এনবি সংবাদ, আইটি ডেস্ক : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি। এবার গুগলের এআই মডেল জেমিনি নিয়ে এমনই একটি ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। গুগল জানিয়েছে, গত মে মাসে একটি পরীক্ষামূলক মূল্যায়নের সময় জেমিনি তিনটি প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ফেলেছিল।
এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অন্য একটি কারণে। কারণ, এ ঘটনার মাধ্যমে গুগল প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছে যে তাদের শক্তিশালী এআই মডেল কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নিজে থেকেই হ্যাকিংয়ের মতো কাজ করে ফেলতে পারে।
ঘটনাটি অবশ্য কোনো বাস্তব প্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত অনুমোদনহীন সাইবার হামলা ছিল না। এআই নিরাপত্তা পরীক্ষার অংশ হিসেবেই মডেলটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষা করা হচ্ছিল। কিন্তু পরীক্ষার মধ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে ইন্টারনেট সংযোগ চালু হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি অপ্রত্যাশিত দিকে মোড় নেয়।
এআই নিরাপত্তা পরীক্ষায় কীভাবে ঘটল হ্যাকিং?
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ইরেগুলার জেমিনিসহ বিভিন্ন এআই মডেলের সক্ষমতা যাচাই করছিল। পরীক্ষাটি চলছিল একটি নিয়ন্ত্রিত ল্যাব পরিবেশে।
পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে এআই মডেলকে কিছু ভুয়া প্রতিষ্ঠানের তথ্য দেওয়া হবে। এরপর দেখা হবে, মডেলটি সেই তথ্য ব্যবহার করে কী ধরনের কাজ করতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরীক্ষার পরিবেশে ইন্টারনেট সংযোগ থাকার কথা ছিল না। অর্থাৎ মডেলটি বাইরের বাস্তব ওয়েবসাইট বা অনলাইন সিস্টেমে প্রবেশ করার সুযোগ পাওয়ার কথা নয়।
কিন্তু কোনো এক পর্যায়ে ভুলবশত পরীক্ষার পরিবেশে ইন্টারনেট সংযোগ চলে আসে। আর তখনই শুরু হয় অপ্রত্যাশিত ঘটনা।
ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযোগ পাওয়ার পর জেমিনি অনলাইনে থাকা বিভিন্ন তথ্য খুঁজে বের করে। এমনকি পরীক্ষার অংশ হিসেবে চিহ্নিত কিছু ওয়েবসাইটে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ডও অনুমান করার চেষ্টা করে। এর ফলে তিনটি বাস্তব প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থায় অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ ঘটে।
জেমিনি কীভাবে ওয়েবসাইটের তথ্য খুঁজে পেল?
গুগলের সিকিউরিটি ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিদার অ্যাডকিন্স জানিয়েছেন, সাধারণ একটি মূল্যায়নের সময় জেমিনি ইন্টারনেটে উন্মুক্ত তথ্য খুঁজে পায়।
এরপর মডেলটি যে ওয়েবসাইটগুলোকে পরীক্ষার অংশ বলে মনে করেছিল, সেগুলোতে ঢোকার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য অনুমান করে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই তিনটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা লঙ্ঘিত হয়।
তবে ঘটনাগুলোর প্রতিটিতেই জেমিনি শেষ পর্যন্ত নিজে থেকেই থেমে যায় বলে জানিয়েছে গুগল।
এখানে বিষয়টি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। কারণ, প্রচলিত সফটওয়্যার সাধারণত মানুষের নির্দেশ ছাড়া নিজে থেকে কোনো ওয়েবসাইটে গিয়ে তথ্য খোঁজা, পরিচয়পত্র অনুমান করা বা নিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষা করার মতো ধারাবাহিক কাজ করে না। কিন্তু আধুনিক এআই এজেন্টদের ক্ষেত্রে একাধিক ধাপের কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করার সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে।
পরীক্ষার জন্য তৈরি পরিবেশেই কেন ঝুঁকি তৈরি হলো?
এআই নিরাপত্তা গবেষণায় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ বা স্যান্ডবক্স ব্যবহার করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো মডেলকে বাস্তব বিশ্বের ক্ষতি থেকে দূরে রেখে তার সক্ষমতা যাচাই করা।
ইরেগুলারের পরীক্ষাতেও এমন একটি সীমাবদ্ধ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে ভুয়া কোম্পানি ও কাল্পনিক তথ্য ব্যবহার করে এআই মডেলগুলোর আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল।
কিন্তু ইন্টারনেট সংযোগ ভুলবশত সক্রিয় হয়ে যাওয়ায় সেই সুরক্ষা বলয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দুর্বল হয়ে যায়। মডেলটি তখন পরীক্ষার ভুয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তব অনলাইন তথ্যের পার্থক্য করতে পারেনি বা পরীক্ষার উদ্দেশ্য অনুযায়ী যেসব ওয়েবসাইটকে লক্ষ্য হিসেবে পেয়েছিল, সেগুলোতে প্রবেশের চেষ্টা করে।
এই ঘটনাই এআই নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আলাদা করে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের ঘটনাতেও উঠে এসেছে একই প্রতিষ্ঠান
ইরেগুলারের নাম এর আগেও এআই মডেলের সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার সঙ্গে আলোচনায় এসেছে। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের এআই মডেলের মাধ্যমে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো নিয়েও প্রতিষ্ঠানটি কাজ করেছে।
সম্প্রতি ওপেনএআইয়ের একটি মডেলের মাধ্যমে এআই সফটওয়্যার কোম্পানি হাগিং ফেসের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভাঙার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
বিভিন্ন ঘটনায় এআই মডেলগুলো কিছুটা একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করেছে বলে জানা যায়। অর্থাৎ অনলাইনে তথ্য খোঁজা, প্রয়োজনীয় তথ্য শনাক্ত করা এবং নির্দিষ্ট সিস্টেমে প্রবেশের চেষ্টা করার মতো একাধিক ধাপ মডেলগুলো নিজেরাই সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে।
গুগল কেন ঘটনাটি আগে প্রকাশ করেনি?
জুলাইয়ের শেষ দিকে ওপেনএআইয়ের মাধ্যমে হাগিং ফেসের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর ইরেগুলার গুগলকে জানায় যে জেমিনিও একই ধরনের ঘটনায় জড়িয়েছিল।
পরে গুগল ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করে। তবে প্রতিষ্ঠানটি আগে থেকে বিষয়টি জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি।
গুগলের বক্তব্য অনুযায়ী, জেমিনি যে তিনটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল, সেসব প্রতিষ্ঠানের কোনো ক্ষতি হয়নি। তাই ঘটনাটিকে তখন প্রকাশ্যে আনার প্রয়োজনীয়তা তারা দেখেনি।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি প্রতিষ্ঠানকে গুগল বিষয়টি জানিয়েছিল বলে জানিয়েছে।
শক্তিশালী এআই মডেল নিয়ন্ত্রণে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
এই ঘটনাগুলো এআই প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে নিয়ে এসেছে। এআই মডেলকে শুধু ভালোভাবে কাজ করানোই যথেষ্ট নয়; তাকে কোন পরিস্থিতিতে কী কাজ করতে দেওয়া হবে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি এআই মডেলের হাতে যদি ইন্টারনেট ব্যবহার, তথ্য খোঁজা এবং বিভিন্ন অনলাইন সিস্টেমে কাজ করার সুযোগ থাকে, তাহলে তার কাজের সীমা নির্ধারণ করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গুগলের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, এই ধরনের ঘটনা শক্তিশালী এআই মডেলগুলোকে আরও দায়িত্বশীলভাবে আচরণ করতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতে এআই উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপত্তা পরীক্ষাও আরও কঠোর করতে হবে। বিশেষ করে কোনো মডেলকে বাস্তব ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট বা অন্যান্য ডিজিটাল সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করার আগে একাধিক স্তরের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজন হতে পারে।
এআই হ্যাকিং নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
জেমিনি, ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রোপিকের মডেল ঘিরে হ্যাকিংয়ের মতো ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর এআই প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এসব ঘটনার পর এআই কোম্পানিগুলোর প্রযুক্তি উন্নয়নের কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এআই কোম্পানিগুলো তাদের মডেলের ওপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে পুরো বিষয়টির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি বড় প্রশ্ন—এআই যত বেশি স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে, তাকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
জেমিনির এই ঘটনা দেখিয়েছে, একটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার মধ্যেও সামান্য ভুল কনফিগারেশন বা অনিচ্ছাকৃত ইন্টারনেট সংযোগ বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে এআই মডেলগুলো আরও বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম হলে এই নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।



