এনবি সংবাদ, বিনোদন ডেস্ক : পুরুলিয়ার মেয়ে অনুপর্ণা রায়ের সাফল্যের মুকুটে যোগ হল আরও একটি আন্তর্জাতিক পালক। ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পরপর দু’বার পুরস্কৃত হয়ে ইতিহাস গড়লেন এই বাঙালি পরিচালক। তাঁর নতুন ছবি ‘লাভার্স ইন দ্য ব্লু নাইট’ এবারের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে জিতেছে নেটপ্যাক অ্যাওয়ার্ড। এশিয়ার সেরা ছবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে অনুপর্ণার এই সিনেমা।
এর আগে গত বছর ৮২তম ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর ‘সংস অফ ফরগটেন ট্রিজ’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালকের সম্মান পেয়েছিলেন তিনি। ফলে পরপর দু’বছর বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে স্বীকৃতি পাওয়ার নজির তৈরি করলেন পুরুলিয়ার এই পরিচালক।
ভেনিস থেকেই সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অনুপর্ণা জানিয়েছেন, গোটা বিষয়টাই তাঁর কাছে যেন স্বপ্নের ঘোরের মতো লাগছে।
পরপর দু’বার সাফল্য, স্বপ্ন দেখেছিলেন অনুপর্ণা
ভেনিসে পরপর দু’বার পুরস্কার পাবেন—এমনটা অবশ্য ভাবেননি অনুপর্ণা। তবে স্বপ্ন দেখেছিলেন আরও একবার এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের কাজ তুলে ধরার।
অনুপর্ণার কথায়, পরপর দু’বার সাফল্য পাওয়ার কথা তিনি ভাবেননি। তবে মনে মনে আশা ছিল, যদি আরও একবার ভেনিসে ভালো কিছু করা যায়। সেই চেষ্টা এবার পূর্ণতা পেয়েছে।
তাঁর কাছে এই পুরস্কার শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং আরও ভালো কাজ করার দায়িত্বও তৈরি করেছে। কারণ অনুপর্ণা মনে করেন, পুরস্কার পাওয়াই সব নয়। একজন শিল্পীর কাছে শেখার প্রক্রিয়াটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
‘লাভার্স ইন দ্য ব্লু নাইট’-এর গল্প কী?
অনুপর্ণার পুরস্কারজয়ী ‘লাভার্স ইন দ্য ব্লু নাইট’ ছবির গল্প মুম্বই শহরে জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা মানুষের জীবনসংগ্রামকে ঘিরে তৈরি।
বড় শহরে নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা, সম্পর্ক, স্বপ্ন এবং বাস্তবতার টানাপোড়েন—এই বিষয়গুলিই ছবির কেন্দ্রে রয়েছে। নেটপ্যাক অ্যাওয়ার্ডের মতো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ায় ছবিটি আরও বড় পরিসরে আলোচনায় এসেছে।
এর আগে ‘সংস অফ ফরগটেন ট্রিজ’-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দর্শকের নজরে এসেছিলেন অনুপর্ণা। এবার নতুন ছবির সাফল্য তাঁর পরিচিতিকে আরও শক্তিশালী করল।
তৃতীয় ছবির প্রস্তুতি শুরু করবেন
ভেনিসের সাফল্যের পর দেশে ফিরে বসে থাকার পরিকল্পনা নেই অনুপর্ণার। বরং নতুন সিনেমার কাজে আরও গভীরভাবে ডুব দিতে চান তিনি।
তৃতীয় সিনেমার কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। নিজের ক্রাফ্ট নিয়ে আরও কাজ করতে চান। একই সঙ্গে যাঁদের কাছ থেকে তিনি শিখেছেন, সেই মেন্টরদের সঙ্গেও দেখা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নিজের কাজের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি ভালো বই পড়ার দিকেও মন দিতে চান অনুপর্ণা। বিশেষ করে ফিকশন ও নন-ফিকশন—দুই ধরনের বই পড়ে নতুন ছবির গবেষণা শুরু করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বাবার শিক্ষা এখনও পথ দেখায়
অনুপর্ণার সাফল্যের পেছনে তাঁর পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাবার একটি কথা এখনও তাঁকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দেয়।
বাবা তাঁকে শিখিয়েছেন, জীবনে কোনও দিন জিততে না পারলেও হতাশ হওয়া উচিত নয়। বরং সেখান থেকে কিছু শিখে ফিরে আসতে হবে।
এই দর্শনই নিজের জীবনে ধরে রাখতে চান অনুপর্ণা। তাঁর কাছে পুরস্কার মানেই সাফল্য নয়। আবার সাফল্য মানেই পুরস্কার পাওয়া—এমনটাও নয়। একজন পরিচালক হিসেবে ক্রমাগত শেখা এবং নিজের কাজকে আরও উন্নত করাই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অনুপর্ণার এই ভাবনা তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাতেও স্পষ্ট। তিনি নিজেকে এখনও সিনেমার একজন শিক্ষার্থী হিসেবেই দেখতে চান।
পুরুলিয়ার জীবন থেকেই আসছে পরের গল্প
পরবর্তী ছবির গল্প এখনই বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করতে চান না অনুপর্ণা। তবে জানিয়েছেন, তাঁর শৈশবের পুরুলিয়ার সঙ্গে নতুন ছবির গল্পের একটি যোগ রয়েছে।
পুরুলিয়ায় বড় হয়েছেন তিনি। সেই সময়ের পরিবেশ এবং বাবার পেশাগত জীবনের কিছু অভিজ্ঞতাও নতুন ছবির ভাবনায় প্রভাব ফেলেছে।
নতুন সিনেমার গল্প আবর্তিত হবে একটি দম্পতিকে ঘিরে। তাঁদের সম্পর্ক, ব্যক্তিগত জীবন এবং একটি অকার্যকর দাম্পত্যের নানা জটিলতা উঠে আসবে ছবিতে।
অনুপর্ণার দাবি, তাঁর আগের দুই ছবির তুলনায় নতুন গল্পটি একেবারেই আলাদা হবে। ছবিটির শুটিং হওয়ার কথা ঝাড়খণ্ডে।
বাবা-মায়ের প্রতিক্রিয়া কী?
মেয়ের পরপর দু’বার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত খুশি অনুপর্ণার বাবা-মা।
প্রথমবার ভেনিসে সাফল্যের পর থেকেই তাঁরা মেয়েকে আরও উৎসাহ দিতে শুরু করেন। অনুপর্ণার কথায়, বাবা-মা এখন তাঁর পেশাকে বোঝার চেষ্টা করেন। আগে যে বিষয়টি তাঁদের কাছে নতুন ছিল, এখন সেটিই ধীরে ধীরে তাঁদের পরিচিত হয়ে উঠেছে।
বাবা-মায়ের কাছ থেকে এখনও একই পরামর্শ পান তিনি—আরও পড়াশোনা করতে হবে, আরও লিখতে হবে এবং নিজের কাজকে বুঝতে হবে।
অনুপর্ণাও জানিয়েছেন, বাবা-মাকে গর্বিত করার জন্য নিজের সেরাটা দিতে চান। তবে কোনও কাজে ব্যর্থ হলেও থেমে যাবেন না। বাবার শেখানো সেই কথাই মনে রাখবেন—না জিতলে শিখে ফিরতে হবে।
ভারতীয় সিনেমাকে আরও ভালোভাবে বুঝতে চান
আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য পাওয়ার পরেও অনুপর্ণার লক্ষ্য শুধু একের পর এক সিনেমা বানিয়ে যাওয়া নয়। ভারতীয় সিনেমাকে আরও গভীরভাবে বোঝা এবং সেই পরিসরে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়াই তাঁর বড় লক্ষ্য।
এই প্রসঙ্গে তিনি জোয়া আখতার, কিরণ রাও, মীরা নায়ার এবং নন্দিতা দাশের মতো পরিচালকদের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের কাজ ও ভারতীয় সিনেমা নিয়ে তাঁদের ভাবনা থেকে তিনি অনুপ্রেরণা পান।
অনুপর্ণার মতে, এই পরিচালকেরা ভারতীয় সিনেমাকে শুধু বিনোদনের জায়গা হিসেবে দেখেননি। বরং দেশ, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্র হিসেবেও সিনেমাকে দেখেছেন।
সেই জায়গা থেকেই নিজেকেও আরও শিখতে চান তিনি। তাঁর কথায়, সিনেমার একজন শিক্ষার্থী হিসেবে শেখার শেষ নেই।
কলকাতা মানেই তাঁর কাছে বিপ্লব, পড়াশোনা ও সাহিত্য
পুরুলিয়ায় বেড়ে উঠলেও কলকাতার সঙ্গে অনুপর্ণার আলাদা সম্পর্ক রয়েছে। জীবনের খুব বেশি সময় কলকাতায় না কাটালেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং এসআরএফটিআই চত্বরে কাটানো সময় তাঁর কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
অনির্বাণ মাইতির কাছ থেকেও সেখানে কিছুদিন শেখার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
অনুপর্ণার কাছে কলকাতা শুধু একটি শহর নয়। তাঁর কাছে কলকাতা মানে বিপ্লব, পড়াশোনা এবং সাহিত্য। কলকাতায় যতবার গিয়েছেন, সেখান থেকে কোনও না কোনও নতুন ভাবনা নিয়ে ফিরেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
‘সংস অফ ফরগটেন ট্রিজ’ নিয়ে আশাবাদী
অনুপর্ণার আগের ছবি ‘সংস অফ ফরগটেন ট্রিজ’ এখনও ভারতে মুক্তির অপেক্ষায়। ছবিটি সেন্সর বোর্ডে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে হতাশ নন পরিচালক। দেশের সংবিধান, সেন্সর বোর্ড, এনএফডিসি এবং ভারত সরকারের প্রতি তাঁর আস্থা রয়েছে।
অনুপর্ণার আশা, ছবিটি পর্যালোচনার পর এর মূল বক্তব্য বোঝা যাবে। তাঁর মতে, সিনেমাটি মূলত ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের সম্পর্কের কথা বলে।
ভেনিসের প্রতিযোগিতা বিভাগে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে গর্বিত অনুপর্ণা। এবারের উৎসবেও ‘লাভার্স ইন দ্য ব্লু নাইট’ প্রতিযোগিতা বিভাগে থাকা একমাত্র ভারতীয় ছবি ছিল বলে তিনি জানিয়েছেন।
প্রথম বাংলা সিনেমা নিয়েও ভাবনা রয়েছে
বাংলা সিনেমা নিয়েও অনুপর্ণার পরিকল্পনা রয়েছে। একটি বাংলা ছবির জন্য প্রযোজকের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি। প্রাথমিকভাবে সম্মতিও জানিয়েছিলেন। তবে এখনও চুক্তি হয়নি।
বর্তমানে সেই প্রকল্প থেকে কিছুটা নিজেকে দূরে রেখেছেন অনুপর্ণা। ছবিটি শেষ পর্যন্ত হবে কি না, তা নিয়েও নিশ্চিত নন তিনি।
তবে নিজের প্রথম বাংলা সিনেমা কেমন হবে, সেটি ইতিমধ্যেই ভেবে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন। ভবিষ্যতে কেউ আগ্রহ দেখালে সেই পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা এগোতে পারে।
‘স্বপ্নের ঘোর’ থেকে আরও বড় স্বপ্ন
পুরুলিয়ার ছোট শহর থেকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় মঞ্চে পৌঁছনো—অনুপর্ণা রায়ের যাত্রা নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার। পরপর দু’বার ভেনিসে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও তাঁর কথায় আত্মতুষ্টির ছাপ নেই।
বরং আরও শেখা, আরও পড়াশোনা করা এবং ভারতীয় সিনেমাকে গভীরভাবে বোঝার তাগিদই বেশি স্পষ্ট।
ভেনিসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে পাওয়া এই সাফল্য হয়তো তাঁর কাছে এখন ‘স্বপ্নের ঘোর’-এর মতো। কিন্তু সেই স্বপ্নকে পরবর্তী সিনেমার মাধ্যমে আরও বড় বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার প্রস্তুতিও শুরু করে দিয়েছেন পুরুলিয়ার এই পরিচালক।



