কেরিয়ারের ৪৯তম ট্রফি জিতলেন লিওনেল মেসি। গোল করলেন, গোল করালেন, দলকে চ্যাম্পিয়ন করলেন—সব মিলিয়ে আরও একবার নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিলেন আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ী তারকা। তবে দুর্দান্ত এই রাতের শেষটা পুরোপুরি শান্ত ছিল না। ম্যাচ শেষে মেজাজ হারিয়ে মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) প্রধান কর্তা ডন গার্বারের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়িয়ে পড়েন মেসি।
ইন্টার মায়ামির হয়ে মেসির রাতটি ছিল একাধিক কারণে বিশেষ। একদিকে দলকে ক্রুজ আজুলের বিরুদ্ধে ২-০ গোলে জিতিয়ে ট্রফি এনে দিয়েছেন, অন্যদিকে মায়ামির জার্সিতে নিজের ১০০তম গোলের মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন তিনি। এই ম্যাচের পর তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯২৯-এ।
ক্রুজ আজুলের বিরুদ্ধে মেসির গোল
সাম্প্রতিক সময়ে মেজর লিগ সকারে খুব একটা ভালো সময় কাটছিল না ইন্টার মায়ামির। টানা তিন ম্যাচে জয় পায়নি দলটি। সেই চাপ কাটিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স কাপে নিজেদের শক্তির পরিচয় দিল মায়ামি।
আমেরিকা ও মেক্সিকোর সেরা ক্লাবগুলোর লড়াইয়ে ক্রুজ আজুলের মুখোমুখি হয়েছিল মেসির দল। ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে ইন্টার মায়ামি।
২৪ মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। লুইস সুয়ারেজের ক্রস থেকে পাওয়া বল হেডে জালে জড়িয়ে দেন মেসি। সেই গোলেই এগিয়ে যায় মায়ামি।
দ্বিতীয়ার্ধেও মেসির প্রভাব ছিল স্পষ্ট। এবার নিজে গোল না করলেও তাঁর নেওয়া কর্নার থেকেই গোল পেয়ে যায় ইন্টার মায়ামি। মেসির কর্নার থেকে পাওয়া বল কাজে লাগিয়ে ব্যবধান ২-০ করেন কাসেমিরো।
শেষ পর্যন্ত এই ব্যবধান আর কমেনি। ২-০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ইন্টার মায়ামি এবং ট্রফি ওঠে মেসির হাতে।
মায়ামির জার্সিতে মেসির শততম গোল
ক্রুজ আজুলের বিরুদ্ধে করা গোলটি মেসির জন্য আরও একটি বিশেষ মাইলফলক তৈরি করেছে। ইন্টার মায়ামির জার্সিতে এটি তাঁর ১০০তম গোল।
আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর প্রথম গোলটিও এসেছিল ক্রুজ আজুলের বিপক্ষেই। অর্থাৎ মায়ামির হয়ে মেসির গোলযাত্রার শুরু এবং ১০০তম গোল—দুটিই একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে।
ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই ক্লাবটির ইতিহাস বদলাতে শুরু করেছে। মেসির আগমনের পর একের পর এক ট্রফি এসেছে মায়ামির ঘরে। মাত্র তিন বছরের মধ্যে ক্লাবটির ট্রফি ক্যাবিনেটে উঠেছে চতুর্থ শিরোপা।
কেরিয়ারে ৪৯তম ট্রফি মেসির
এই শিরোপা জয়ের মাধ্যমে মেসির ব্যক্তিগত ট্রফির সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯-এ। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে একের পর এক সাফল্য পেয়েছেন আর্জেন্টিনার তারকা।
বার্সেলোনার হয়ে অসংখ্য শিরোপা জয়ের পর প্যারিস সাঁ জার্মাঁ এবং ইন্টার মায়ামিতেও ট্রফি জিতেছেন মেসি। আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়েও কোপা আমেরিকা এবং বিশ্বকাপসহ গুরুত্বপূর্ণ শিরোপা রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।
ফলে মেসির ক্যারিয়ারের প্রতিটি অধ্যায়েই ট্রফি জয়ের গল্প রয়েছে। বয়স বাড়লেও মাঠে তাঁর প্রভাব যে কমেনি, ক্রুজ আজুলের বিরুদ্ধে ম্যাচটিও তারই আরেকটি উদাহরণ।
মাঠের পারফরম্যান্সের পর বিতর্কে মেসি
তবে ট্রফি হাতে নিয়ে উদযাপনের রাতেও বিতর্ক এড়াতে পারেননি মেসি। ম্যাচ শেষে ট্রফি নিয়ে বের হওয়ার সময় এমএলএসের প্রধান কর্তা ডন গার্বারের সঙ্গে তাঁকে উত্তপ্ত কথোপকথনে জড়াতে দেখা যায়।
মেসিকে গার্বারের দিকে আঙুল তুলে কথা বলতে দেখা যায়। একবার নয়, একাধিকবার তাঁর দিকে ইঙ্গিত করে কথা বলেন আর্জেন্টাইন তারকা।
ঠিক কী কারণে মেসি গার্বারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, কিংবা তাঁদের মধ্যে কী নিয়ে কথা হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। ম্যাচ শেষে এই ঘটনা নিয়ে ফুটবল মহলে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা শুরু হয়েছে।
মেসি সাধারণত মাঠের বাইরের বিতর্ক এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ম্যাচ ও ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁকে কিছুটা উত্তেজিত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। ফলে ডন গার্বারের সঙ্গে তাঁর এই কথোপকথনও আলাদা করে নজর কেড়েছে।
রেফারিং নিয়েও ক্ষোভ মেসির
শুধু ম্যাচ শেষের ঘটনা নয়, খেলা চলাকালীনও রেফারিং নিয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন মেসি।
ম্যাচের মধ্যে রেফারির সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “জঘন্য রেফারিং, জঘন্য। লজ্জা হওয়া দরকার।”
মেসির মতো তারকার এমন মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে রেফারিং নিয়ে তাঁর ঠিক কোন সিদ্ধান্তে এতটা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, তা বিস্তারিতভাবে পরিষ্কার নয়।
মেসির রাত, মায়ামির নতুন অধ্যায়
সব বিতর্ক সরিয়ে রাখলে ক্রুজ আজুলের বিরুদ্ধে জয়টি ইন্টার মায়ামির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মেজর লিগ সকারে সাম্প্রতিক খারাপ ফলের পর এই জয় দলকে আত্মবিশ্বাস ফেরাতে সাহায্য করতে পারে।
আর মেসির জন্য রাতটি ছিল রেকর্ড, গোল এবং ট্রফিতে ভরা। মায়ামির জার্সিতে ১০০ গোল পূর্ণ হয়েছে, দল পেয়েছে শিরোপা এবং তাঁর ব্যক্তিগত ট্রফির সংখ্যা পৌঁছেছে ৪৯-এ।
৩৯ বছর বয়সেও মেসির পারফরম্যান্স যে এখনও ম্যাচের ফল বদলে দিতে পারে, সেটিই আবার সামনে এল। তবে সেই দুর্দান্ত রাতের শেষ মুহূর্তে ডন গার্বারের সঙ্গে তাঁর উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মাঠে মেসির পা থেকে গোল, সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি এবং শেষে ট্রফি—সবই ছিল। শুধু শেষ দৃশ্যটিই ছিল কিছুটা অন্যরকম। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দের রাতেই তাই মেসিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।



