এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : বক্সা টাইগার রিজার্ভে আবারও বাঘের গর্জন ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে বন দপ্তর। একসময় যে জঙ্গলে একসঙ্গে ২০টিরও বেশি বাঘের বিচরণ ছিল, বর্তমানে সেই বক্সা অরণ্য কার্যত বাঘশূন্য। এবার সেই পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনতেই নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। বিহারের বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে একটি বাঘিনীকে এনে বক্সার জঙ্গলে ছাড়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
বাঘিনীকে বক্সায় আনার জন্য ইতিমধ্যেই বিশেষ দল পাঠানো হয়েছে বিহারে। বক্সা টাইগার রিজার্ভের ১৫ সদস্যের একটি বিশেষ দল সেখানে গিয়েছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে বাঘ পরিবহনের জন্য বিশেষ অ্যাম্বুল্যান্স এবং নির্দিষ্ট নকশায় তৈরি খাঁচা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের আগে বাঘিনীকে নিরাপদে ধরে ঘুমপাড়ানি গুলির মাধ্যমে শান্ত করা হবে। এরপর গ্রিন করিডোর তৈরি করে দ্রুত তাকে বক্সায় নিয়ে আসা হবে।
বক্সায় আসছে ‘ব্যাঘ্র-সুন্দরী’
বন দপ্তরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিহারের বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভের বাঘিনীকে আগামী ২ অক্টোবর বক্সা টাইগার রিজার্ভের জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে সরাসরি জঙ্গলে ছাড়ার আগে তাকে কিছুদিন বিশেষ এনক্লোজারে রাখা হবে।
বাঘিনীকে বক্সায় নিয়ে আসার প্রায় এক সপ্তাহ আগে তাকে ঘুমপাড়ানি গুলি দিয়ে কাবু করা হবে। এরপর বিশেষ খাঁচায় করে অ্যাম্বুল্যান্সে তোলা হবে। নির্দিষ্ট রুটে দ্রুত বক্সায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হবে গ্রিন করিডোর।
বক্সায় পৌঁছানোর পর প্রথমেই বাঘিনীকে জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হবে না। তার জন্য আগে থেকেই তৈরি করা হয়েছে বিশেষ এনক্লোজার। সেখানে কয়েকদিন পর্যবেক্ষণে রাখা হবে তাকে। নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পর পরিস্থিতি বুঝে তাকে বক্সা টাইগার রিজার্ভের মূল জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হবে।
কেন বক্সায় ফেরানো হচ্ছে বাঘ?
আলিপুরদুয়ার জেলার বক্সা টাইগার রিজার্ভের ইতিহাসের সঙ্গে বাঘের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৮২ সালে বক্সা বনাঞ্চল দেশের ১৫তম টাইগার রিজার্ভ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সেই সময় এই বিস্তীর্ণ অরণ্যে ২০টিরও বেশি বাঘ থাকার রেকর্ড ছিল।
পাহাড় ও সমতল মিলিয়ে বক্সা টাইগার রিজার্ভের আয়তন প্রায় ৭৬০ বর্গকিলোমিটার। একসময় এই জঙ্গল ছিল বাঘের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন কারণে বক্সা থেকে বাঘের সংখ্যা কমতে কমতে একসময় কার্যত শূন্যে নেমে আসে।
বর্তমানে বক্সা টাইগার রিজার্ভে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বাঘ নেই। ফলে জঙ্গলের পুরনো বাস্তুতন্ত্রে বাঘের উপস্থিতি ফিরিয়ে আনাই এখন বন দপ্তরের অন্যতম লক্ষ্য।
ক্যামেরায় ধরা পড়েছে ভুটানের বাঘ
বক্সায় বর্তমানে স্থায়ীভাবে বাঘ না থাকলেও একেবারে বাঘহীন হয়ে যায়নি এই অরণ্য। গত কয়েক বছরে ভুটানের দিক থেকে বাঘের বক্সা এলাকায় আসা-যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে ট্র্যাপ ক্যামেরায়।
বনাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় বসানো ক্যামেরায় বাঘের উপস্থিতি ধরা পড়ায় বনকর্তাদের আশা আরও বেড়েছে। এর অর্থ, বক্সার জঙ্গল এখনও বাঘের চলাচলের উপযোগী হতে পারে।
তবে বাইরে থেকে মাঝে মধ্যে বাঘ এলেই সেখানে স্থায়ী বাঘের সংখ্যা তৈরি হয় না। সেই কারণেই এবার পরিকল্পিতভাবে বাঘিনী এনে প্রজননের মাধ্যমে বাঘের একটি স্থায়ী জনসংখ্যা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বক্সায় বাঘের বংশবৃদ্ধির পরিকল্পনা
বন দপ্তরের মূল লক্ষ্য শুধু একটি বাঘিনীকে বক্সায় এনে ছেড়ে দেওয়া নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা। উপযুক্ত পরিবেশে বাঘের স্থায়ী বসবাস এবং ভবিষ্যতে বংশবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করাই এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।
একটি বাঘিনী নতুন পরিবেশে কীভাবে মানিয়ে নেয়, তার স্বাস্থ্য কেমন থাকে এবং পরবর্তী সময়ে তার সঙ্গে পুরুষ বাঘের যোগাযোগ তৈরি করা সম্ভব কি না—এসব বিষয়ও প্রকল্পের সাফল্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
বক্সার জঙ্গলে বাঘের পুরনো আবাস ফিরিয়ে আনতে তাই ধাপে ধাপে এগোতে চাইছে বন দপ্তর। বাঘের নিরাপত্তা, খাদ্যের জোগান, আবাসস্থলের উপযোগিতা এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাত এড়ানোর মতো বিষয়ও এই পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশেষ খাঁচা ও অ্যাম্বুল্যান্সে হবে বাঘিনী পরিবহন
বাঘের মতো বড় ও সংবেদনশীল প্রাণীকে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে নিয়ে যাওয়া সহজ কাজ নয়। এজন্য সাধারণ পরিবহনের পরিবর্তে ব্যবহার করা হবে বিশেষ ব্যবস্থা।
বিহারে পাঠানো হয়েছে বক্সা টাইগার রিজার্ভের ১৫ সদস্যের বিশেষ দল। তাদের সঙ্গে রয়েছে বিশেষ অ্যাম্বুল্যান্স এবং বাঘিনী পরিবহনের উপযোগী খাঁচা।
পরিবহনের সময় বাঘিনীর শারীরিক অবস্থার দিকে বিশেষ নজর রাখা হবে। ঘুমপাড়ানি গুলির পর তাকে নিরাপদে খাঁচায় তোলা হবে। এরপর নির্ধারিত পথে দ্রুত বক্সায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
গ্রিন করিডোরের উদ্দেশ্যও এখানেই। পথে যাতে যানজট বা অপ্রয়োজনীয় দেরির কারণে বাঘিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতেই দ্রুত ও নিয়ন্ত্রিত পরিবহনের ব্যবস্থা করা হবে।
বক্সায় পৌঁছে প্রথমে বিশেষ এনক্লোজারে
বক্সায় পৌঁছেই বাঘিনীকে গভীর জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। প্রথমে তাকে একটি বিশেষ এনক্লোজারে রাখা হবে। নতুন পরিবেশের সঙ্গে তার মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতেই এই ব্যবস্থা।
এই সময় তার স্বাস্থ্য, আচরণ এবং খাবার গ্রহণসহ বিভিন্ন বিষয় নজরে রাখা হবে। পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে পরবর্তী ধাপে তাকে জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হবে।
এই পদ্ধতির মাধ্যমে নতুন পরিবেশে প্রাণীটির ওপর হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমানো যায়। একই সঙ্গে বনকর্মীরাও বাঘিনীর আচরণ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
২ অক্টোবর বক্সায় বাঘ ছাড়ার অনুষ্ঠান
বাঘিনীকে জঙ্গলে ছাড়ার দিনটিকে ঘিরেও রয়েছে বিশেষ আয়োজন। ২ অক্টোবর আলিপুরদুয়ার শহরের প্যারেড গ্রাউন্ডে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সেখানে সাধারণ মানুষ সরাসরি বাঘিনীকে জঙ্গলে ছাড়ার মুহূর্ত দেখতে না পারলেও সেই দৃশ্য লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে দেখার সুযোগ পাবেন। জঙ্গলে বাঘিনীকে ছাড়ার পুরো প্রক্রিয়া প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উপস্থিত থাকবেন। রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ কুমার ওরাওঁ জানিয়েছেন, ২ অক্টোবর বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে আনা বাঘিনীকে বক্সার জঙ্গলে ছাড়া হবে।
ফিরবে কি বক্সার পুরনো গৌরব?
বক্সা টাইগার রিজার্ভের ইতিহাসে বাঘের উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। বরং একসময় এই জঙ্গলেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঘের বিচরণ ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বাঘের অনুপস্থিতি বক্সার বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
ভুটান থেকে বাঘের যাতায়াতের প্রমাণ পাওয়ার পর নতুন করে আশার আলো দেখেছে বন দপ্তর। এবার বিহার থেকে বাঘিনী এনে সেই সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে একটি বাঘিনীকে জঙ্গলে ছাড়ার পরই বক্সায় আগের মতো বাঘের সংখ্যা ফিরে আসবে—এমনটা বলা যায় না। পুরো প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদি। বাঘের প্রজনন, পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপদ আবাসস্থল এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাত নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত।
তবু বক্সার জঙ্গলে বাঘের স্থায়ী বসতি গড়ার এই উদ্যোগ উত্তরবঙ্গের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিহার থেকে আসা এই ‘ব্যাঘ্র-সুন্দরী’ যদি নতুন পরিবেশে সফলভাবে মানিয়ে নিতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে বক্সার জঙ্গলে আবারও বাঘের বংশবৃদ্ধির পথ তৈরি হতে পারে।
একসময় যে বক্সায় বাঘের গর্জন ছিল অরণ্যের স্বাভাবিক শব্দ, সেই গর্জন আবার ফিরিয়ে আনাই এখন বন দপ্তরের লক্ষ্য। ২ অক্টোবর তাই শুধু একটি বাঘিনীকে জঙ্গলে ছাড়ার দিন নয়, বক্সার বাঘ সংরক্ষণের নতুন অধ্যায়ের সূচনাও হতে পারে।



