এনবি সংবাদ, অনলাইন : ডায়াবিটিস ও উচ্চ রক্তচাপ—দুটি অসুখই শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে এই দুই সমস্যা একসঙ্গে থাকলে কিডনির ক্ষতির ঝুঁকি বেড়ে যায়। অথচ কিডনির অসুখের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় তেমন কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে অজান্তেই কিডনির কার্যক্ষমতা কমতে থাকে।
এ কারণে ডায়াবিটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে শুধু রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখলেই চলবে না, কিডনির দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় ছোটখাটো কিছু পরিবর্তনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
দুই টুকরো রুটি, একবাটি ডাল, স্যালাড, সঙ্গে পাঁপড় ও আচার—সাধারণভাবে অনেকের কাছে এটি স্বাস্থ্যকর খাবার। কিন্তু ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য এই খাবারের প্রতিটি উপাদান সমান উপযোগী নয়। বিশেষ করে নুন, প্রোটিন ও শর্করার পরিমাণ বুঝে খাবার বেছে নেওয়া প্রয়োজন।
ডায়াবিটিস ও উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ক্ষতি করে কেন?
কিডনির অন্যতম প্রধান কাজ হলো রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল ছেঁকে বের করে দেওয়া। এই কাজের জন্য কিডনির মধ্যে অসংখ্য সূক্ষ্ম রক্তনালি রয়েছে।
দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে কিডনির ছোট রক্তনালিগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, উচ্চ রক্তচাপের কারণে এই রক্তনালির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ফলে ধীরে ধীরে কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ডায়াবিটিস ও উচ্চ রক্তচাপ একসঙ্গে থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, কিডনির ক্ষতি প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় বোঝাই যায় না। রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও শরীরের ভেতরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমতে পারে।
তাই উপসর্গ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে নিয়মিত পরীক্ষা করানো এবং খাদ্যাভ্যাসে সচেতন হওয়া জরুরি।
কিডনি ভালো রাখতে নুন খাওয়া কমাতে হবে
কিডনি সুস্থ রাখতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে খাবারে সোডিয়াম বা নুনের পরিমাণ কমানো গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের স্বাভাবিক কাজের জন্য সোডিয়াম প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত নুন রক্তচাপ বাড়িয়ে দিতে পারে।
রক্তচাপ বেড়ে গেলে কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলির ওপর চাপ পড়ে। দীর্ঘদিন এই চাপ বজায় থাকলে কিডনির ক্ষতি হতে পারে। তাই রান্নায় নুন কম দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবারে লুকিয়ে থাকা অতিরিক্ত সোডিয়ামের দিকেও নজর রাখতে হবে।
বিশেষ করে যেসব খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে, সেগুলির বিষয়ে সতর্ক হওয়া দরকার।
যেসব খাবার কমানো বা এড়িয়ে চলা উচিত:
১. পাঁপড়, বিশেষ করে অতিরিক্ত নুনযুক্ত পাঁপড়।
২. নোনতা আচার।
৩. নুন দেওয়া বাদাম ও অন্যান্য নোনতা স্ন্যাকস।
৪. অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার।
৫. বেশি সোডিয়ামযুক্ত প্যাকেটজাত খাবার।
অনেকেই বিকেলের চায়ের সঙ্গে পাঁপড় বা নুন দেওয়া বাদাম খান। আবার খাবারের সঙ্গে আচার খাওয়ার অভ্যাসও রয়েছে বহু পরিবারের। পরিমাণে কম মনে হলেও নিয়মিত এসব খাবার খেলে শরীরে সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
তাই কিডনির সমস্যা থাকলে শুধু রান্নার নুন কমালেই হবে না, খাবারের অন্যান্য উৎস থেকেও অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ কমাতে হবে।
কিডনির সমস্যা থাকলে কি প্রোটিন কম খেতে হবে?
কিডনি ভালো রাখতে প্রোটিন খাওয়া নিয়ে অনেকের মধ্যেই বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ মনে করেন বেশি প্রোটিন খেলে কিডনির ক্ষতি হয়, আবার কেউ শরীর সুস্থ রাখতে বেশি প্রোটিন খাওয়ার পরামর্শ দেন।
পুষ্টিবিদ অপেক্ষা একবটের মতে, প্রত্যেকের প্রোটিনের প্রয়োজন এক নয়। কিডনির বর্তমান অবস্থা, শরীরের ওজন, শারীরিক পরিশ্রম এবং ব্যক্তিগত পুষ্টির চাহিদার ওপর নির্ভর করে কতটা প্রোটিন খাওয়া উচিত।
কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে অনেক ক্ষেত্রে প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তবে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। কিডনির অবস্থা না জেনে নিজে থেকে প্রোটিন কমিয়ে দেওয়া বা অতিরিক্ত প্রোটিন খাওয়া—দুটিই সমস্যার কারণ হতে পারে।
ডাল, মাছ ও মাংস প্রোটিনের পরিচিত উৎস। কিন্তু কোন খাবার কতটা পরিমাণে খাওয়া যাবে, তা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা উচিত।
ভাত, রুটি ও ডাল কতটা খাবেন?
বাংলাদেশ ও ভারতের বহু পরিবারের প্রতিদিনের খাবারে ভাত, রুটি ও ডাল গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির সমস্যা থাকলেও এসব খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
ভাত ও রুটিতে শর্করা থাকে। তাই ডায়াবিটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা এবং ব্যক্তিগত খাদ্যচাহিদা অনুযায়ী এগুলির পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে।
পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী, ভাত ও রুটি পরিমিত রেখে খাদ্যতালিকায় বেশি পরিমাণে স্যালাড ও উপযুক্ত সব্জি রাখা যেতে পারে। তবে কিডনির রোগীদের ক্ষেত্রে সব ধরনের সব্জি বা ফল একইভাবে উপযোগী নয়। কিডনির কার্যক্ষমতা এবং রক্তে পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন উপাদানের মাত্রা বিবেচনা করে খাবার নির্বাচন করা প্রয়োজন।
ডাল, মাছ ও মাংস থেকে প্রোটিন পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলির পরিমাণও ব্যক্তির ওজন, শারীরিক প্রয়োজন এবং কিডনির অবস্থার ওপর নির্ভর করবে।
অর্থাৎ, ডায়াবিটিস ও কিডনির সমস্যা থাকলে সবার জন্য একই খাদ্যতালিকা তৈরি করা যায় না।
কিডনির সমস্যা বোঝার জন্য কোন পরীক্ষা জরুরি?
কিডনির অসুখের একটি বড় সমস্যা হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনও স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। তাই ডায়াবিটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের নিয়মিত কিডনির কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একটি প্রতিবেদনে কিডনির স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বছরে দুবার কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করার পরামর্শের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কিডনির অবস্থা বোঝার জন্য কয়েকটি পরীক্ষার কথা বিশেষভাবে বলা হয়।
১. সিরাম ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা
রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা দেখে কিডনির কার্যক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে রক্তে ক্রিয়েটিনিনের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। তবে বয়স ও অন্যান্য শারীরিক কারণেও এই মাত্রায় পরিবর্তন হতে পারে। তাই শুধু ক্রিয়েটিনিনের ফল দেখে কিডনির অবস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
২. ইজিএফআর পরীক্ষা
ইজিএফআর বা এস্টিমেটেড গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন রেটের মাধ্যমে কিডনি প্রতি মিনিটে কতটা রক্ত পরিশোধন করতে পারছে, তার আনুমানিক হিসাব পাওয়া যায়। কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়নে এই পরীক্ষাটি গুরুত্বপূর্ণ।
৩. নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ
শুধু পরীক্ষার রিপোর্ট করালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। রিপোর্টের ফলাফল চিকিৎসকের মাধ্যমে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। বয়স, ডায়াবিটিসের সময়কাল, রক্তচাপ, অন্যান্য অসুখ এবং ওষুধের ব্যবহার বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে হয়।
কিডনি সুস্থ রাখতে দৈনন্দিন জীবনে কী করবেন?
ডায়াবিটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কিডনির যত্ন নেওয়ার জন্য খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি জীবনযাপনেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
প্রথমত, রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ নিয়মিত পরীক্ষা করে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেতে হবে এবং নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান এড়িয়ে চলা জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার অভ্যাসও কিডনির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তৃতীয়ত, খাবারে অতিরিক্ত নুন ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমাতে হবে। প্রোটিন, ভাত, রুটি, ডাল, মাছ ও মাংসের পরিমাণ ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে ঠিক করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কিডনির অসুখের লক্ষণ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করা যাবে না। ডায়াবিটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা তৈরি করাই দীর্ঘমেয়াদে কিডনি সুস্থ রাখার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।


