মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ করা হলে এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি সম্ভাবনাময় নতুন অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, মোংলা বন্দরকে ঘিরে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও যশোরসহ আশপাশের অঞ্চলে শিল্প, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বড় সুযোগ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বাগেরহাটের মোংলায় ‘মোংলা বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এদিন সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। একই সঙ্গে বন্দরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি জানান, মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও যশোরসহ আশপাশের এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি পঞ্চগড় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে নেওয়া প্রকল্পটির ব্যয় ৪ হাজার ৬৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এর আওতায় দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো বন্দরের কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ানো এবং আধুনিক বন্দরসেবা নিশ্চিত করা।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর প্রধানমন্ত্রী বন্দরপ্রাঙ্গণে একটি গাছের চারাও রোপণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা গেলে শুধু মোংলা বন্দর নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে। এর ফলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাড়ার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
তারেক রহমান বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সাফল্য শুধু অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বন্দরসেবার মান কতটা উন্নত হলো, পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কতটা কমল, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কতটা বাড়ল এবং পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত রাখা গেল এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি মোংলা বন্দরে পরিবেশবান্ধব সেবা ব্যবস্থাপনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জাহাজের বর্জ্য নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও নিরাপত্তার মানদণ্ড অনুসরণ, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিপজ্জনক কার্যক্রম ব্যবস্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মোংলা বন্দরের নাব্যতা, নৌ চ্যানেলের নির্ভরযোগ্যতা এবং জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা জরুরি। আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছে বন্দরটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রতিযোগিতামূলক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
মোংলা বন্দরকে উপযুক্ত বাণিজ্যিক ও পরিচালনাগত শর্তে ‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
এই লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নও এই বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক অংশীজন, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ, সহজ সেবা, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
মোংলা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, একসময় খুলনা ও আশপাশের এলাকায় অসংখ্য মিল-কারখানা ছিল। এ অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া শিল্পঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করে নতুন করে শিল্পায়নের পরিবেশ তৈরি করতে চায় সরকার।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আস্থা বাড়বে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুষম উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বাংলাদেশের অবকাঠামো ও উন্নয়নে চীনের অব্যাহত সহযোগিতার জন্য দেশটির সরকারকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
মোংলা সফরকালে ইনভেস্ট বাংলাদেশ ও চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) মধ্যে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এতে জ্বালানি, শিল্প অবকাঠামো, পরিবহন, লজিস্টিকস, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো খাতে বিনিয়োগ সহযোগিতার সুযোগ বাড়ানোর কথা রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার কমলাপুর আইসিডি থেকে কনটেইনারবাহী ট্রেন সরাসরি মোংলা বন্দরে চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে বলে জানানো হয়েছে।
এর ফলে বন্দরের পণ্য পরিবহন সক্ষমতা বাড়বে এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা ও লজিস্টিকস ব্যবস্থায়ও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মোংলা বন্দরের পাশাপাশি খানজাহান আলী বিমানবন্দরের উন্নয়ন কার্যক্রম চালু করাকেও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বন্দর, সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগের সমন্বিত উন্নয়ন হলে খুলনা ও আশপাশের অঞ্চলে শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোংলা বন্দরকে ঘিরে অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু একটি প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের বিষয়গুলোও সরাসরি যুক্ত।
মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নকে দেশের শিল্প-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা শক্তিশালী করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী।



