এনবি সংবাদ ডেস্ক : মঙ্গলের রহস্য উন্মোচনে এবার লাল গ্রহের মাটিতে নয়, তার চাঁদে নজর দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। মঙ্গলের বৃহত্তম উপগ্রহ ফোবোসে মহাকাশযান পাঠিয়ে সেখান থেকে পাথর ও মাটির নমুনা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে জাপান। সেই নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে পরীক্ষা করবেন গবেষকেরা। তাঁদের আশা, এই অভিযান থেকে মঙ্গলগ্রহের দুই উপগ্রহ ফোবোস ও ডিমোসের উৎপত্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে আরও স্পষ্ট হতে পারে লাল গ্রহের জন্ম ও বিবর্তনের ইতিহাস।
জাপানের এই উচ্চাভিলাষী মহাকাশ অভিযানের নাম মার্সিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন (এমএমএক্স)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাকাশযানটি ফোবোসে পৌঁছে সেখান থেকে প্রায় ১০ গ্রাম নমুনা সংগ্রহ করবে। এরপর সেই নমুনা নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসবে। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে ২০৩১ সালের মধ্যে বিজ্ঞানীদের হাতে পৌঁছতে পারে ফোবোসের মাটি ও পাথরের নমুনা।
মঙ্গলগ্রহ নিয়ে মহাকাশ গবেষণা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। লাল গ্রহের পৃষ্ঠে একাধিক রোভার ও ল্যান্ডার পাঠিয়ে বিজ্ঞানীরা সেখানকার মাটি, পাথর, আবহাওয়া এবং অতীতের পরিবেশ সম্পর্কে নানা তথ্য সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু মঙ্গলের দুই প্রাকৃতিক উপগ্রহ ফোবোস ও ডিমোস এখনও বহু প্রশ্নের উত্তর অজানা রেখেছে।
ফোবোস মঙ্গলের দুই চাঁদের মধ্যে বড় এবং গ্রহটির সবচেয়ে কাছের উপগ্রহ। অন্যদিকে ডিমোস আকারে ছোট এবং মঙ্গল থেকে তুলনামূলকভাবে দূরে অবস্থিত। এই দুই উপগ্রহের গঠন, রাসায়নিক উপাদান এবং উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও আলোচনা চলছে।
জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সা এই রহস্যের উত্তর খুঁজতেই এমএমএক্স অভিযান পরিচালনা করছে। মঙ্গলগ্রহের কক্ষপথে পর্যবেক্ষণ চালানোর পাশাপাশি ফোবোসের পৃষ্ঠ থেকে সরাসরি নমুনা সংগ্রহ করা হবে। ফলে শুধু দূর থেকে ছবি তোলা বা যন্ত্রের সাহায্যে উপগ্রহের গঠন বিশ্লেষণ করার মধ্যে গবেষণা সীমাবদ্ধ থাকবে না।
পৃথিবীতে নমুনা ফিরিয়ে আনা গেলে উন্নত পরীক্ষাগারে সেগুলির রাসায়নিক ও খনিজ গঠন বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। তাতে ফোবোসের অতীত সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
এমএমএক্স অভিযানটি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধাপে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথমে জাপানের এইচ৩ রকেটের সাহায্যে মহাকাশযানটিকে পৃথিবী থেকে মহাকাশে পাঠানো হবে। এরপর দীর্ঘ যাত্রা পেরিয়ে সেটি মঙ্গলগ্রহের কাছে পৌঁছবে এবং ফোবোসকে কেন্দ্র করে পর্যবেক্ষণ শুরু করবে।
পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ফোবোসের পৃষ্ঠে নেমে নমুনা সংগ্রহ করা। মূল মহাকাশযান থেকে একটি ছোট অবতরণযান বা রোবোটিক ব্যবস্থা উপগ্রহটির মাটিতে নামবে। সেখানকার নির্দিষ্ট জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তা মূল অভিযানের সঙ্গে যুক্ত নমুনা ফেরত আনার ব্যবস্থায় পাঠানো হবে।
এই অভিযানে ফোবোসের অন্তত দুটি স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে নমুনা পাওয়া গেলে উপগ্রহটির পৃষ্ঠের গঠন ও উপাদানের বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ হবে।
নমুনা সংগ্রহের পর মহাকাশযানটি পৃথিবীর উদ্দেশে যাত্রা করবে। সবশেষে নমুনা বহনকারী ক্যাপসুল পৃথিবীতে ফিরে আসবে। বিজ্ঞানীরা সেই নমুনা পরীক্ষা করে ফোবোসের গঠন, বয়স এবং মঙ্গলের সঙ্গে তার সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করবেন।
তবে মহাকাশে দীর্ঘ যাত্রা, অন্য একটি গ্রহের উপগ্রহের কাছে পৌঁছনো, সেখানকার মাটিতে অবতরণ এবং নিরাপদে নমুনা ফিরিয়ে আনা—প্রতিটি ধাপই প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত কঠিন। তাই এই অভিযান সফল করতে নির্ভুল পরিকল্পনা ও উন্নত মহাকাশ প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে।
মঙ্গলের দুই উপগ্রহের উৎপত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দুটি প্রধান ধারণা নিয়ে আলোচনা চলছে।
একটি ধারণা অনুযায়ী, ফোবোস ও ডিমোস একসময় গ্রহাণুপুঞ্জের অংশ ছিল। পরে তারা মঙ্গলের মহাকর্ষীয় আকর্ষণে গ্রহটির কক্ষপথে আটকে পড়ে। তাদের গঠন ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে এই ধারণার পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ মিলতে পারে।
অন্য একটি ধারণা বলছে, অতীতে মঙ্গলগ্রহের সঙ্গে কোনও বড় মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষ হয়েছিল। সেই সংঘর্ষের ফলে ছিটকে বেরিয়ে আসা ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি হয়ে থাকতে পারে উপগ্রহ দুটি। এই তত্ত্ব সত্যি হলে ফোবোসের নমুনায় মঙ্গলের নিজস্ব উপাদানের চিহ্ন পাওয়া যেতে পারে।
এই দুই সম্ভাবনার মধ্যে কোনটি বেশি গ্রহণযোগ্য, তা বুঝতে ফোবোসের মাটি ও পাথরের নমুনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। কারণ নমুনার মধ্যে থাকা খনিজ, রাসায়নিক উপাদান এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য থেকে তার উৎপত্তি সম্পর্কে সূত্র পাওয়া সম্ভব।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, শুধু নমুনা সংগ্রহ করলেই সব রহস্যের সমাধান হয়ে যাবে না। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণা এবং কম্পিউটার মডেলের সাহায্যে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করতে হবে বিজ্ঞানীদের।
শুনতে সামান্য মনে হলেও মহাকাশ থেকে কয়েক গ্রাম মাটি বা পাথর পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা বিজ্ঞানের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। পৃথিবীতে থাকা পরীক্ষাগারগুলিতে এমন সব অত্যাধুনিক যন্ত্র রয়েছে, যা মহাকাশযানের মধ্যে বসানো যন্ত্রের তুলনায় অনেক বেশি সূক্ষ্মভাবে নমুনা পরীক্ষা করতে পারে।
ফোবোস থেকে সংগ্রহ করা প্রায় ১০ গ্রাম নমুনার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। নমুনার রাসায়নিক গঠন, খনিজের উপস্থিতি এবং বিভিন্ন মৌলের অনুপাত বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা উপগ্রহটির অতীত সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেন।
এ ছাড়া নমুনার মধ্যে থাকা ক্ষুদ্র কণার বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে বোঝার চেষ্টা করা হবে, সেগুলি মঙ্গলের উপাদান থেকে তৈরি হয়েছে, নাকি অন্য কোনও উৎস থেকে এসেছে। ফোবোসের গঠন সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা তৈরি হলে মঙ্গলগ্রহের আশপাশের মহাজাগতিক পরিবেশের ইতিহাসও বোঝা সহজ হবে।
এমএমএক্স অভিযানের গুরুত্ব এখানেই। দূর থেকে সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে সরাসরি নমুনা পরীক্ষার ফলাফল মিলিয়ে দেখার সুযোগ পাবেন গবেষকেরা।
মহাকাশ গবেষণায় জাপান দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গ্রহাণু থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও দেশটির অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার মঙ্গলের উপগ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়েছে জাক্সা।
এই অভিযান সফল হলে সৌরজগতের ছোট উপগ্রহগুলির উৎপত্তি সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা আরও পরিষ্কার হতে পারে। পাশাপাশি মঙ্গলগ্রহের ইতিহাস এবং তার আশপাশের মহাজাগতিক বস্তুর বিবর্তন সম্পর্কেও নতুন তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে।
ফোবোসের মাটি বিশ্লেষণ করে মঙ্গলগ্রহের অতীতের কোনও সূত্র পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে লাল গ্রহে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ ছিল কি না, সেই গবেষণাতেও পরোক্ষভাবে সাহায্য মিলতে পারে। যদিও ফোবোসের নমুনা থেকে সরাসরি মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যাবে, এমন দাবি করার কোনও ভিত্তি এখনও নেই।
এ ছাড়া ফোবোসকে ঘিরে ভবিষ্যতে মানুষের মহাকাশ অভিযান পরিচালনার সম্ভাবনাও রয়েছে। উপগ্রহটির পৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্য, মাধ্যাকর্ষণ এবং পরিবেশ সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া গেলে ভবিষ্যতের অনুসন্ধান পরিকল্পনা তৈরিতে তা কাজে লাগতে পারে।
এমএমএক্স অভিযানের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত পর্যায় হবে নমুনা নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাকাশযানটি ফোবোসে পৌঁছে পর্যবেক্ষণ চালাবে, নমুনা সংগ্রহ করবে এবং তারপর পৃথিবীর উদ্দেশে যাত্রা করবে। সবকিছু ঠিকঠাক চললে ২০৩১ সালের মধ্যে সেই নমুনা পৃথিবীতে পৌঁছতে পারে।
এরপর শুরু হবে আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ—নমুনা পরীক্ষা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। সেই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ্যে এলে ফোবোস ও ডিমোসের উৎপত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে নতুন তথ্য যোগ হতে পারে।
মঙ্গলের মাটিতে রোভার পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহের পর এবার তার উপগ্রহ থেকে সরাসরি নমুনা আনার এই উদ্যোগ মহাকাশ গবেষণায় এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। জাপানের এই অভিযান সফল হলে ভবিষ্যতে সৌরজগতের আরও দূরবর্তী ও রহস্যময় মহাজাগতিক বস্তু থেকে নমুনা সংগ্রহের পথও প্রশস্ত হতে পারে।



