যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বড় ধরনের পরাজয়ের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সেই প্রভাব থেকে বাদ যায়নি ভারতের শেয়ারবাজারও। বুধবারের পর বৃহস্পতিবারও চাঙ্গা ছিল দালাল স্ট্রিট। দিনের শুরুতেই বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের (বিএসই) সেনসেক্স সূচক এক ধাক্কায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ পয়েন্ট বেড়ে যায়। পাশাপাশি ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (এনএসই) নিফটি সূচকেও উল্লেখযোগ্য উত্থান দেখা যায়।
শুধু শেয়ারবাজার নয়, মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মূল্যও বেড়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ ডলারে নেমে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, ট্রাম্পের নির্বাচনী পরাজয়ের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের খবর সামনে আসতেই আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বুধবার মার্কিন নির্বাচনের ফল প্রকাশের সময় থেকেই ভারতের শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হয়েছিল। বৃহস্পতিবার বাজার খোলার পর সেই গতি আরও বাড়ে।
বুধবার লেনদেন শেষে সেনসেক্সের অবস্থান ছিল ৭৭ হাজার ৩০১.৪০ পয়েন্টে। আগের দিনের তুলনায় সূচকটি বেড়েছিল ৩৮৩.৫৫ পয়েন্ট। ফলে বৃহস্পতিবারও বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা বজায় থাকবে বলে আশা করেছিলেন বিশ্লেষকরা।
তবে বৃহস্পতিবার বাজার খোলার পর প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যায় সেনসেক্সের উত্থান। দিনের শুরুতেই সূচকটি প্রায় ১ হাজার ৩০০ পয়েন্ট বেড়ে যায়। পরে লেনদেনের সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্থানের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। একপর্যায়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ পয়েন্টের কাছাকাছি বেড়ে সেনসেক্স ৭৮ হাজারের ঘরে প্রবেশ করে।
বাজারের এই ঊর্ধ্বগতিতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। বিভিন্ন খাতের শেয়ারে কেনার প্রবণতা দেখা যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠে ভারতীয় শেয়ারবাজার।
বৃহস্পতিবার শুধু সেনসেক্স নয়, নিফটি সূচকেও উল্লেখযোগ্য উত্থান হয়েছে। প্রায় ৩০০ পয়েন্ট বেড়েছে এই সূচক। ফলে ভারতের প্রধান দুই শেয়ারবাজার সূচকেই ইতিবাচক প্রবণতা বজায় থাকে।
লেনদেনের শুরু থেকেই বিভিন্ন সংস্থার শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে দেখা যায়। প্রায় সব খাতের শেয়ারেই কমবেশি লাভের প্রবণতা ছিল। বিশেষ করে বিমান পরিবহন সংস্থা ইন্ডিগোর শেয়ারে সবচেয়ে বেশি উত্থান লক্ষ্য করা যায়।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা কিছুটা কমার প্রত্যাশা এবং মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল বিনিয়োগকারীদের মনোভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। এর প্রভাবেই ভারতীয় বাজারে কেনাকাটার প্রবণতা বেড়েছে।
শেয়ারবাজারের পাশাপাশি মুদ্রাবাজারেও স্বস্তির খবর এসেছে। বৃহস্পতিবার মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মূল্য বেড়েছে। বুধবারের তুলনায় ২৯ পয়সা শক্তিশালী হয়ে ডলারের বিপরীতে রুপির বিনিময়মূল্য দাঁড়িয়েছে ৯৪.৩৬।
আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হলে তার প্রভাব বিভিন্ন দেশের মুদ্রাবাজারেও পড়তে পারে। বিশেষ করে মার্কিন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ডলারের ওঠানামায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ট্রাম্পের নির্বাচনী পরাজয়ের পর বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশায় পরিবর্তন আসায় মুদ্রাবাজারেও তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
ভারতের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ক্ষেত্রে রুপির মূল্যবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ডলারের বিপরীতে রুপি শক্তিশালী হলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য ও জ্বালানি আমদানির খরচ তুলনামূলক কমতে পারে।
গত কয়েক মাস ধরে ইরানকে কেন্দ্র করে চলা যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
তবে বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা যায়। ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম কমে প্রায় ৯৪ ডলারে নেমে আসে।
বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমতে পারে। তাতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও কমবে।
এই প্রত্যাশার কারণেই তেলের বাজারে আপাতত স্বস্তির প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমা ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে ভারতের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে পরিবহন খরচ, উৎপাদন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, তেলের দাম কমলে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। এতে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানও পরোক্ষভাবে উপকৃত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে কম থাকলে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, রুপির স্থিতিশীলতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এই স্বস্তি কতদিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে ইরান যুদ্ধের পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহের ওপর।
ট্রাম্পের নির্বাচনী পরাজয়ের পর শুধু ভারতের বাজারেই নয়, মার্কিন শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। গত তিন মাসের মধ্যে বুধবার মার্কিন শেয়ারবাজারে উল্লেখযোগ্য উত্থান রেকর্ড করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বাজারে যে উদ্বেগ ছিল, নির্বাচনের ফলাফলে তার কিছুটা পরিবর্তন এসেছে।
তবে সামগ্রিক মার্কিন শেয়ারবাজারে উত্থান হলেও ট্রাম্পের নিজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের পরিস্থিতি ভালো নয়। অর্থাৎ নির্বাচনের ফলাফলে সামগ্রিক বাজার লাভবান হলেও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার শেয়ারে একই ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব সব সংস্থা ও শিল্পখাতে সমানভাবে পড়ে না। বিনিয়োগকারীরা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ ব্যবসা, আয় এবং ঝুঁকি বিবেচনা করেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।
শেয়ারবাজার ও জ্বালানি তেলের দামের পাশাপাশি সোনার বাজারেও কিছুটা স্বস্তির খবর পাওয়া গেছে। মধ্যবিত্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই মূল্যবান ধাতুর দাম কিছুটা কমেছে।
সামনেই ধনতেরাস। ভারতীয়দের কাছে এই উৎসবের সময়ে সোনা ও রুপা কেনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ফলে উৎসবের আগে সোনার দাম কমার খবর ক্রেতাদের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের মূল্য, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের চাহিদার ওপর সোনার দাম অনেকটাই নির্ভর করে। তাই মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলের পর বিশ্ববাজারে তৈরি হওয়া নতুন পরিস্থিতি সোনার বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ধনতেরাসের আগে শেয়ারবাজারের উত্থান, রুপির মূল্যবৃদ্ধি, তেলের দাম কমা এবং সোনার বাজারে কিছুটা স্বস্তি—সবকিছু মিলিয়ে ভারতের অর্থনৈতিক বাজারে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। বিশেষ করে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ বিরোধীদের হাতে চলে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি মেয়াদে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি নীতি, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগের পরিবেশে পড়তে পারে। তবে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই বাজারে যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকবে কি না, সেটি এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
বিনিয়োগকারীরা আপাতত যুদ্ধ পরিস্থিতির পরিবর্তন, তেলের সরবরাহ এবং মার্কিন অর্থনৈতিক নীতির ভবিষ্যৎ গতিপথের দিকে নজর রাখছেন।



