সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeএক্সক্লুসিভঅভিশপ্ত নাকি নিছক কাকতাল? কোহিনূরের চেয়েও রহস্যময় হোপ ডায়মন্ডের ইতিহাস

অভিশপ্ত নাকি নিছক কাকতাল? কোহিনূরের চেয়েও রহস্যময় হোপ ডায়মন্ডের ইতিহাস

ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের সংগ্রহে যাওয়ার পর মূল বড় হীরাটিকে কেটে নতুন আকার দেওয়া হয়। প্রায় ১১১ ক্যারেটের পাথর থেকে তৈরি করা হয় প্রায় ৬৯ ক্যারেটের একটি নীল হীরা, যার নাম দেওয়া হয় ‘ফ্রেঞ্চ ব্লু’।

এনবি সংবাদ, অনলাইন : অভিশপ্ত রত্নের গল্প ইতিহাসে কম নেই। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত রহস্যময় রত্নগুলোর তালিকায় হোপ ডায়মন্ড-এর নাম আলাদা করে উঠে আসে। গাঢ় নীল রঙের এই হীরাটির ওজন ৪৫ ক্যারেটেরও বেশি। বহু বছর ধরে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মৃত্যু, আর্থিক বিপর্যয়, দুর্ঘটনা এবং পারিবারিক ট্র্যাজেডির নানা গল্প। সেই কারণেই একসময় হোপ ডায়মন্ডকে বলা হতে থাকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে অভিশপ্ত হীরা’।

তবে হীরাটির সঙ্গে সত্যিই কোনও অভিশাপ জড়িয়ে আছে কি না, তার নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। বরং সময়ের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া নানা গল্প, সংবাদ প্রতিবেদন এবং ব্যবসায়িক প্রচারের ফলে এই রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।

বর্তমানে হোপ ডায়মন্ড সংরক্ষিত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি-তে। আশ্চর্যের বিষয়, একসময় ইউরোপের রাজপরিবার ও বিশ্বের ধনীদের হাত ঘুরে বেড়ানো এই বিখ্যাত হীরার শিকড় কিন্তু ভারতের মাটিতে।

হোপ ডায়মন্ডের লিখিত ইতিহাসের সূত্র পাওয়া যায় ১৭ শতকে। ১৬৬৬ সালে ফরাসি পর্যটক ও রত্ন ব্যবসায়ী জাঁ-বাপতিস্ত তাভেরনিয়ে ভারতে একটি বড় নীল হীরা সংগ্রহ করেন। পরে ১৬৬৮ সালে সেটি ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের কাছে বিক্রি করেন তিনি।

স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় বিশ্বে হীরার প্রধান বাণিজ্যিক উৎস ছিল ভারত। ধারণা করা হয়, হীরাটি দক্ষিণ ভারতের গোলকোণ্ডা অঞ্চলের কোল্লুর খনি থেকে পাওয়া হয়েছিল।

তবে এখানেই শেষ নয়। হোপ ডায়মন্ডের জন্মকাহিনিকে ঘিরে রয়েছে আরও রহস্যময় একটি উপকথা।

একটি বহুল প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, হোপ ডায়মন্ডের আসল ওজন ছিল প্রায় ১১১ ক্যারেট। ভারতের একটি মন্দিরে হীরাটি দেবী সীতার মূর্তির চোখ হিসেবে বসানো ছিল। পরে সেটি চুরি করা হয়।

গল্পে বলা হয়, হীরাটি চুরির পর স্থানীয় মানুষ ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দেন। যার কাছেই এই রত্ন যাবে, তার জীবনেই নাকি নেমে আসবে বিপর্যয়।

তবে এই কাহিনির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে ইতিহাসবিদদের কাছে এটি মূলত একটি কিংবদন্তি বা পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া গল্প হিসেবেই বিবেচিত হয়।

তবু হোপ ডায়মন্ডের রহস্যময় ভাবমূর্তি তৈরিতে এই গল্পের ভূমিকা ছিল যথেষ্ট।

ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের সংগ্রহে যাওয়ার পর মূল বড় হীরাটিকে কেটে নতুন আকার দেওয়া হয়। প্রায় ১১১ ক্যারেটের পাথর থেকে তৈরি করা হয় প্রায় ৬৯ ক্যারেটের একটি নীল হীরা, যার নাম দেওয়া হয় ‘ফ্রেঞ্চ ব্লু’।

ফরাসি রাজপরিবারের মূল্যবান সম্পদের অংশ হয়ে ওঠে এই রত্ন। কিন্তু এর পরেই শুরু হয় হীরাটির ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়।

ফরাসি বিপ্লবের অস্থির সময় ১৭৯২ সালে রাজকীয় সংগ্রহশালা থেকে ‘ফ্রেঞ্চ ব্লু’ চুরি হয়ে যায়। প্রায় দুই দশক হীরাটির কোনও নির্ভরযোগ্য হদিস পাওয়া যায়নি।

তারপর ১৮১২ সালে লন্ডনে একটি নীল হীরা প্রকাশ্যে আসে, যার বৈশিষ্ট্য ‘ফ্রেঞ্চ ব্লু’-এর সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। গবেষকদের একটি মত হলো, চুরি যাওয়া হীরাটিকে নতুন করে কেটে ছোট করা হয়েছিল। সেই পাথরই পরে পরিচিত হয় বর্তমান হোপ ডায়মন্ড হিসেবে।

১৮৩৯ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ রত্নের ক্যাটালগে ৪৫.৫২ ক্যারেট ওজনের একটি নীল হীরার উল্লেখ পাওয়া যায়। হীরাটি তখন হোপ পরিবারের মালিকানায় ছিল।

সেখান থেকেই ধীরে ধীরে এর নাম হয়ে যায় ‘হোপ ডায়মন্ড’।

পরবর্তী সময়ে হীরাটির সঙ্গে একের পর এক অস্বাভাবিক ঘটনার গল্প যুক্ত হতে থাকে। আর সেই গল্পই এর ‘অভিশপ্ত’ পরিচিতিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।

হোপ ডায়মন্ডের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে আলোচিত কাহিনিগুলোর একটি হলো এর মালিকদের দুর্ভাগ্য।

হোপ পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সংকট থেকে শুরু করে বিভিন্ন মালিকের মৃত্যু—সবকিছুকেই পরবর্তীকালে হীরাটির অভিশাপের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

কিছু পুরনো সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, হীরাটির মালিকানা পাওয়া কয়েকজন ব্যক্তি আত্মহত্যা, হত্যা কিংবা দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। রুশ যুবরাজ ইভান কানিটোভস্কির মৃত্যুকেও এই তালিকায় রাখা হয়। প্যারিসের নৃত্যশিল্পী লরেন্স লাডুর মৃত্যুর সঙ্গেও হীরাটির নাম জড়ানো হয়েছে।

এমনকি গ্রিক ব্যবসায়ী সাইমন মানচারাইডেসের সঙ্গেও এই হীরার গল্প জুড়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, হীরাটি বিক্রি করার পর তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান।

তবে এসব ঘটনার অনেকগুলোর ক্ষেত্রেই হীরাটির মালিকানা, সময়কাল এবং ঘটনার প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিক তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। ফলে এগুলোকে হীরার ‘অভিশাপের প্রমাণ’ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

হোপ ডায়মন্ডের রহস্যময় ভাবমূর্তিকে ব্যবসায়িক প্রচারের অংশ হিসেবে ব্যবহার করার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি ছিল ফরাসি রত্ন ব্যবসায়ী পিয়ের কার্টিয়ারের সঙ্গে যুক্ত কাহিনি।

আমেরিকার ধনী সমাজের অন্যতম পরিচিত নারী এভলিন ওয়ালশ ম্যাকলিনের কাছে হীরাটি বিক্রি করতে গিয়ে কার্টিয়ার এর সঙ্গে জুড়ে থাকা চুরি, অভিশাপ এবং দুর্ভাগ্যের গল্পকে আরও নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়।

শেষ পর্যন্ত ১৯১১ সালে এভলিন ম্যাকলিন হীরাটি কিনে নেন।

এরপর তার পরিবারে একাধিক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। তার ছেলে দুর্ঘটনায় মারা যায়। স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ভেঙে যায়। তার মেয়েরও মৃত্যু হয়। একই সময়ে বিপুল ঋণের বোঝায় তার আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটে।

পরবর্তীকালে এই ঘটনাগুলোকেও হোপ ডায়মন্ডের ‘অভিশাপের’ সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়।

১৯৪৭ সালে এভলিন ম্যাকলিনের মৃত্যুর পর তার রত্ন সংগ্রহের একটি অংশ জহুরি হ্যারি উইনস্টনের হাতে যায়। কয়েক বছর পর উইনস্টন হোপ ডায়মন্ডকে জনসাধারণের জন্য সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৫৮ সালে তিনি হীরাটি স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনে দান করেন।

এরপর থেকেই হোপ ডায়মন্ড যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। আজও অসংখ্য মানুষ শুধু এই রহস্যময় নীল হীরাটি দেখার জন্য মিউজিয়ামে যান।

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। হোপ ডায়মন্ডের মালিকদের জীবনে ঘটে যাওয়া নানা দুর্ঘটনা ও মৃত্যুকে কি সত্যিই একটি হীরার অভিশাপ বলা যায়?

বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিকভাবে এমন কোনও প্রমাণ নেই যে একটি হীরা তার মালিকের জীবনে দুর্ভাগ্য ডেকে আনতে পারে। বরং দীর্ঘ সময় ধরে বহু মানুষের মালিকানায় থাকা একটি বিখ্যাত রত্নের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের ঘটনা যুক্ত হয়ে যাওয়াকে কাকতাল হিসেবেও ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

স্মিথসোনিয়ান কর্তৃপক্ষও হোপ ডায়মন্ডের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দুর্ভাগ্যের তালিকাকে অনেক ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত এবং তথ্যের দিক থেকে দুর্বল বলে মনে করে।

তবু রহস্যের আবেদন এখানেই। ভারতের মাটি থেকে উঠে আসা একটি নীল হীরা রাজপরিবারের সম্পদ হয়েছে, বিপ্লবের সময় হারিয়ে গেছে, নতুন রূপে ফিরে এসেছে এবং পরে আমেরিকার অন্যতম বিখ্যাত জাদুঘরের প্রদর্শনীতে জায়গা করে নিয়েছে।

অভিশাপ সত্যি হোক কিংবা নিছক কাকতাল—হোপ ডায়মন্ডের ইতিহাস নিঃসন্দেহে রোমাঞ্চকর। আর সেই কারণেই কোহিনূরের মতোই এই নীল হীরাকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল আজও শেষ হয়নি।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ