সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমহাকাশের ছবি দেখতে গিয়ে অজানা ধূমকেতুর সন্ধান, অবাক বিজ্ঞানীরা

মহাকাশের ছবি দেখতে গিয়ে অজানা ধূমকেতুর সন্ধান, অবাক বিজ্ঞানীরা

ইউক্লিড টেলিস্কোপের ছবিগুলির ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছিল। ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক বিশেষ সফটওয়্যারের সাহায্যে ছবিগুলিতে চলমান বস্তুর চিহ্ন খুঁজছিলেন। সেই সময় একাধিক ছবিতে একই ধরনের আলোর দাগ তাঁর নজরে আসে।

মহাকাশের গভীরে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের ছায়াপথের ছবি তুলতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের নজরে এল এমন এক বস্তু, যা তাঁরা খুঁজছিলেনই না। প্রথমে ছবিতে দেখা গিয়েছিল আলোর সরু একটি দাগ। কিন্তু একাধিক ছবি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করার পর বোঝা গেল, সেটি আসলে একটি অজানা ধূমকেতু। সৌরজগতের এই নতুন অতিথির সন্ধান ঘিরে তৈরি হয়েছে বিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন কৌতূহল।

ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (ESA) ইউক্লিড স্পেস টেলিস্কোপের তোলা ছবিতে ধরা পড়েছে ধূমকেতুটি। এর নাম দেওয়া হয়েছে সি/২০২৬ এস১ (ইউক্লিড)। গত ১৬ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তোলা ছবিগুলি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রথম এই অজানা মহাজাগতিক বস্তুর অস্তিত্ব সামনে আসে।

এই আবিষ্কারের বিশেষত্ব হলো, ইউক্লিদ টেলিস্কোপ তৈরি করা হয়েছিল মূলত মহাবিশ্বের অদৃশ্য পদার্থ বা ডার্ক ম্যাটার এবং অদৃশ্য শক্তি বা ডার্ক এনার্জি সম্পর্কে অনুসন্ধানের জন্য। দূরবর্তী ছায়াপথ পর্যবেক্ষণ করাই তার প্রধান কাজ। অথচ সেই পর্যবেক্ষণের ছবিই শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের পৌঁছে দিল সৌরজগতের এক অচেনা ধূমকেতুর কাছে।

ছবিতে আলোর সরু দাগ, পরে মিলল ধূমকেতুর চিহ্ন

মহাকাশের ছবি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অনেক সময় এমন বস্তু সামনে আসে, যা প্রথম নজরে সহজে শনাক্ত করা যায় না। বিশেষ করে চলমান কোনও বস্তু একাধিক ছবিতে আলাদা অবস্থানে দেখা দিলে তার গতিবিধি বুঝতে তুলনামূলকভাবে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়।

ইউক্লিড টেলিস্কোপের ছবিগুলির ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছিল। ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক বিশেষ সফটওয়্যারের সাহায্যে ছবিগুলিতে চলমান বস্তুর চিহ্ন খুঁজছিলেন। সেই সময় একাধিক ছবিতে একই ধরনের আলোর দাগ তাঁর নজরে আসে।

প্রথমে দাগগুলি দেখে বস্তুটির প্রকৃতি বোঝা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ছবিগুলি আরও মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করতেই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়, সেখানে এমন একটি বস্তু রয়েছে, যা মহাকাশের পটভূমির তুলনায় অবস্থান পরিবর্তন করছে।

আরও বিশ্লেষণ করে বস্তুটির চারপাশে গ্যাস ও ধুলোর আবছা মেঘের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। এই বৈশিষ্ট্য ধূমকেতুর পরিচিত লক্ষণগুলির মধ্যে অন্যতম। ফলে গবেষকদের সন্দেহ আরও জোরালো হয় যে, ছবিতে ধরা পড়া বস্তুটি কোনও সাধারণ ছায়াপথ বা স্থির মহাজাগতিক উৎস নয়, বরং একটি ধূমকেতু।

ধূমকেতুর পরিচয় নিশ্চিত হলো কীভাবে?

ছবিতে অচেনা কোনও মহাজাগতিক বস্তু দেখা গেলেই তাকে নতুন ধূমকেতু বলে ঘোষণা করা যায় না। প্রথমে পরীক্ষা করে দেখতে হয়, বস্তুটি আগে থেকেই পরিচিত কোনও ধূমকেতু, গ্রহাণু কিংবা অন্য মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে মিলে যায় কি না।

ইউক্লিদের ছবিতে পাওয়া বস্তুটির ক্ষেত্রেও সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। পরিচিত ধূমকেতু ও গ্রহাণুর তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেও এর পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে বিষয়টি জানানো হয় মাইনর প্ল্যানেট সেন্টারকে। এই সংস্থা সৌরজগতের ছোট ছোট মহাজাগতিক বস্তু, যেমন গ্রহাণু ও ধূমকেতুর পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও নথিভুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে।

এরপর পৃথিবী থেকে করা পরবর্তী পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করা হয়। সেই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই ৮ অক্টোবর বস্তুটিকে নতুন ধূমকেতু হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

অর্থাৎ, আবিষ্কারটির ক্ষেত্রে শুধু মহাকাশের একটি ছবিই চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে কাজ করেনি। একাধিক ছবির তুলনা, চলমান বস্তুর চিহ্ন শনাক্তকরণ, পরিচিত মহাজাগতিক বস্তুর তালিকা যাচাই এবং পৃথিবী থেকে পরবর্তী পর্যবেক্ষণ—সব মিলিয়েই ধূমকেতুটির পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে।

পৃথিবী থেকে প্রায় ১৩০ কোটি কিলোমিটার দূরে ধূমকেতুটি

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নতুন ধূমকেতুটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১৩০ কোটি কিলোমিটার দূরে রয়েছে। এত দূরত্বে থাকা কোনও মহাজাগতিক বস্তুর গতিপথ ও কক্ষপথ সম্পর্কে নির্ভুল ধারণা পেতে একাধিক পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষকদের অনুমান, ধূমকেতুটি সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে কয়েক হাজার বছর সময় নিতে পারে। তবে এটি এখনও প্রাথমিক হিসাব। আরও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ধূমকেতুটির গতিবিধি ও কক্ষপথ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা গেলে এই হিসাব আরও নির্ভুল হতে পারে।

ধূমকেতু সাধারণত বরফ, ধুলিকণা ও বিভিন্ন পদার্থের সমন্বয়ে তৈরি হয়। সূর্যের কাছাকাছি এলে তার পৃষ্ঠের বরফজাত উপাদানের কিছু অংশ গ্যাসে পরিণত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। সেই গ্যাস ও ধুলিকণা মিলে ধূমকেতুর চারপাশে আবছা আবরণ তৈরি করে, যা কোমা নামে পরিচিত। কখনও কখনও সূর্যের আলো ও সৌরবায়ুর প্রভাবে ধূমকেতুর লেজও তৈরি হয়।

ইউক্লিদের ছবিতে নতুন বস্তুটির চারপাশে গ্যাস ও ধুলোর মেঘ দেখা যাওয়ায় সেটিকে ধূমকেতু হিসেবে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া গিয়েছিল।

ধূমকেতু খোঁজার জন্য তৈরি হয়নি ইউক্লিদ টেলিস্কোপ

এই আবিষ্কারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ইউক্লিদ টেলিস্কোপের মূল উদ্দেশ্য। ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার এই মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি করা হয়েছে মহাবিশ্বের বৃহত্তর কাঠামো পর্যবেক্ষণের জন্য। বিশেষ করে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বোঝার উদ্দেশ্যে দূরবর্তী ছায়াপথগুলির অবস্থান ও বিন্যাস বিশ্লেষণ করা এর অন্যতম প্রধান কাজ।

ডার্ক ম্যাটার সরাসরি সাধারণ আলো নির্গত বা প্রতিফলিত করে না বলে প্রচলিত পদ্ধতিতে তাকে সরাসরি দেখা যায় না। তবে মহাকর্ষীয় প্রভাবের মাধ্যমে তার উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হওয়ার পেছনে ডার্ক এনার্জির সম্ভাব্য ভূমিকা বোঝার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।

এ ধরনের গবেষণার জন্য ইউক্লিদকে বিশাল মহাকাশ অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করতে হয়। সেই পর্যবেক্ষণের সময় তোলা ছবিতে এমন কোনও বস্তু ধরা পড়তে পারে, যা মূল গবেষণার লক্ষ্য না হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন ধূমকেতুর আবিষ্কার সেই সম্ভাবনাকেই সামনে এনেছে। মহাবিশ্বের দূরবর্তী ছায়াপথ পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি একটি টেলিস্কোপও যে আমাদের সৌরজগতের অজানা বস্তু খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারে, তা এই ঘটনা দেখিয়ে দিল।

মহাকাশের অপ্রত্যাশিত আবিষ্কার কেন গুরুত্বপূর্ণ?

মহাকাশ গবেষণায় সব আবিষ্কার পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটে না। কখনও নির্দিষ্ট কোনও বস্তু পর্যবেক্ষণের সময় অন্য কোনও অজানা বিষয় বিজ্ঞানীদের নজরে আসে। এ ধরনের অপ্রত্যাশিত আবিষ্কার নতুন গবেষণার পথ খুলে দিতে পারে।

নতুন ধূমকেতুটির ক্ষেত্রেও একাধিক পর্যবেক্ষণ ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এখন আরও তথ্য সংগ্রহ করা গেলে এর কক্ষপথ, গতিপথ এবং সৌরজগতের মধ্যে চলাচল সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হতে পারে।

বিশেষ করে ধূমকেতুটি সূর্যকে কত সময়ের ব্যবধানে প্রদক্ষিণ করে, তার গতিপথ কতটা দীর্ঘ এবং ভবিষ্যতে কোথায় অবস্থান করবে—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক হিসাবে কয়েক হাজার বছরের প্রদক্ষিণকাল পাওয়া গেলেও সেটিকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

এ ছাড়া, ইউক্লিদের মতো মহাকাশ টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া তথ্য ভবিষ্যতে আরও অজানা মহাজাগতিক বস্তু শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।

অজানা মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধানে নতুন সম্ভাবনা

সি/২০২৬ এস১ (ইউক্লিড)-এর আবিষ্কার দেখিয়ে দিল, মহাকাশ গবেষণায় কোনও একটি যন্ত্রের গুরুত্ব শুধু তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। যে টেলিস্কোপের প্রধান কাজ দূরবর্তী ছায়াপথ পর্যবেক্ষণ, সেই টেলিস্কোপের তথ্য বিশ্লেষণ করেই সামনে আসতে পারে সৌরজগতের অজানা কোনও বস্তু।

তবে এই আবিষ্কারকে ঘিরে এখনও অনেক তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন রয়েছে। ধূমকেতুটির কক্ষপথ সম্পর্কে প্রাথমিক হিসাব পাওয়া গেলেও তা আরও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিমার্জন করতে হবে। একই সঙ্গে এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ভবিষ্যতের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

দূর মহাকাশের ছবি খুঁটিয়ে দেখার সময় একটি ক্ষীণ আলোর দাগ থেকেই শুরু হয়েছিল এই অনুসন্ধান। পরে সেই দাগের সঙ্গে যুক্ত হলো গ্যাস ও ধুলোর মেঘ, পরিচিত বস্তুগুলির তালিকায় না মেলার তথ্য এবং পৃথিবী থেকে পরবর্তী পর্যবেক্ষণ। সব মিলিয়ে সামনে এল একটি নতুন ধূমকেতুর পরিচয়।

মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় এই আবিষ্কার হয়তো ছোট একটি ঘটনা। কিন্তু এটি মনে করিয়ে দেয়, মহাকাশের দিকে যত বেশি গভীরভাবে তাকানো হচ্ছে, ততই অপ্রত্যাশিত আবিষ্কারের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। আর সেই আবিষ্কারের জন্য কখনও কখনও প্রয়োজন শুধু ছবির মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটি অস্পষ্ট চিহ্নকে নতুন করে দেখা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ