সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeগণমাধ্যমট্রাম্পের বিরুদ্ধে একজোট মার্কিন মিডিয়া, হেলিপ্যাড উদ্বোধনে শোনা গেল না প্রেসিডেন্টের কথা

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একজোট মার্কিন মিডিয়া, হেলিপ্যাড উদ্বোধনে শোনা গেল না প্রেসিডেন্টের কথা

তবে CNN, MS NOW এবং Politico এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। তিনটি সংবাদমাধ্যমই সোমবার ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করে। তাদের অভিযোগ, হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সুরক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সংঘাত নতুন মাত্রা পেল। হোয়াইট হাউস থেকে CNN, MS NOW এবং Politico-র সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারির পর এবার একজোট হয়ে প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান কভারেজ থেকে সরে দাঁড়াল একাধিক বড় মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক। এর সরাসরি প্রভাব দেখা গেল সোমবার হোয়াইট হাউসে নতুন হেলিপ্যাড উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ট্রাম্প। তিনি বক্তব্যও দেন। কিন্তু টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ফুটেজে তাঁর বক্তব্য স্পষ্টভাবে শোনা যায়নি। কারণ, প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান কভার করার জন্য যে প্রচলিত টেলিভিশন ‘পুল’ ব্যবস্থা রয়েছে, সেদিন সেটি কাজ করেনি। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্যের বদলে শোনা যায় আশপাশের শব্দ ও হেলিকপ্টারের আওয়াজ। ঘটনাটি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার সূত্রপাত কয়েক দিন আগে। ট্রাম্প প্রশাসন CNN, MS NOW এবং Politico-র সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ১৯ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলির সাংবাদিক ও ক্যামেরাকর্মীদের হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয় এবং তাঁদের প্রেস পাস নিষ্ক্রিয় বা বাজেয়াপ্ত করা হয়।

ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে এই সংবাদমাধ্যমগুলির বিরুদ্ধে ‘ভুয়ো খবর’ প্রকাশের অভিযোগ তুলেছিলেন। তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, অন্য সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

তবে CNN, MS NOW এবং Politico এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। তিনটি সংবাদমাধ্যমই সোমবার ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করে। তাদের অভিযোগ, হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সুরক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এরপরই আসে নজিরবিহীন পদক্ষেপ। হোয়াইট হাউসের প্রেসিডেন্ট টেলিভিশন পুলে থাকা পাঁচটি বড় নেটওয়ার্ক—ABC News, CBS News, NBC News, Fox News এবং CNN—ঘোষণা করে, CNN-কে তার নির্ধারিত দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর তারা বিকল্প ক্যামেরা ক্রু পাঠাবে না।

এই ‘রোটেটিং পুল’ ব্যবস্থায় পাঁচটি নেটওয়ার্ক পালা করে প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান কভার করে। যে নেটওয়ার্কের দায়িত্ব থাকে, তারা ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে যায় এবং পরে সেই ফুটেজ অন্য সংবাদমাধ্যমগুলির সঙ্গে ভাগ করে নেয়।

নেটওয়ার্কগুলির যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, জনগণের সরকারের বিষয়ে নির্ভুল ও স্বাধীন তথ্য পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। কোনও প্রশাসন কোনও সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট পছন্দ না করলেই তাকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া উচিত নয়।

সোমবার হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনে নতুন হেলিপ্যাড উদ্বোধন করেন ট্রাম্প। অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্য সরাসরি সম্প্রচারের জন্য সাধারণত যে টেলিভিশন পুলের ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন ব্যবহার করা হয়, সেদিন সেই ব্যবস্থা ছিল না।

ফলে হোয়াইট হাউসের নিজস্ব ভিডিও ফিড থেকেই অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়। ক্যামেরায় ট্রাম্পকে দেখা গেলেও তাঁর বক্তব্য পরিষ্কারভাবে শোনা যায়নি। আশপাশের শব্দ এবং হেলিকপ্টারের আওয়াজ তাঁর কণ্ঠকে ঢেকে দেয়।

এই দৃশ্যই পরে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটিকে ‘মিউটেড ট্রাম্প’ বা ট্রাম্পের বক্তব্য শ্রুতিহীন হয়ে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে বাস্তবে এটি কোনও ইচ্ছাকৃতভাবে প্রেসিডেন্টের মাইক বন্ধ করে দেওয়া নয়; টেলিভিশন পুলের অনুপস্থিতির কারণে পেশাদার অডিও ব্যবস্থা না থাকার ফলেই তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট শোনা যায়নি।

হোয়াইট হাউসের টেলিভিশন পুল ব্যবস্থাটি বেশ পুরনো। পাঁচটি বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পালা করে প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান কভার করে। নির্দিষ্ট দিনে একটি নেটওয়ার্ক মূল ক্যামেরা ক্রু সরবরাহ করে এবং সেই ফুটেজ অন্য সংবাদমাধ্যমগুলিও ব্যবহার করতে পারে।

এর প্রয়োজনীয়তার অন্যতম কারণ হল জায়গার সীমাবদ্ধতা। প্রেসিডেন্টের প্রতিটি অনুষ্ঠানে সব টেলিভিশন নেটওয়ার্কের আলাদা আলাদা ক্যামেরা দল পাঠানো সম্ভব নয়। তাই একটি নেটওয়ার্ক মূল দায়িত্ব পালন করে এবং অন্যদের সঙ্গে ছবি ও ভিডিও ভাগ করে নেয়।

এই ব্যবস্থার ফলে প্রেসিডেন্টের ছোট অনুষ্ঠান, যাত্রা কিংবা হঠাৎ কোনও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যও সংবাদমাধ্যমগুলি দ্রুত কভার করতে পারে।

সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলি একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। কিন্তু এবার CNN-কে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর ABC, CBS, NBC এবং Fox News-ও বিকল্প ক্রু না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

অর্থাৎ বিষয়টি শুধু একটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে প্রশাসনের বিরোধ হিসেবে থাকেনি। বরং টেলিভিশন পুলের কাজ কীভাবে পরিচালিত হবে এবং প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান কভার করার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটা থাকবে—সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

পরবর্তীতে The New York Times, The Washington Post এবং HuffPost-সহ আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমও প্রতিবাদে যোগ দেয় এবং হোয়াইট হাউসের অনুষ্ঠান থেকে ছবি প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

মিডিয়ার সঙ্গে সংঘাতের মধ্যেই হোয়াইট হাউস নিজস্ব ভিডিও ফিডের ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারের জন্য নিজস্ব মাধ্যম ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

এর ফলে দর্শকরা সরাসরি হোয়াইট হাউসের তৈরি ফুটেজ দেখতে পারছেন। কিন্তু সোমবারের হেলিপ্যাড উদ্বোধনের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, পেশাদার টেলিভিশন পুলের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো না থাকলে সরাসরি সম্প্রচারে অডিও বা অন্যান্য কারিগরি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এদিকে শুধু প্রতিবাদে থেমে থাকেনি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া তিন সংবাদমাধ্যম। CNN, MS NOW এবং Politico আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। তাদের দাবি, হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সংবাদমাধ্যমের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করছে।

মামলায় প্রথম সংশোধনীর পাশাপাশি যথাযথ প্রক্রিয়ার অধিকার সংক্রান্ত সাংবিধানিক প্রশ্নও তোলা হয়েছে। দ্রুত শুনানির আবেদন করেছে সংবাদমাধ্যমগুলি।

হোয়াইট হাউস অবশ্য এই সিদ্ধান্তের পক্ষে রয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান কভার করার প্রবেশাধিকার কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে প্রশাসনের নির্দিষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। ফলে আদালতে এখন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সরকারি প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার এবং প্রশাসনের ক্ষমতার সীমা—এই তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সংঘাত নতুন নয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ সময় ধরেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য বিরোধ দেখা গেছে। দ্বিতীয় মেয়াদে সেই সংঘাত আবারও তীব্র হয়েছে।

সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা এবং তার পরের মিডিয়া প্রতিক্রিয়া অবশ্য পরিস্থিতিকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। একদিকে প্রশাসন নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত করেছে, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলি একসঙ্গে প্রেসিডেন্টের টিভি পুল কভারেজ স্থগিত করেছে।

সোমবারের হেলিপ্যাড উদ্বোধনের ঘটনা তাই শুধু একটি প্রযুক্তিগত সমস্যার গল্প নয়। এর পেছনে রয়েছে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন সংবাদমাধ্যমের মধ্যে প্রবেশাধিকার, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নে চলমান সংঘাত। আদালতের সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপেই স্পষ্ট হবে, এই বিরোধ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ