স্টাফ রিপোর্টার,এনবি সংবাদ : ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হারে ছেলেদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছেন মেয়েরা। তবে সর্বোচ্চ ফল জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রে ছাত্রদের সংখ্যা বেশি। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, এবার ছাত্রীদের পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। অন্যদিকে ছাত্রদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ছাত্রীদের মধ্যে উত্তীর্ণ হওয়ার হার বেশি হলেও জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছেন ছাত্ররা।
এ বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। সামগ্রিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। শনিবার (৩১ অক্টোবর) সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে ফলাফলের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়।
ফলাফলের পরিসংখ্যান বলছে, শুধু পাসের হার নয়, জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রেও ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। তবে দুই সূচকে এগিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের দল আলাদা। পাসের হারে মেয়েরা এগিয়ে থাকলেও সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জনে ছেলেরা সামান্য ব্যবধানে বেশি সংখ্যায় রয়েছেন।
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ছাত্রীদের পাসের হার ছাত্রদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, এবার মোট ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫২৮ জন ছাত্রী উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁদের পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ।
অন্যদিকে ছাত্রদের মধ্যে পাস করেছেন ২ লাখ ৯০ হাজার ১৫৭ জন। তাঁদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্ররা ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উত্তীর্ণ ছাত্রীদের সংখ্যা ছাত্রদের চেয়ে ৬৬ হাজার ৩৭১ জন বেশি। এ ব্যবধান থেকে বোঝা যায়, এবারের পরীক্ষায় পাসের সংখ্যার দিক থেকেও মেয়েরা এগিয়ে রয়েছেন।
তবে পাসের হার ও পাসের মোট সংখ্যা দুটি আলাদা বিষয়। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ছাত্র ও ছাত্রীর মোট সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে। তাই শুধু উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে দুই পক্ষের সাফল্যের পূর্ণ তুলনা করা যায় না। পাসের হার দিয়ে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর পরীক্ষার্থীদের মধ্যে কত শতাংশ উত্তীর্ণ হয়েছেন, তা বোঝা যায়।
পাসের হারে পিছিয়ে থাকলেও জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রে ছাত্ররা এগিয়ে রয়েছেন। চলতি বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ গ্রেড পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছাত্র ২০ হাজার ৩৬৩ জন এবং ছাত্রী ১৯ হাজার ৭২১ জন।
অর্থাৎ জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রের সংখ্যা ছাত্রীদের তুলনায় ৬৪২ জন বেশি। যদিও ব্যবধান খুব বেশি নয়, তবু সর্বোচ্চ ফল অর্জনের মোট সংখ্যায় এবার ছেলেরা এগিয়ে রয়েছেন।
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, পাসের হার এবং জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রে আলাদা চিত্র দেখা গেছে। ছাত্রীদের মধ্যে সামগ্রিকভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার হার বেশি। অন্যদিকে সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রদের সংখ্যা কিছুটা বেশি।
শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের কাছে এ ধরনের পরিসংখ্যান শিক্ষার্থীদের ফলাফল বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে। তবে শুধু লিঙ্গভিত্তিক সংখ্যার ওপর নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের মেধা বা শিক্ষার মান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। বিষয়ভিত্তিক ফল, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সামগ্রিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে এ হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ফলে এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট।
পাসের হারের এই পতন এবারের ফলাফলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক। গত বছরের তুলনায় এবার অর্ধেকের কিছু বেশি পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। অন্যদিকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।
তবে পাসের হার কমে যাওয়ার কারণ নির্ধারণ করতে হলে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ধরন, মূল্যায়ন পদ্ধতি, বিষয়ভিত্তিক ফলাফল এবং শিক্ষা বোর্ডগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। শুধু সামগ্রিক পাসের হার দেখে ফলাফলের পরিবর্তনের পেছনের কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
শুধু পাসের হার নয়, সর্বোচ্চ গ্রেড জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও গত বছরের তুলনায় কমেছে। ২০২৫ সালে মোট ৬৯ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। এবার সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জনে।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন। সংখ্যার হিসাবে এটি বড় ধরনের পরিবর্তন।
গত বছর যেখানে প্রায় ৬৯ হাজার শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জন করেছিলেন, সেখানে এবার সেই সংখ্যা ৪১ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। ফলে এবারের ফলাফলে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার ও মোট সংখ্যা—দুই ক্ষেত্রেই পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।
তবে জিপিএ-৫ কমে যাওয়ার কারণ জানতে হলে বিষয়ভিত্তিক ফলাফল ও বোর্ডভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ জরুরি। পরীক্ষার প্রশ্নের কাঠামো, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়াসহ একাধিক বিষয় ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলের বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়।
ফল প্রকাশের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়াসহ বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে পরীক্ষার সামগ্রিক ফলাফল, পাসের হার, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং ছাত্র-ছাত্রীদের ফলাফলের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়।
ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ফলাফল জানার আগ্রহ দেখা যায়। অনেকে অনলাইনে এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফল সংগ্রহ করেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রস্তুতি শুরু করার সময়ও এসেছে।
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২ জুলাই। লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা ছিল ৮ আগস্ট। এরপর ১৫ আগস্টের মধ্যে ব্যবহারিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার পরিকল্পনা ছিল।
তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কয়েকটি লিখিত পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে ওই বোর্ডের পরীক্ষাসূচিতে পরিবর্তন আনতে হয়। পরে স্থগিত পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের লিখিত পরীক্ষা শেষ হয় ৯ সেপ্টেম্বর।
এ কারণে এ বছরের পরীক্ষার কার্যক্রমে কিছুটা সময় বেশি লেগেছে। নির্ধারিত সময়ের বাইরে স্থগিত পরীক্ষা আয়োজনের পর ফলাফল প্রস্তুতের কাজ সম্পন্ন করে প্রকাশ করা হয়।
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে ছাত্র ও ছাত্রীদের সাফল্যের দুটি ভিন্ন দিক সামনে এসেছে। পাসের হারে মেয়েরা এগিয়ে থাকলেও জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যায় ছেলেরা সামান্য ব্যবধানে বেশি।
একই সঙ্গে গত বছরের তুলনায় সামগ্রিক পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা—দুটিই কমেছে। ফলে এবারের ফলাফল শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতার হিসাব নয়, দেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
যাঁরা উত্তীর্ণ হয়েছেন, তাঁদের সামনে এখন বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রস্তুতি। আর যাঁরা প্রত্যাশিত ফল পাননি, তাঁদের জন্য পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা জরুরি। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার, জিপিএ-৫ এবং ছাত্র-ছাত্রীদের সাফল্যের তুলনায় স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা গেছে।


