এনবি সংবাদ, অনলাইন : বাগানের মাটি খুঁড়ে সাধারণত মেলে পাথর, কাঁকর কিংবা পুরনো শিকড়। কিন্তু ডেনমার্কের এক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। বাগানের একটি অংশে টাইলস বসানোর জন্য মাটি খুঁড়তে গিয়েই তাঁর কোদাল গিয়ে ঠেকে শক্ত কোনও বস্তুর গায়ে। প্রথমে বিষয়টি সাধারণ কিছু বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু মাটি সরাতেই সামনে আসে একটি বড় পাত্র। আর সেই পাত্রের ভিতরে যা ছিল, তা দেখে কার্যত হতবাক হয়ে যান তিনি।
পাত্রটির ভিতর থেকে উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ রূপোর সামগ্রী। ছিল শত শত রূপোর কয়েন, বিভিন্ন আকারের রূপোর টুকরো, গয়না, রূপোর বার এবং আরও নানা ধরনের মূল্যবান বস্তু। সব মিলিয়ে উদ্ধার হওয়া প্রাচীন রূপোর সামগ্রীর ওজন প্রায় সাড়ে ১৮ কেজি। বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা, এই সম্পদের বয়স এক হাজার বছরেরও বেশি।
ঘটনাটি ঘটেছে ডেনমার্কের রেবিল্ড এলাকায়। ওই ব্যক্তি নিজের বাড়ির বাগানের একটি অংশ নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। বাগানের মাটি ও কাঁকর সরিয়ে সেখানে টাইলস বসানোর কাজ শুরু করার কথা ছিল।
সেই কাজের জন্য তিনি নিজেই মাটি খুঁড়ছিলেন। অন্য কাউকে দিয়ে কাজ করাননি। একসময় কোদাল চালানোর সময় মাটির নিচে শক্ত কোনও কিছুর সঙ্গে সেটি ধাক্কা খায়। মাটির নিচে পাথর কিংবা কোনও পুরনো নির্মাণসামগ্রী রয়েছে বলে প্রথমে মনে হতে পারে। কিন্তু জায়গাটি একটু খুঁড়ে দেখতেই বদলে যায় পুরো পরিস্থিতি।
মাটি সরানোর পর দেখা যায়, সেখানে একটি বড় পাত্র চাপা দেওয়া রয়েছে। পাত্রটি মাটির অনেকটা নিচে ছিল। সেটি বাইরে আনার পরই বোঝা যায়, এটি কোনও সাধারণ পুরনো পাত্র নয়।
পাত্রের ভিতরের দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি চমকে দেয়। সেখানে একসঙ্গে পাওয়া যায় বিপুল পরিমাণ রূপোর সামগ্রী। এর মধ্যে ছিল বিভিন্ন ধরনের রূপোর কয়েন। পাশাপাশি পাওয়া যায় নানা মাপের রূপোর টুকরো, অলঙ্কার, রূপোর বার এবং আরও কিছু মূল্যবান রূপোর বস্তু।
সব মিলিয়ে প্রায় ৭০০টি রূপোর সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। অধিকাংশ বস্তুই ওই বড় পাত্রের ভিতরে ছিল। তবে মাটির নিচে দীর্ঘদিন থাকার কারণে পাত্রটির একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভেঙে গিয়েছিল।
সেই ভাঙা অংশ দিয়েই কয়েকটি রূপোর সামগ্রী বাইরে বেরিয়ে আশপাশের মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে মাটি সরানোর সময় পাত্রের পাশাপাশি ছড়িয়ে থাকা বেশ কিছু রূপোর বস্তু নজরে আসে।
শুধু বিপুল পরিমাণ রূপো পাওয়ার কারণেই এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর সবচেয়ে বড় গুরুত্ব রয়েছে এর সম্ভাব্য বয়স এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ধার হওয়া রূপোর সামগ্রীগুলির বয়স এক হাজার বছরেরও বেশি হতে পারে। অর্থাৎ এগুলি মধ্যযুগের শুরুর দিকের সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একটি জায়গায় এত বিপুল পরিমাণ রূপোর কয়েন, গয়না, বার এবং অন্যান্য সামগ্রী একসঙ্গে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল কেন, সেটিই এখন গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সেই সময় কোনও ব্যক্তি বা পরিবার নিজেদের সম্পদ নিরাপদ রাখার জন্য মাটির নিচে তা লুকিয়ে রেখেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রাচীনকালে ব্যাংক বা আধুনিক নিরাপদ ভল্টের মতো ব্যবস্থা ছিল না। ফলে বিপদের সময় মূল্যবান সম্পদ মাটির নিচে পুঁতে রাখার ঘটনা বিভিন্ন অঞ্চলের ইতিহাসে দেখা যায়। যুদ্ধ, সংঘাত, লুটপাট কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় মানুষ নিজেদের সম্পদ এভাবে গোপন করে রাখত।
ডেনমার্কে পাওয়া এই রূপোর ভান্ডারের ক্ষেত্রেও এমন কোনও ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে এত বিপুল পরিমাণ মূল্যবান সামগ্রী একটি পাত্রে ভরে মাটির নিচে রাখা হয়েছিল এই তথ্য থেকেই গবেষকদের সামনে একাধিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সম্ভবত সম্পদের মালিক কোনও একসময় সেগুলি ফেরত নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু কোনও কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। ফলে শত শত বছর ধরে সেগুলি মাটির নিচেই চাপা পড়ে ছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে একটি ছোট বস্তু কখনও কখনও বড় ঐতিহাসিক তথ্য সামনে আনতে পারে। সেখানে প্রায় ৭০০টি রূপোর সামগ্রী একসঙ্গে পাওয়ার ঘটনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
কয়েনগুলির নকশা, লেখা, ধাতুর গঠন, গয়নার ধরন এবং অন্যান্য বস্তু বিশ্লেষণ করলে এগুলির উৎপত্তি, সময়কাল এবং সেই সময়কার বাণিজ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে কয়েনের ওপর থাকা চিহ্ন বা লেখা থেকে বোঝা যেতে পারে, কোন শাসকের সময় এগুলি তৈরি হয়েছিল কিংবা কোন অঞ্চলের সঙ্গে এই সম্পদের সম্পর্ক ছিল।
এমন আবিষ্কার থেকে শুধু সম্পদের বয়সই জানা যায় না। সেই সময়কার অর্থনীতি, বাণিজ্যপথ, সামাজিক জীবন এবং মানুষের সম্পদ সংরক্ষণের পদ্ধতি সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া সম্ভব।
বাগানে টাইলস বসানোর মতো একেবারে সাধারণ একটি কাজ থেকেই যে এমন প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার সামনে আসবে, তা ওই ব্যক্তিও নিশ্চয়ই ভাবেননি। কোদালের একটি আঘাতই তাঁকে নিয়ে গেল এক হাজার বছরেরও বেশি পুরনো ইতিহাসের কাছে।
প্রায় সাড়ে ১৮ কেজি রূপোর এই ভান্ডার এখন শুধু মূল্যবান ধাতুর সংগ্রহ নয়। এর প্রতিটি কয়েন, অলঙ্কার এবং রূপোর টুকরোর মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে অতীতের কোনও গল্প।
মাটির নিচে এতদিন অজানা থাকা এই গুপ্তধন কীভাবে সেখানে পৌঁছেছিল, কার ছিল এবং কেন তা মাটির নিচে চাপা পড়ে রইল এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন নজর থাকবে বিশেষজ্ঞদের গবেষণার দিকে। আর এই আবিষ্কার আরও একবার মনে করিয়ে দিল, সাধারণ কোনও জায়গার মাটির নিচেও কখনও কখনও লুকিয়ে থাকতে পারে ইতিহাসের অমূল্য অধ্যায়।



