সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশযে জমিতে চাষ হতো না, সেখানেই ফুটল জাফরান! লাদাখে কৃষির নতুন বিপ্লব

যে জমিতে চাষ হতো না, সেখানেই ফুটল জাফরান! লাদাখে কৃষির নতুন বিপ্লব

অনুর্বর জমিতে জাফরান ফুল ফোটার এই ঘটনা নিঃসন্দেহে লাদাখের কৃষিক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক। তবে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ফুল ফোটা এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক উৎপাদন নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। দীর্ঘমেয়াদে ফলনের ধারাবাহিকতা, পানির প্রাপ্যতা, উৎপাদন খরচ এবং বাজারজাতকরণের বিষয়গুলোও যাচাই করতে হবে।

পাথুরে পাহাড়, শুষ্ক আবহাওয়া আর পানির তীব্র সংকট—লাদাখের ভূপ্রকৃতি কৃষিকাজের জন্য বরাবরই বড় চ্যালেঞ্জ। বছরের অধিকাংশ সময় বৃষ্টির দেখা মেলে না। ফলে বিস্তীর্ণ জমি পড়ে থাকে অনাবাদি অবস্থায়। কিন্তু সেই প্রতিকূল পরিবেশেই এবার নতুন আশার আলো দেখাল জাফরান চাষ। জমিতে কন্দ রোপণের মাত্র এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ফুটেছে মূল্যবান এই মসলার ফুল। প্রশাসনের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক আগে পাওয়া গেছে এই সাফল্য।

ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখের লেহ জেলার স্পিতুক এলাকার একটি পুনরুদ্ধার করা অনুর্বর জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে জাফরান চাষ শুরু হয়েছিল। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চার দিনে প্রায় ২২ গ্রাম জাফরান সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, একটি নির্দিষ্ট দিনে ৭২টি ফুল ফুটে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। এই সাফল্য লাদাখের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

লাদাখ প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ১ অক্টোবর লেহর স্পিতুক ফারকা এলাকায় প্রায় ৪ হাজার বর্গমিটার জমিতে জাফরান চাষের কাজ শুরু হয়। সেখানে ইরান থেকে আনা উন্নত মানের প্রায় ৯০ হাজার জাফরান কন্দ রোপণ করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে কন্দগুলোর ওজন ছিল প্রায় ৮০০ কেজি।

প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা ছিল, রোপণের পর জাফরান ফুল ফুটতে প্রায় দুই মাস সময় লাগতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তার অনেক আগেই ফুল ফুটতে শুরু করে। এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই জমিতে জাফরানের বেগুনি ফুলের দেখা মেলে।

প্রথম দিকে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫টি ফুল ফুটছিল। তবে রবিবার সকালে একসঙ্গে ৭২টি ফুল ফোটে। পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরুর পর এক দিনে এটিই ছিল সর্বোচ্চ ফুল ফোটার ঘটনা।

কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চার দিনের মধ্যে প্রায় ২২ গ্রাম জাফরান সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষার প্রাথমিক ফলাফল প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হওয়ায় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি হয়েছে।

জাফরান বিশ্বের অন্যতম দামি মসলা। সাধারণত নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, মাটির ধরন এবং আবহাওয়ার প্রয়োজন হয় এই ফসল উৎপাদনে। ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের পাম্পোর অঞ্চল জাফরান চাষের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। কিন্তু লাদাখের শুষ্ক ও প্রতিকূল পরিবেশে একই ফসল উৎপাদনের চেষ্টা ছিল যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং।

লাদাখের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য কাশ্মীরের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অত্যন্ত কম। পাহাড়ি ও পাথুরে জমির কারণে চাষাবাদের উপযোগী মাটি তৈরি করাও কঠিন। তবু সঠিক পরিকল্পনা, উন্নতমানের বীজ বা কন্দ এবং পানির যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই অঞ্চলেও উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন সম্ভব কি না, তা পরীক্ষা করছে প্রশাসন।

লাদাখের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ভিকে সাক্সেনা সম্প্রতি পরীক্ষামূলক জাফরান ক্ষেত পরিদর্শন করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে ফুল ফোটার ঘটনাকে তিনি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।

তাঁর মতে, উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে কৃষির যে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, এই প্রকল্প তার একটি উদাহরণ। বাণিজ্যিকভাবে জাফরান উৎপাদন সম্ভব হলে স্থানীয় কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

লাদাখে জাফরান চাষের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে আরও বড় একটি পরিকল্পনা। শুধু একটি দামি মসলার উৎপাদন নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে অনাবাদি অবস্থায় পড়ে থাকা জমিকে আবার কৃষিকাজের উপযোগী করে তোলাই এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।

‘প্রকল্প হিম সরোবর’-এর আওতায় স্পিতুক এলাকার জমি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার মূল বিষয় হলো বরফ গলে পাওয়া পানির যথাযথ সংরক্ষণ এবং কৃষিকাজে তার ব্যবহার নিশ্চিত করা।

গত মে মাসে লাদাখ প্রশাসন স্পিতুকের কাছে প্রায় ৮০০ একর অনুর্বর জমি পুনরুদ্ধারের জন্য চিহ্নিত করে। ওই এলাকার কৃষিকাজে পানির সরবরাহ বাড়াতে পুনরুজ্জীবিত ইগু-ফে সেচ খালের অতিরিক্ত পানি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।

এর ফলে জমির মাটিতে আর্দ্রতা বাড়বে এবং ধীরে ধীরে চাষাবাদের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।

এই উদ্যোগের গুরুত্ব লাদাখের জলবায়ু বিবেচনা করলেই বোঝা যায়। কারণ, এখানে কৃষিকাজের জন্য পর্যাপ্ত বৃষ্টির ওপর নির্ভর করা সম্ভব নয়। বরং হিমবাহের বরফ গলে যে পানি পাওয়া যায়, সেটিই স্থানীয় কৃষির অন্যতম প্রধান ভরসা।

লাদাখ ভারতের অন্যতম শুষ্ক অঞ্চল। এখানে বছরে ১০০ মিলিমিটারেরও কম বৃষ্টিপাত হয়। ফলে স্বাভাবিক বৃষ্টিনির্ভর কৃষিকাজ প্রায় অসম্ভব।

অঞ্চলটির কৃষকরা মূলত হিমবাহের বরফ গলে পাওয়া পানির ওপর নির্ভর করেন। বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে বরফ গলার পানি সেচের কাজে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু পানির সঠিক সংরক্ষণ ও বণ্টন নিশ্চিত করা না গেলে অনেক জমি চাষের বাইরে থেকে যায়।

জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতির এই সীমাবদ্ধতার কারণে লাদাখে কৃষির সম্প্রসারণ দীর্ঘদিন ধরেই কঠিন কাজ। তাই সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অনুর্বর জমি পুনরুদ্ধারকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন।

জাফরান চাষের পরীক্ষামূলক সাফল্য প্রমাণ করতে পারে, পরিকল্পিত পানিব্যবস্থা ও উপযুক্ত কৃষিপদ্ধতি ব্যবহার করে প্রতিকূল পরিবেশেও উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।

ভারতে জাফরান উৎপাদনের কথা উঠলেই প্রথমে জম্মু ও কাশ্মীরের নাম আসে। বিশেষ করে পাম্পোর অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে এই মসলার জন্য বিখ্যাত। এখানকার আবহাওয়া ও মাটির বৈশিষ্ট্য জাফরান চাষের জন্য উপযোগী।

লাদাখ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মোট জাফরান উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে। ফলে দেশের জাফরান উৎপাদনে এই অঞ্চলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে নতুন পরীক্ষামূলক প্রকল্প সফল হলে জাফরান উৎপাদনের ভৌগোলিক পরিধি আরও বাড়তে পারে। কাশ্মীরের বাইরে লাদাখও ভবিষ্যতে ভারতের জাফরান উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

এর ফলে উৎপাদনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও উপকৃত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব কৃষক বর্তমানে সীমিত জমিতে প্রচলিত ফসল উৎপাদন করেন, তাঁদের জন্য বিকল্প উচ্চমূল্যের ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হবে।

জাফরানকে বিশ্বের সবচেয়ে দামি মসলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রান্নায় রং, সুগন্ধ ও স্বাদ বাড়াতে এই মসলা ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন খাদ্যপণ্য, প্রসাধনী এবং ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা উপকরণ তৈরিতেও এর ব্যবহার রয়েছে।

জাফরানের দাম বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো এর উৎপাদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত শ্রমসাধ্য।

জাফরান ফুলের ভেতরে থাকে মাত্র তিনটি লাল গর্ভমুণ্ড বা স্টিগমা। এই অংশগুলোই সংগ্রহ করে শুকিয়ে তৈরি করা হয় আসল জাফরান। প্রতিটি ফুল থেকে পাওয়া যায় খুব সামান্য পরিমাণ মসলা। তাই পর্যাপ্ত জাফরান উৎপাদনের জন্য বিপুলসংখ্যক ফুল সংগ্রহ করতে হয়।

ফুল থেকে গর্ভমুণ্ড আলাদা করা, শুকানো এবং সংরক্ষণের কাজও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। এসব কারণে বাজারে খাঁটি জাফরানের দাম অনেক বেশি।

লাদাখে এই চাষ বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে স্থানীয় কৃষকরা তুলনামূলক কম জমিতে উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনের সুযোগ পেতে পারেন।

লাদাখে জাফরান উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের মার্চে প্রশাসন জানিয়েছিল, বৈজ্ঞানিক ও শিল্প গবেষণা কাউন্সিলের (CSIR) অধীন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে প্রায় দুই বছর ধরে পরীক্ষা চালাচ্ছেন।

সেই সময় লেহ ও কারগিলের বিভিন্ন এলাকায় জাফরান চাষের উপযোগী জমি খুঁজে দেখছিলেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তারা। মাটির বৈশিষ্ট্য, তাপমাত্রা এবং পরিবেশগত পরিস্থিতি বিবেচনা করে উপযুক্ত জায়গা চিহ্নিত করার কাজ চলছিল।

জাফরানের পাশাপাশি লাদাখে আরও কয়েকটি উচ্চমূল্যের ফুল চাষের পরীক্ষাও চালানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লিলিয়াম ও গ্ল্যাডিওলাস। কৃষক, স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করাই এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

অনুর্বর জমিতে জাফরান ফুল ফোটার এই ঘটনা নিঃসন্দেহে লাদাখের কৃষিক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক। তবে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ফুল ফোটা এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক উৎপাদন নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। দীর্ঘমেয়াদে ফলনের ধারাবাহিকতা, পানির প্রাপ্যতা, উৎপাদন খরচ এবং বাজারজাতকরণের বিষয়গুলোও যাচাই করতে হবে।

তবু মাত্র এক মাসেরও কম সময়ে ফুল ফোটা এবং কয়েক দিনের মধ্যে জাফরান সংগ্রহের ঘটনা প্রশাসনের পরিকল্পনায় নতুন উৎসাহ জুগিয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই উদ্যোগ সফল হলে লাদাখের অনুর্বর জমি আর কৃষির বাধা হয়ে থাকবে না। বরং আধুনিক প্রযুক্তি, বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ এবং পরিকল্পিত পানিব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শুষ্ক পাহাড়ি অঞ্চলটিও উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের উৎপাদনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ