এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : আকাশে তখন প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতা। হঠাৎ বিমানের ভিতরে শুরু হয় চিৎকার-চেঁচামেচি। ককপিটের দিক থেকে ভেসে আসে গোলমালের শব্দ। মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যাত্রীদের মধ্যে। কেউ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান, কেউ পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন, আবার কেউ ভয়ে কাঁদতে শুরু করেন।
দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানে পাইলটদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের পর এমনই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে যাত্রীদের বর্ণনা ও প্রকাশ্যে আসা ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে। বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারিয়ে জরুরি সঙ্কেত পাঠানোর পর শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে। ঘটনার পর বিমানের ভিতরের আতঙ্কের একাধিক ভিডিয়ো প্রকাশ্যে এসেছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, বিমানের কেবিনে যাত্রীরা নিজেদের আসন ছেড়ে উঠে পড়েছেন। কেউ করিডরে দাঁড়িয়ে, কেউ এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। পরিস্থিতি কী, তা বুঝতে না পেরে যাত্রীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল বলে ভিডিয়োর দৃশ্য থেকে বোঝা যায়।
আরও একটি ভিডিয়োয় বিমানের ভিতর থেকে চিৎকার ও কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে। যাত্রীদের মধ্যে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, তা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে। রয়টার্সকে এক যাত্রী জানিয়েছেন, উড়ান শুরুর প্রায় দু’ঘণ্টা পর তিনি ককপিটের দিক থেকে চিৎকার শুনেছিলেন।
তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রত্যেকটি ভিডিয়োর উৎস বা প্রেক্ষাপট স্বাধীন ভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে অবতরণের পরের কিছু ভিডিয়ো নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলিও সতর্কতা অবলম্বন করেছে।
ফ্লাইট FZ1073 দুবাই থেকে তেল আভিভের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। বিমানটি ছিল বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮। উড়ানের মাঝপথে ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকার সময় আচমকা দ্রুত নীচে নামতে শুরু করে। রয়টার্স জানিয়েছে, প্রায় ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বিমানটি ১৪ হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতা হারিয়েছিল। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির পর জরুরি সঙ্কেত পাঠানো হয়।
প্রথমে পরিস্থিতি দেখে বিমান অপহরণের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। পরে ইজরায়েলি কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাটি অপহরণ নয়; ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে শারীরিক সংঘর্ষের জেরেই জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
ঘটনার বিস্তারিত এখনও তদন্তাধীন। তবে যাত্রীদের বক্তব্য এবং ইজরায়েলি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কো-পাইলট ক্যাপ্টেনকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আহত পাইলট ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এরপর বিমানের ভিতরে থাকা যাত্রীরা পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করেন এবং অভিযুক্ত পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। পরে বিমানে থাকা অন্য বিমানকর্মীরা নিয়ন্ত্রণ নেন এবং বিমানটিকে তাবুকে নামানো হয়।
এক যাত্রী, মিরিয়াম শিরা ওহায়ন, জানিয়েছেন, ককপিটের দরজা খোলার পর তিনি একজন পাইলটকে আহত অবস্থায় দেখতে পান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলের কাছে একটি ভাঁজ করা ছুরিও দেখা গিয়েছিল।
ঘটনার পর প্রকাশ্যে আসা ছবি ও ভিডিয়োতেও বিমানের ভিতরের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কিছু চিহ্ন দেখা যায়। কয়েকটি প্রতিবেদনে যাত্রীদের পোশাকে রক্তের দাগ থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
রয়টার্সের যাত্রী-বয়ান অনুযায়ী, ককপিটের ভিতরের ঘটনার সময় যাত্রীরা বুঝতে পারছিলেন না ঠিক কী ঘটছে। বিমান আচমকা নীচে নামতে থাকায় আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে, বিমানের ভিতরে থাকা যাত্রীদের মধ্যে কয়েক জন পাইলট ছিলেন বলেও ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের সহায়তায় বিমানটির নিয়ন্ত্রণ স্থিতিশীল করা হয় বলে ওইসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এই ঘটনাপ্রবাহের সব বিবরণ এখনও স্বাধীন ভাবে নিশ্চিত হয়নি।
শেষ পর্যন্ত ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানটি সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে। বিমানবন্দরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ক্যাপ্টেন এবং কো-পাইলট দু’জনেই আহত অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছেন।
ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, বিমানটি যাত্রাপথে একটি ঘটনার মুখে পড়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা তদন্তে সহযোগিতা করছে। সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, সব যাত্রী ও কর্মী নিরাপদে ছিলেন এবং তাঁদের ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়।
আকাশে যখন আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা, অবতরণের পর সেই ছবিটাই যেন পুরোপুরি বদলে যায়।
প্রকাশ্যে আসা একটি ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, তাবুকে বিমান অবতরণের পর ইজরায়েলি যাত্রীরা হাততালি দিচ্ছেন, উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন এবং একসঙ্গে গান গাইছেন। তাঁদের মুখে শোনা যায় হিব্রু গান ‘Od Avinu Chai’, যার অর্থ মোটামুটি ‘আমাদের পিতা এখনও জীবিত’। ভিডিয়োটির সত্যতা স্বাধীন ভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে এনডিটিভি জানিয়েছে, যদিও হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যমে সেই ফুটেজ প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ, কয়েক মিনিট আগেও যে বিমানে কান্না ও আতঙ্কের পরিবেশ ছিল, নিরাপদে মাটিতে পৌঁছনোর পর সেখানেই দেখা যায় স্বস্তি, হাততালি ও উচ্ছ্বাসের দৃশ্য।
এই প্রশ্নের উত্তর এখনও নিশ্চিত নয়।
ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির কয়েক জন শীর্ষ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, কো-পাইলট বিমানটি ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন এবং যাত্রীরা তাঁকে বাধা দেন। ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঘটনাটিকে সম্ভাব্য জিহাদি সন্ত্রাসবাদী হামলার চেষ্টা হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, ঘটনার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এখনও স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, ফ্লাইদুবাই এখনও হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অনুমান না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে। ফলে ঘটনাটিকে ঘিরে প্রকাশিত বিভিন্ন দাবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য থাকছে।
ঘটনাটি ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিমানের ককপিটে কীভাবে ছুরি পৌঁছল, দুই পাইলটের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত কীভাবে এবং ঠিক কী কারণে বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারিয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত থেকেই স্পষ্ট হওয়ার কথা।
এখনও পর্যন্ত নিশ্চিত বিষয় হল, FZ1073 বিমানটি মাঝ-আকাশে গুরুতর জরুরি পরিস্থিতিতে পড়েছিল, দ্রুত উচ্চতা হারিয়েছিল, তাবুকে জরুরি অবতরণ করেছিল এবং সব যাত্রী ও কর্মী নিরাপদে নেমেছিলেন। ককপিটের ভিতরের সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ ও অভিযুক্ত পাইলটের উদ্দেশ্য নিয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।



