিশুর জন্ম দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছেন। তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সফল হলে ২০৩০ সালের মধ্যে এমন প্রাণীর দেখা মিলতে পারে।
ম্যামথ ছিল হাতি পরিবারেরই এক প্রাচীন সদস্য। বিশেষ করে উলি ম্যামথ বা লোমশ ম্যামথ প্রচণ্ড ঠান্ডা পরিবেশে বসবাসের জন্য সুপরিচিত ছিল। তাদের শরীর ঘন ও লম্বা লোমে ঢাকা থাকত। এই লোম এবং শরীরে থাকা অতিরিক্ত চর্বির স্তর তাদের হিমশীতল পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করত।
ম্যামথের অন্যতম আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল বিশাল বাঁকানো দাঁত। আকারেও তারা ছিল অত্যন্ত বড়। বরফযুগের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের বিচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে সময়ের সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে এই প্রাণীরা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়।
আজ ম্যামথকে দেখা যায় মূলত জীবাশ্ম, কঙ্কাল এবং বিজ্ঞানীদের তৈরি বিভিন্ন পুনর্গঠিত মডেলের মাধ্যমে। এবার সেই প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর বৈশিষ্ট্যকে জীবন্ত প্রাণীর মধ্যে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
বিজ্ঞানীরা সরাসরি একটি জীবিত ম্যামথের ক্লোন তৈরি করছেন না। বরং আধুনিক এশিয়াটিক হাতিকে গবেষণার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এর অন্যতম কারণ হল এশিয়াটিক হাতি এবং ম্যামথের মধ্যে জিনগত ও বিবর্তনগত সম্পর্ক রয়েছে। শরীরের গঠনেও দু’টির মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে। তাই এশিয়াটিক হাতির জিনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে ম্যামথের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে শরীরে ঘন লোম, ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা এবং কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্য তৈরির দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। ফলে তৈরি হওয়া প্রাণীটি হুবহু প্রাচীন ম্যামথ নাও হতে পারে। বরং আধুনিক হাতির সঙ্গে ম্যামথের বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে একটি নতুন প্রাণী তৈরি করার লক্ষ্য রয়েছে।
এই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলির একটি হল জিন এডিটিং। বিজ্ঞানীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এশিয়াটিক হাতির ডিএনএ-তে একাধিক পরিবর্তন করতে হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১৫০ ধরনের জেনেটিক পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। এর মাধ্যমে হাতির শরীরে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য তৈরি করার চেষ্টা করা হবে, যা প্রাচীন ম্যামথের মধ্যে দেখা যেত।
তবে বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। একটি প্রাণীর শরীরে একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য তৈরি করতে শুধু একটি জিন পরিবর্তন করলেই সবসময় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক জিন পরস্পরের সঙ্গে কীভাবে কাজ করে, তার ওপরও নির্ভর করে প্রাণীর বৈশিষ্ট্য।
এই কারণেই ম্যামথ-সদৃশ প্রাণী তৈরির গবেষণা জিন প্রকৌশলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেও কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিপুল পরিমাণ জেনেটিক তথ্য বিশ্লেষণ করতে এআই বিজ্ঞানীদের সহায়তা করতে পারে।
কোন জিনের সঙ্গে শরীরের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক রয়েছে, কোন ধরনের জেনেটিক পরিবর্তন প্রয়োজন এবং পরিবর্তনের সম্ভাব্য ফল কী হতে পারে—এসব বিশ্লেষণে আধুনিক কম্পিউটেশনাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বায়োটেকনোলজি সংস্থা Colossal Biosciences বিলুপ্ত প্রাণীর বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনার গবেষণা নিয়ে কাজ করছে। তাদের লক্ষ্য শুধু ম্যামথের মতো দেখতে প্রাণী তৈরি করা নয়, বরং প্রাচীন প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠনের সম্ভাবনা পরীক্ষা করা।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গবেষকদের লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যেই ম্যামথের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রথম শিশুর জন্ম দেওয়া। এরপর সেই প্রাণীর বৃদ্ধি ও বিকাশ পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী ধাপের গবেষণা এগিয়ে নেওয়া হবে।
তবে ২০২৮ সালের লক্ষ্যকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ গবেষণার প্রতিটি ধাপেই রয়েছে বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।
প্রথমে প্রয়োজনীয় জিনগত পরিবর্তন সফলভাবে করতে হবে। এরপর সেই পরিবর্তিত জেনেটিক উপাদান থেকে ভ্রূণ তৈরি, গর্ভধারণ এবং সুস্থ প্রাণীর জন্ম—সবকিছুই সফল হতে হবে। জন্মের পর প্রাণীটির স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যও নিশ্চিত করতে হবে।
বিজ্ঞানীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আরও বড়। তাঁদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যামথের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রাণীকে উপযুক্ত পরিবেশে রাখার পর্যায়ে পৌঁছানো।
কিন্তু এখানেই সামনে আসছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ম্যামথ যে পরিবেশে হাজার হাজার বছর আগে বেঁচে ছিল, বর্তমান পৃথিবীতে সেই পরিবেশ কতটা রয়েছে?
জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর বহু অঞ্চল আগের তুলনায় উষ্ণ হয়েছে। তাই গবেষণাগারে ম্যামথ-সদৃশ প্রাণী তৈরি করা গেলেও তাদের দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা সহজ হবে না।
একটি বিলুপ্ত প্রাণীর বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু তার জন্ম দেওয়া নয়। জন্মের পর সেই প্রাণী কীভাবে বাঁচবে, কী খাবে, কোথায় থাকবে এবং কীভাবে অন্য প্রাণীর সঙ্গে আচরণ করবে—এসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।
ম্যামথ ছিল বিশাল আকারের প্রাণী। তাই তাদের জন্য বড় জায়গা, পর্যাপ্ত খাবার এবং উপযুক্ত জলবায়ু প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে তাদের আচরণ ও প্রজনন ক্ষমতাও দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
এই কারণেই বিজ্ঞানীদের সামনে গবেষণাগারের বাইরেও বিশাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
ম্যামথকে ফিরিয়ে আনার এই উদ্যোগ সফল হলে তা জেনেটিক গবেষণার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে। এর মাধ্যমে বিলুপ্ত প্রাণীর বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠনের সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হবে।
তবে এখনই বলা সম্ভব নয় যে ২০২৮ সালে নিশ্চিতভাবেই ম্যামথ-সদৃশ প্রাণীর জন্ম হবে বা ২০৩০ সালের মধ্যে তারা পৃথিবীর কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলে ঘুরে বেড়াবে। এগুলি গবেষকদের নির্ধারিত লক্ষ্য ও পরিকল্পনা। বাস্তবে সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও বহু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এবং নিরাপত্তা যাচাই প্রয়োজন।
তবু কয়েক হাজার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া লোমশ হাতির বৈশিষ্ট্যকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা যে বিজ্ঞানীদের জন্য এক অভূতপূর্ব পরীক্ষা, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। সফল হলে একসময় জীবাশ্মের পাতায় বন্দি থাকা ম্যামথের গল্প নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে।



