এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অক্টোবর মাসে হঠাৎ করেই নেমে এসেছে শীতের আমেজ। সাধারণত এই সময়ে দিল্লির আবহাওয়ায় গরমের রেশ কিছুটা থাকলেও এবার দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। কনকনে ঠান্ডা বাতাস, একটানা বৃষ্টি এবং অস্বাভাবিক তাপমাত্রা হ্রাসে রীতিমতো কাঁপছেন রাজধানীর বাসিন্দারা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেককেই আগেভাগে আলমারি থেকে বের করতে হয়েছে শীতের পোশাক।
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য বলছে, গত ৭৫ বছরে অক্টোবর মাসে এমন তাপমাত্রা পতনের ঘটনা দিল্লিতে আর দেখা যায়নি। শেষবার ১৯৫১ সালে অক্টোবর মাসে দিনের তাপমাত্রা এতটা নেমেছিল। দীর্ঘ সময় পর আবারও সেই পুরোনো আবহাওয়ার রেকর্ড সামনে চলে এসেছে। ফলে এবারের অক্টোবর দিল্লির আবহাওয়ার ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে।
দিল্লির বাসিন্দাদের কাছে অক্টোবর মাস সাধারণত শীতের প্রস্তুতি নেওয়ার সময়। দিনের বেলায় গরমের অনুভূতি থাকলেও রাতের দিকে কিছুটা ঠান্ডা পড়তে শুরু করে। তবে এবার সেই পরিচিত আবহাওয়ার ছন্দে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে।
হঠাৎ তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় রাজধানীর মানুষ অনেকটাই বিপাকে পড়েছেন। যাঁরা এখনও গরমের পোশাকেই অভ্যস্ত ছিলেন, তাঁদের অনেককেই দ্রুত সোয়েটার, জ্যাকেট ও মোটা চাদর বের করতে হয়েছে।
আবহাওয়া দপ্তরের রেকর্ড অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে দিল্লির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নেমে এসেছে ২০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। স্বাভাবিকের তুলনায় দিনের তাপমাত্রা প্রায় ১০ ডিগ্রি কমে যাওয়ায় আবহাওয়ায় বড় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অক্টোবর মাসে এতটা তাপমাত্রা হ্রাস সাধারণ ঘটনা নয়। ১৯৫১ সালের পর এমন পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে সাত দশক পর দিল্লির মানুষ আবারও এমন অস্বাভাবিক ঠান্ডার মুখোমুখি হয়েছেন।
হঠাৎ দিল্লির আবহাওয়ায় এমন পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে টানা বৃষ্টি ও আকাশ মেঘে ঢাকা থাকার পরিস্থিতি। গত দুই দিন ধরে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় অবিরাম বৃষ্টিপাত হয়েছে। সূর্যের আলো ঠিকমতো না পৌঁছানো এবং বৃষ্টির প্রভাবে তাপমাত্রা দ্রুত কমে গেছে।
সাধারণত দিনের বেলায় সূর্যের তাপে মাটি ও আশপাশের পরিবেশ উষ্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু দীর্ঘ সময় আকাশ মেঘে ঢাকা থাকলে সূর্যের তাপ সরাসরি ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারে না। এর সঙ্গে বৃষ্টির পানি ও ঠান্ডা বাতাস যুক্ত হলে পরিবেশ আরও শীতল হয়ে পড়ে।
দিল্লিতেও অনেকটা একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির পাশাপাশি কনকনে ঠান্ডা বাতাস বইতে থাকায় প্রকৃত তাপমাত্রার তুলনায় মানুষের কাছে ঠান্ডার অনুভূতি আরও বেশি হচ্ছে।
বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যার দিকে ঠান্ডার প্রকোপ বেশি অনুভূত হচ্ছে। ফলে অক্টোবরের শেষ দিকে এসে দিল্লির আবহাওয়া অনেকটা শীতের মৌসুমের মতো হয়ে উঠেছে।
শুধু তাপমাত্রা পতন নয়, বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রেও এবারের অক্টোবর দিল্লির জন্য ব্যতিক্রমী হয়ে উঠেছে। গত চার বছরের মধ্যে এমন বৃষ্টিভেজা অক্টোবর আর দেখেনি রাজধানী।
একটানা বৃষ্টির কারণে শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। সাধারণত অক্টোবরের শেষ দিকে দিল্লিতে শুষ্ক আবহাওয়া ও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা শীতের প্রভাব দেখা যায়। কিন্তু এবার বৃষ্টির দাপটে সেই চেনা আবহাওয়া অনেকটাই বদলে গেছে।
এই বৃষ্টিপাতের প্রভাব পড়েছে দিল্লির তাপমাত্রা, বাতাসের আর্দ্রতা এবং সামগ্রিক পরিবেশের ওপর। আবহাওয়ার এমন পরিবর্তন রাজধানীর বাসিন্দাদের কাছে যেমন বিস্ময়কর, তেমনই আবহাওয়াবিদদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।
দিল্লির আবহাওয়ার আলোচনায় তাপমাত্রা ও বৃষ্টির পাশাপাশি আরও একটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সেটি হলো বায়ুদূষণ।
প্রতিবছর অক্টোবর মাস এলেই দিল্লির বাতাসের মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে শীতের আগমনের সময় রাজধানীর বায়ুদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করে। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলাবালি এবং আশপাশের রাজ্যগুলোর কৃষিজমিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর ধোঁয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বিশেষ করে পঞ্জাব ও হরিয়ানার বিভিন্ন এলাকায় ধান কাটার পর জমিতে পড়ে থাকা খড় পোড়ানো হয়। সেই আগুনের ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে ভেসে দিল্লি ও আশপাশের এলাকায় পৌঁছায়। ফলে রাজধানীর বায়ুমান দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে।
কিন্তু এবার টানা বৃষ্টিতে সেই পরিচিত দূষণের চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে।
বৃষ্টির পানি বাতাসে ভাসমান ধুলাবালি ও দূষণকণা নিচে নামিয়ে আনতে সাহায্য করে। পাশাপাশি বৃষ্টির পর বাতাসের প্রবাহ বাড়লে দূষিত বায়ু ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে সাময়িকভাবে বাতাসের মান উন্নত হয়।
আবহাওয়া ও বায়ুমানসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের পর এবার অক্টোবর মাসে দিল্লির বাতাস সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন অবস্থায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ একদিকে যেমন তাপমাত্রা কমে রেকর্ড ঠান্ডা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বৃষ্টির কারণে বায়ুদূষণ থেকেও কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন রাজধানীর মানুষ।
দিল্লিতে অক্টোবর মাসের এই অস্বাভাবিক আবহাওয়া নতুন করে জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। কারণ, সাধারণত অক্টোবর মাসকে বর্ষা বিদায়ের পরবর্তী সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময় ধীরে ধীরে আকাশ পরিষ্কার হতে থাকে এবং তাপমাত্রাও শীতের দিকে এগোয়।
তবে বৃষ্টিপাতের সময়, পরিমাণ এবং তাপমাত্রার ওঠানামায় পরিবর্তন দেখা গেলে স্বাভাবিক ঋতুচক্রেও তার প্রভাব পড়ে। এবারের দিল্লির আবহাওয়া সেই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির একটি উদাহরণ।
অবশ্য একটি মাসের অস্বাভাবিক আবহাওয়াকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা যায় না। এর পেছনে নির্দিষ্ট আবহাওয়াগত কারণও থাকতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন পরিবর্তনের প্রবণতা বোঝা সম্ভব।
একদিকে ১৯৫১ সালের পর সর্বনিম্ন দিনের তাপমাত্রার রেকর্ড, অন্যদিকে চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বৃষ্টিভেজা অক্টোবর এবং ২০২২ সালের পর সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন বাতাস—সব মিলিয়ে দিল্লির জন্য এবারের অক্টোবর এক ব্যতিক্রমী মাস হয়ে উঠেছে।
যে সময়ে রাজধানীর মানুষ সাধারণত শীতের আগমনের অপেক্ষা করেন, সেই সময়েই তাঁদের অনেককে হঠাৎ করে শীতের পোশাক পরতে হচ্ছে। বৃষ্টি ও ঠান্ডা বাতাসের যুগল প্রভাবে বদলে গেছে পরিচিত অক্টোবরের আবহাওয়া।
তবে বৃষ্টিতে দূষণ কমে বাতাসের মান উন্নত হওয়ায় দিল্লিবাসী কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। কারণ, প্রতিবছর শীতের শুরুতে বায়ুদূষণ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়, এবার অন্তত অক্টোবরের শেষ দিকে তার প্রভাব কিছুটা কম দেখা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৬ সালের অক্টোবর দিল্লির আবহাওয়ার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকতে পারে। ৭৫ বছর পর এমন ঠান্ডা এবং দীর্ঘ চার বছরের মধ্যে এমন বৃষ্টির অভিজ্ঞতা রাজধানীর বাসিন্দাদের কাছে নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।



