এনবি সংবাদ ডেস্ক : চলতি বছরের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৬ সালের এই পরীক্ষায় সার্বিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অন্যদিকে, শুধু এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী। ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে পরবর্তী শিক্ষাজীবনের প্রস্তুতি।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ১১টার দিকে একযোগে দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইট, সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এসএমএসের মাধ্যমে ফলাফল প্রকাশ করা হয়। নির্ধারিত সময়ের পর থেকেই পরীক্ষার্থীরা নিজেদের ফলাফল জানতে অনলাইনে ভিড় করেন।
এবারের ফলাফলে পাসের হার গত বছরের তুলনায় কমেছে। ২০২৫ সালে ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এবার তা কমে হয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সামগ্রিক পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মোট ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ফলাফল জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। তবে আগের কয়েক বছরের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রথম দফায় এইচএসসি পরীক্ষায় ৬৯ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। পরে উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের পর আরও ৩ হাজার ৭৯ জন শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয় এবং তাঁরাও জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন পরীক্ষার্থী। সেই হিসাবে গত দুই বছরের ফলাফলে সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
জিপিএ-৫ এবং পাসের হারের এই পরিসংখ্যান শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক ফলাফল নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
শনিবার সকাল ১১টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল প্রকাশের কার্যক্রম শুরু হয়। শিক্ষা বোর্ডগুলোর নির্ধারিত ওয়েবসাইট এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ফলাফল জানার সুযোগ পান।
এর আগে ফল প্রকাশের জন্য ২৯ অক্টোবর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ৩১ অক্টোবর ফল প্রকাশের দিন ধার্য করা হয়।
আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অনলাইনে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের ফলাফল ডাউনলোড করে প্রকাশ করতে বলা হয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে রেজাল্ট কর্নার থেকে বোর্ড ও প্রতিষ্ঠানের ইআইআইএন (EIIN) নম্বর ব্যবহার করে ফলাফল সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা চাইলে অনলাইন ছাড়াও নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ফলাফল জানতে পারবেন।
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল জানতে পরীক্ষার্থীদের শিক্ষা বোর্ডের নির্ধারিত ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে। সেখানে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে ফলাফল দেখা ও ডাউনলোড করা যাবে।
সাধারণত ফলাফল দেখার জন্য পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার নাম, পরীক্ষার বছর, শিক্ষা বোর্ড, রোল নম্বর এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিতে হয়।
ফলাফল দেখার ক্ষেত্রে শিক্ষা বোর্ডের নির্ধারিত ওয়েবসাইট ব্যবহার করাই সবচেয়ে ভালো। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ওয়েবসাইটে প্রবেশ করায় কখনো কখনো সার্ভারে চাপ তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার চেষ্টা করতে হবে।
ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলেও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এসএমএস পাঠিয়ে পরীক্ষার ফলাফল জানা যাবে। এ জন্য যেকোনো মুঠোফোন নম্বর থেকে নির্ধারিত ফরম্যাটে বার্তা পাঠাতে হবে।
এসএমএসের মাধ্যমে ফলাফল জানতে প্রথমে মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে লিখতে হবে:
HSC DHA 123456 2026
এখানে DHA-এর জায়গায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের নামের সংক্ষিপ্ত রূপ এবং 123456-এর জায়গায় পরীক্ষার্থীর নিজের রোল নম্বর বসাতে হবে। এরপর বার্তাটি পাঠাতে হবে ১৬১৪০ নম্বরে।
উদাহরণ হিসেবে, ঢাকা বোর্ডের কোনো পরীক্ষার্থীর রোল নম্বর ১২৩৪৫৬ হলে তাঁকে নির্ধারিত ফরম্যাটে বার্তা পাঠাতে হবে। ফিরতি এসএমএসে পরীক্ষার ফলাফল জানিয়ে দেওয়া হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড কিংবা সংবাদপত্রের কার্যালয় থেকে ব্যক্তিগতভাবে ফলাফল সংগ্রহের ব্যবস্থা নেই। তাই পরীক্ষার্থীদের নির্ধারিত ওয়েবসাইট, এসএমএস এবং নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই ফলাফল জানতে হবে।
প্রকাশিত ফলাফলে কোনো ভুল বা অসংগতি রয়েছে বলে মনে হলে পরীক্ষার্থীরা উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
শিক্ষা বোর্ডের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন গ্রহণ করা হবে। এ সময়ের মধ্যে আগ্রহী পরীক্ষার্থীদের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে আবেদন সম্পন্ন করতে হবে।
পুনর্নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে উত্তরপত্রের নম্বর গণনায় কোনো ভুল হয়েছে কি না, নম্বর যোগ করতে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না কিংবা প্রাপ্ত নম্বর যথাযথভাবে ফলাফলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, সেসব বিষয় যাচাই করা হয়।
তবে উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ মানেই নতুন করে সম্পূর্ণ খাতা মূল্যায়ন করা নয়। মূলত নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী নম্বর গণনা ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার সঠিকতা যাচাই করা হয়।
আবেদনের নিয়ম, ফি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। তাই আবেদন করার আগে পরীক্ষার্থীদের নিজ নিজ বোর্ডের বিজ্ঞপ্তি ভালোভাবে দেখে নেওয়া প্রয়োজন।
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২ জুলাই। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে ১২ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছিলেন।
তবে নিবন্ধিত সব পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেননি। বিভিন্ন কারণে কিছুসংখ্যক পরীক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অনুপস্থিত ছিলেন।
এইচএসসি পরীক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। এই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় ভর্তির পরবর্তী প্রস্তুতি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে এই ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এবার শিক্ষার্থীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রস্তুতি। যারা ভালো ফলাফল করেছেন, তাঁরা পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি শুরু করবেন। অন্যদিকে, প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও হতাশ না হয়ে পরবর্তী সুযোগগুলো কাজে লাগানোর প্রয়োজন রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে শুধু জিপিএ-৫ অর্জন করাই শেষ কথা নয়। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি, বিষয় নির্বাচন এবং প্রতিষ্ঠানের ভর্তি যোগ্যতা পূরণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, যেসব শিক্ষার্থী ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্ট নন, তাঁদের জন্য পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ রয়েছে। ফলে চূড়ান্ত ভর্তি প্রস্তুতির আগে ফলাফলে কোনো পরিবর্তন আসে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের মধ্য দিয়ে দেশের লাখো শিক্ষার্থীর জীবনে নতুন একটি অধ্যায় শুরু হলো। এখন তাঁদের লক্ষ্য উচ্চশিক্ষার উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গঠনের পথে এগিয়ে যাওয়া।



