এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম বিন্যান্সে ভয়াবহ সাইবার হামলার ঘটনা সামনে এসেছে। এই হামলায় প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার মূল্যের ডিজিটাল সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ক্রিপ্টোকারেন্সির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যদিও চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেক জব্দ করতে পেরেছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো, এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিন্যান্স জানায়, সাইবার হামলার কারণে সৃষ্ট ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রাথমিক তদন্তে একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। ওই ল্যাপটপ ব্যবহার করে হামলাকারীরা অনুমতি ছাড়াই ডিজিটাল সম্পদ উত্তোলন করতে সক্ষম হয়েছিল বলে জানিয়েছে বিন্যান্স।
প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রবেশের ক্ষেত্রে একটি প্রকৌশলীর ল্যাপটপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ল্যাপটপটি হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর সেটিকে ব্যবহার করে তারা অননুমোদিতভাবে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পায়।
তবে কীভাবে ল্যাপটপটি হ্যাক করা হয়েছিল এবং হামলাকারীরা ঠিক কোন পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা অতিক্রম করেছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি বিন্যান্স।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের একটি বড় অংশ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান এবং ব্লকচেইন বিশ্লেষকদের সহযোগিতায় সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত ও সম্পদ জব্দের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বিন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ই হে জানিয়েছেন, নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আপাতত অর্থ উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিবেশ নিরাপদ বলে নিশ্চিত হওয়ার পরই স্বাভাবিক কার্যক্রম চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিন্যান্সে হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের হাত থাকতে পারে বলে ধারণা করছে দুটি ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান।
তাদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে উত্তর কোরিয়ার ‘ট্রেডারট্রেইটর’ নামের একটি হ্যাকার গোষ্ঠী। বিশ্লেষকদের মতে, বিন্যান্সে হামলার সঙ্গে এই গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিন্যান্সে হামলার বেশ কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট অতীতের সাইবার হামলার মিল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে বাইবিট ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে সংঘটিত বড় ধরনের হ্যাকিংয়ের ঘটনাও রয়েছে।
টিআরএম ল্যাবসের বৈশ্বিক নীতিবিষয়ক প্রধান অ্যারি রেডবোর্ড বলেন, বিন্যান্সে এই হামলা ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পের জন্য একটি নজিরবিহীন ঘটনা। তাঁর মতে, এত বড় পরিসরের সাইবার হামলা এ শিল্প আগে দেখেনি।
তিনি আরও জানান, হামলাকারীদের হাতে এখনো বিপুল পরিমাণ চুরি হওয়া ডিজিটাল সম্পদ রয়েছে। সেগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা এবং উদ্ধার করতে দীর্ঘ সময় ও সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে, ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসও এই হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী বলে জানিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির গবেষণাপ্রধান এরিক জার্ডিন বিশ্বের সব ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এসব প্ল্যাটফর্মে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল সম্পদ জমা থাকে। এ কারণে সাইবার অপরাধীদের কাছে এগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয় লক্ষ্যবস্তু।
বিন্যান্সে হামলার আর্থিক পরিমাণ সত্যিই উদ্বেগজনক। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিমাণ নিশ্চিত হলে ঘটনাটি ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হবে।
এর আগে ২০২৫ সালে বাইবিট ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের সম্পদ চুরির ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
এবার বিন্যান্সের ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
তবে বিন্যান্সে হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে বিবিসির প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, অপরাধীদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং তাদের বিচারের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চলছে।
উল্লেখ্য, ঘটনাটি বিন্যান্স ডটকমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহকদের জন্য পরিচালিত তুলনামূলক ছোট প্ল্যাটফর্ম বিন্যান্স ইউএস জানিয়েছে, এই সাইবার হামলায় তাদের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
বিন্যান্সে হামলার পর চুরি হওয়া ডিজিটাল সম্পদ উদ্ধারে এগিয়ে এসেছে বিশ্বের বড় দুটি ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান টেথার ও সার্কেল। তাদের দাবি, সম্ভাব্য হ্যাকিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট প্রায় ২৪০ কোটি ডলারের সম্পদ তারা জব্দ করেছে।
বিন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ই হে সম্পদ জব্দে সহযোগিতা করায় বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
সার্কেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেরেমি অ্যালেয়ার জানিয়েছেন, বিন্যান্সে সম্ভাব্য সাইবার হামলার বিষয়টি তাঁদের প্রতিষ্ঠান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৮০ কোটির বেশি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ জব্দ করেছে সার্কেল।
সার্কেল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মার্কিন ডলারভিত্তিক স্টেবলকয়েন ইউএসডিসির ইস্যুকারী ও সহ-উদ্যোক্তা। স্টেবলকয়েন হলো এমন এক ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি, যার মূল্য সাধারণত মার্কিন ডলারের মতো কোনো স্থিতিশীল সম্পদের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
অন্যদিকে, টেথারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পাওলো আরদোইনো জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৬০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে।
টেথার ইউএসডিটি নামের বহুল ব্যবহৃত স্টেবলকয়েন ইস্যু করে। আরদোইনো বলেন, ক্রিপ্টো শিল্প এবং অংশীদারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই তাঁদের প্রধান অগ্রাধিকার।
বিন্যান্সের হ্যাকিংয়ের ঘটনায় সহযোগিতার কথা জানিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চুরি হওয়া ডিজিটাল সম্পদ জব্দ করতে তারা বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে কাজ করেছে।
এ ছাড়া ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস জানিয়েছে, বিন্যান্সে হামলার কারণে তাদের নিজস্ব কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করেছে, ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ, স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান এবং ব্লকচেইন বিশ্লেষকদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
বিন্যান্সের নিরাপত্তা সমস্যার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার কয়েক ঘণ্টা আগেই ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারের কয়েকজন পর্যবেক্ষক সম্ভাব্য হ্যাকিং নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিটকয়েনের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমে যায়। একই সঙ্গে ইথেরিয়াম ও সোলানাসহ অন্যান্য বড় ক্রিপ্টোকারেন্সির দামেও উল্লেখযোগ্য পতন দেখা যায়।
বিন্যান্স বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি। ২০১৭ সালে চীনে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল সম্পদ কেনাবেচার সুযোগ দেয়।
বিশ্বজুড়ে প্ল্যাটফর্মটির নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩০ কোটির বেশি বলে ধারণা করা হয়। বিপুল ব্যবহারকারী ও লেনদেনের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো বাজারে বিন্যান্সের কার্যক্রমের প্রভাবও অনেক বেশি।
তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির মুখেও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৪ সালে বিন্যান্স জানিয়েছিল, তাদের হেফাজতে থাকা ডিজিটাল সম্পদের পরিমাণ ১৬ হাজার কোটি ডলারের বেশি।
এত বড় পরিমাণ সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ সাইবার হামলার ঘটনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিন্যান্সে হ্যাকিংয়ের ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতার প্রশ্ন নয়, বরং পুরো ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পের জন্য বড় সতর্কবার্তা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জগুলোতে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল সম্পদ জমা থাকে। ফলে সাইবার অপরাধীরা এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কম্পিউটার, লগইন তথ্য এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে।
বিশেষ করে কোনো কর্মীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি হলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
এ কারণে ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, একাধিক স্তরের পরিচয় যাচাই, লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
সূত্র: বিবিসি


