এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে যখন আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা চলছে, তখন আগেভাগেই প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়। সম্ভাব্য খরা, অতিবৃষ্টি, পানীয় জলের সংকট কিংবা কৃষিতে প্রভাব—বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা।
আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সঙ্গে এল নিনোর সম্পর্ক থাকায় এই পরিস্থিতিকে হালকাভাবে নিতে চাইছে না মেঘালয় সরকার। রাজ্যের কোথায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলিকে সামনে রেখে আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে গেলে এল নিনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব শুধু ওই অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
কোনও অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে খরার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আবার অন্য কোনও এলাকায় অতিবৃষ্টি, বন্যা কিংবা ঝড়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কোথাও আবার দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কারণে দাবানলের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
এই কারণেই এল নিনোর প্রভাবকে শুধু একটি অঞ্চলের আবহাওয়ার সমস্যা হিসেবে দেখা হয় না। কৃষি, পানীয় জল, বনাঞ্চল, স্বাস্থ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্যে মেঘালয়ের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য আলাদা। পাহাড়ি এলাকা, নদী ও জলাধার এবং কৃষিনির্ভর মানুষের উপস্থিতির কারণে আবহাওয়ার বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব একাধিক ক্ষেত্রে পড়তে পারে।
ঠিক সেই কারণেই এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আগেভাগে প্রশাসনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা এ বিষয়ে একটি জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন দফতরকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের মূল লক্ষ্য, পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পরে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে তার আগেই সম্ভাব্য সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত করা।
এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবের ক্ষেত্রে পানীয় জলের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হলে বিভিন্ন এলাকায় জলস্তর কমে যেতে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে পানীয় জল সরবরাহের উপর।
এই পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য জলসম্পদ এবং স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোথাও জলের উৎসে সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেই বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলে পানীয় জলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কারণ আবহাওয়ার বড় পরিবর্তনের সময় পানীয় জলের সমস্যা তৈরি হলে তা দ্রুত সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।
মেঘালয়ের বহু মানুষ কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গেলে কৃষিকাজেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বৃষ্টির পরিমাণ কমে গেলে সেচের প্রয়োজন বাড়তে পারে। আবার হঠাৎ অতিবৃষ্টি হলে জমি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই কৃষিক্ষেত্রে সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যও প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।
প্রশাসনের লক্ষ্য, আবহাওয়ার পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে কৃষকদের দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে পরিস্থিতির উপর নজর রাখার কথাও বলা হয়েছে।
মেঘালয়ে পাহাড়ি নদী, জলপ্রবাহ এবং বিভিন্ন জলভাগ রয়েছে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে কোথাও অতিরিক্ত জলপ্রবাহ তৈরি হলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার দীর্ঘ সময় বৃষ্টি কম হলে জলাধার ও জলপ্রবাহের উপরও চাপ পড়তে পারে।
তাই ঝুঁকিপূর্ণ জলভাগগুলিকে চিহ্নিত করে সেগুলির উপর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনকে সম্ভাব্য বিপদের জায়গাগুলি সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহের উপরও জোর দিতে বলা হয়েছে।
এল নিনোর মতো বড় ধরনের জলবায়ুগত পরিস্থিতির প্রভাব সামলাতে শুধু রাজ্যস্তরের পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। স্থানীয় পর্যায়েও প্রশাসনের সক্রিয় থাকা প্রয়োজন। সেই বিষয়টিই গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী।
ব্লক স্তর পর্যন্ত পরিবেশ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দলগুলিকে সক্রিয় থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোথাও সমস্যা দেখা দিলে যাতে খবর দ্রুত রাজ্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেই ব্যবস্থার উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন দ্রুত বোঝা সম্ভব হবে। কোনও এলাকায় জলসংকট, কৃষিতে সমস্যা কিংবা পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হলে তা দ্রুত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
জলবায়ুজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় একাধিক সরকারি দফতরকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। জলসম্পদ, কৃষি, পরিবেশ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং স্থানীয় প্রশাসন—প্রত্যেকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণে বিভিন্ন সরকারি দফতরের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা। একটি দফতরের কাছে থাকা তথ্য যাতে অন্য প্রয়োজনীয় দফতরের কাছেও দ্রুত পৌঁছয়, সেই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের ধারণা, আগাম প্রস্তুতি এবং দফতরগুলির মধ্যে সমন্বয় থাকলে এল নিনোর প্রভাব দেখা দিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।
এল নিনো ঠিক কতটা এবং কীভাবে মেঘালয়কে প্রভাবিত করবে, তা এখনও নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও এর প্রভাব একরকম হবে না। তাই নির্দিষ্ট কোনও একটি পরিস্থিতি ধরে না এগিয়ে সম্ভাব্য একাধিক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে মেঘালয় সরকার।
পানীয় জল, কৃষি, জলভাগ এবং স্থানীয় পরিবেশ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের নিচুতলা পর্যন্ত প্রস্তুতি জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, এল নিনোর প্রভাব সরাসরি দেখা দেওয়ার অপেক্ষায় না থেকে আগেভাগেই ঝুঁকি কমানোর পথে হাঁটছে মেঘালয়। আবহাওয়ার পরিস্থিতি আগামী দিনে কোন দিকে যায়, তার উপরই নির্ভর করবে এই প্রস্তুতির পরবর্তী ধাপ।



