এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানে মাঝ আকাশে দুই পাইলটের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনায় নতুন মোড়। ঘটনাটিকে সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদী হামলা বলে দাবি করেছে ইজরায়েল। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাট্জের বক্তব্য, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী হামলাকারীর লক্ষ্য ছিল বিমানটিকে যাত্রী-সহ ধ্বংস করে দেওয়া।
তবে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনও তদন্তাধীন। ফ্লাইদুবাই কর্তৃপক্ষও ঘটনার কারণ সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। বরং সংস্থার পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও ধরনের অনুমান বা জল্পনা না করাই উচিত।
৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আভিভের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073। বিমানটি ছিল বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮। উড়ান চলাকালীন ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে হঠাৎ সংঘর্ষ শুরু হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে।
এর পরেই পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ছিল। আচমকাই সেটি কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার ফুট নীচে নেমে যায়। বিমান থেকে জরুরি সংকেতও পাঠানো হয়।
এই পরিস্থিতিতে বিমানে থাকা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত বিমানে থাকা অন্য পাইলট এবং কর্তব্যরত বিমানকর্মীরা পরিস্থিতি সামাল দেন।
ঘটনার পর ইজরায়েল বিষয়টিকে সাধারণ পাইলট-বিবাদ হিসেবে দেখেনি। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাট্জ ঘটনাটিকে ‘জিহাদি সন্ত্রাসবাদী হামলার চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেন।
কাট্জের বক্তব্য অনুযায়ী, বিমানটিতে থাকা ইজরায়েলি যাত্রীদের দ্রুত পদক্ষেপের কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। তাঁর দাবি, কয়েক জন যাত্রী ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে কাবু করেন এবং পরে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ অন্য বিমানকর্মীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও জানান, একজন পাইলট অন্য পাইলটকে ছুরিকাঘাত করার পর বিমানটি ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে থাকতে পারেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যাত্রীদের হস্তক্ষেপে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনও সেটিই—কেন ককপিটে হামলা চালানো হয়েছিল?
ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী দাবি করেছেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী হামলাকারীর উদ্দেশ্য ছিল বিমানটিকে যাত্রী-সহ ধ্বংস করা। তবে এই বক্তব্য এখনও তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ের তথ্যের উপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। হামলাকারীর কোনও সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না, কিংবা কী কারণে তিনি এমন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা এখনও প্রকাশ্যে নিশ্চিত হয়নি।
রয়টার্সও জানিয়েছে, ঘটনার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এখনও অজানা। সৌদি কর্তৃপক্ষ হামলাকারীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। একই সঙ্গে কীভাবে ককপিটে অস্ত্র পৌঁছল এবং হামলার পুরো ঘটনাক্রম কী ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তাই ইজরায়েলের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসবাদী হামলার দাবি করা হলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সেটিকে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ঘটনার ভয়াবহতা বোঝা যায় বিমানের উচ্চতা পরিবর্তনের তথ্য থেকেই। ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, FZ1073 প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় ছিল। এরপর মাত্র অল্প সময়ের মধ্যে বিমানটি প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতা হারায়।
এই আকস্মিক অবতরণই বিমানের ভিতরে পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। বিমান থেকে প্রথমে সাধারণ জরুরি সংকেত এবং পরে বেআইনি হস্তক্ষেপের সংকেত পাঠানো হয়েছিল বলে আল জাজিরা জানিয়েছে।
ঘটনার জেরে ইজরায়েলও বিমানটি নিয়ে নিরাপত্তা-সতর্কতা জারি করে এবং যুদ্ধবিমান আকাশে পাঠানো হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পর বিমানটিকে তেল আভিভের পরিবর্তে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। সেখানেই জরুরি অবতরণ করে FZ1073।
ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, বিমানে থাকা কর্তব্যরত সংস্থার কর্মীরাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তাঁদের উদ্যোগেই বিমানটি নিরাপদে তাবুকে অবতরণ করে। সব যাত্রী এবং বিমানকর্মী নিরাপদে রয়েছেন বলেও সংস্থাটি জানিয়েছে।
তাবুক বিমানবন্দর সূত্রে পরে জানানো হয়, দুই পাইলটই আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ইজরায়েল যখন ঘটনাটিকে সন্ত্রাসবাদী হামলা বলে দাবি করছে, তখন ফ্লাইদুবাইয়ের বক্তব্য তুলনামূলকভাবে সতর্ক।
সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিমানের ককপিটে একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। এর ফলেই বিমানটিকে তাবুকে জরুরি অবতরণ করাতে হয়। তবে সেই সময় পর্যন্ত ঘটনার নেপথ্যের কারণ বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত কোনও তথ্য তাদের হাতে ছিল না। তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ তথ্য সংগ্রহ করছে বলেও জানিয়েছে বিমান সংস্থা।
ফ্লাইদুবাই একই সঙ্গে সবাইকে অনুমান ও জল্পনা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছে। অর্থাৎ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনাটিকে নির্দিষ্ট কোনও উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছে না সংস্থাটি।
ঘটনার পর তাবুকে আটকে পড়া যাত্রী এবং বিমানকর্মীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে বিকল্প বিমানের ব্যবস্থা করে ফ্লাইদুবাই। সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সৌদি আরবে থাকা যাত্রীদের ফেরানোর জন্য দুটি বিকল্প বিমান পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে FZ1073-এর এই ঘটনার কারণে ফ্লাইদুবাইয়ের বাকি বিমান চলাচলে কোনও বড় প্রভাব পড়েনি বলেও সংস্থাটি জানিয়েছে।
এই মুহূর্তে ঘটনাটি নিয়ে একাধিক প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা। ককপিটে ঠিক কী কারণে দুই পাইলটের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল? ছুরিকাঘাতের ঘটনা কীভাবে ঘটল? হামলাকারী কি সত্যিই বিমানটি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন? তাঁর সঙ্গে কোনও সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের যোগাযোগ ছিল কি না? ককপিটে ব্যবহৃত অস্ত্রটি কোথা থেকে এল?
এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
নিশ্চিতভাবে যা জানা গিয়েছে, তা হল—দুবাই থেকে তেল আভিভগামী FZ1073 উড়ানের সময় ককপিটে গুরুতর সংঘর্ষ হয়, বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারায়, জরুরি সংকেত পাঠানো হয় এবং শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের তাবুকে নিরাপদে অবতরণ করে। ইজরায়েল ঘটনাটিকে সন্ত্রাসবাদী হামলার চেষ্টা হিসেবে দেখছে, কিন্তু ফ্লাইদুবাই ও তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ এখনও ঘটনার পূর্ণ কারণ ও উদ্দেশ্য নিশ্চিত করেনি।
তদন্তে হামলার উদ্দেশ্য এবং পুরো ঘটনাক্রম স্পষ্ট হলেই বোঝা যাবে, এটি পরিকল্পিত সন্ত্রাসবাদী হামলা ছিল, নাকি ককপিটে ঘটে যাওয়া অন্য কোনও সংঘর্ষ থেকে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল।



