বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে পাসপোর্টের শক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোন দেশের নাগরিক কতগুলো দেশে আগে থেকে ভিসা না নিয়েই যেতে পারেন, কোথায় পৌঁছে ভিসা পাওয়া যায় এবং কোন দেশগুলোতে যাওয়ার আগে ভিসার আবেদন করতে হয়—এসব বিষয় বিবেচনা করেই তৈরি করা হয় বিভিন্ন পাসপোর্ট র্যাঙ্কিং। নতুন প্রকাশিত ক্যাপিটাল পাসপোর্ট ইনডেক্সে এবারও উঠে এসেছে দেশভেদে ভ্রমণের সুযোগের বড় পার্থক্য।
নতুন তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টের অধিকারী দেশ হিসেবে শীর্ষে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী। অন্যদিকে তালিকার একেবারে নিচে রয়েছে আফগানিস্তান। ভারতের অবস্থান হয়েছে ৭৩ নম্বরে। আগের বছরের তুলনায় ভারতের র্যাঙ্কিংয়ে সাত ধাপ অবনতি হয়েছে।
ক্যাপিটাল পাসপোর্ট ইনডেক্সের নতুন তালিকায় সংযুক্ত আরব আমিরশাহী শীর্ষস্থান দখল করেছে। দেশটির পাসপোর্টের ‘মোবিলিটি স্কোর’ ১৮১। অর্থাৎ, আমিরশাহীর নাগরিকদের জন্য বিশ্বের বিপুল সংখ্যক দেশে তুলনামূলক সহজে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।
তালিকা অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর নাগরিকরা ১৩৮টি দেশে যেতে পারেন ভিসা ছাড়াই। আরও ৪৩টি দেশে পৌঁছানোর পর ভিসা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে ১৭টি দেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে আগে থেকেই ভিসার জন্য আবেদন করতে হয়।
পাসপোর্টের শক্তি নির্ধারণে এই ভ্রমণ-সুবিধাই বড় একটি সূচক হিসেবে কাজ করে। ফলে যেসব দেশের নাগরিকদের বেশি সংখ্যক দেশে ভিসামুক্ত বা সহজ ভিসা সুবিধা রয়েছে, তাদের পাসপোর্ট সাধারণত তালিকার উপরের দিকে অবস্থান করে।
পাসপোর্ট ইনডেক্স মূলত আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সুবিধা পরিমাপের একটি সূচক। নির্দিষ্ট একটি দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে একজন নাগরিক বিশ্বের কতগুলো দেশে তুলনামূলক সহজে প্রবেশ করতে পারেন, তার ওপর ভিত্তি করে এই ধরনের র্যাঙ্কিং তৈরি করা হয়।
ভিসা নীতিতে পরিবর্তন এলে সংশ্লিষ্ট তথ্যও আপডেট করা হয়। ফলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভিসা চুক্তি, ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার কিংবা অন-অ্যারাইভাল ভিসার মতো সুবিধা পরিবর্তিত হলে র্যাঙ্কিংয়েও তার প্রভাব পড়তে পারে।
ক্যাপিটাল পাসপোর্ট ইনডেক্স গত ১৯ বছর ধরে বিশ্বের ২২৭টি দেশ ও অঞ্চলকে বিবেচনায় নিয়ে এই তালিকা প্রকাশ করে আসছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সুযোগ ও পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা বোঝার ক্ষেত্রে তালিকাটি আলোচনায় আসে।
নতুন তালিকায় ভারতের অবস্থান ৭৩ নম্বরে। ২০২৫ সালে ভারত ৬৬ নম্বরে ছিল। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ভারতের অবস্থান সাত ধাপ নিচে নেমেছে।
ভারতের সঙ্গে একই অবস্থানে রয়েছে জিম্বাবোয়ে, উগান্ডা ও ভিয়েতনামের মতো কয়েকটি দেশ। নতুন তালিকা অনুযায়ী, ভারতীয় নাগরিকরা ২৫টি দেশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারেন।
এছাড়া ৩৯টি দেশে পৌঁছানোর পর ভিসা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আরও পাঁচটি দেশের ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য রয়েছে ETA বা ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশনের সুবিধা। সব মিলিয়ে ভারতের ‘মোবিলিটি স্কোর’ দাঁড়িয়েছে ৬৯।
তবে এর বিপরীতে ১২৯টি দেশে ভ্রমণের আগে ভারতীয় নাগরিকদের ভিসার জন্য আবেদন করতে হয়। ফলে ভ্রমণের স্বাধীনতার দিক থেকে বিভিন্ন দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতের পাসপোর্ট র্যাঙ্কিংয়ের পরিবর্তন সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের তুলনায় সাত ধাপ নিচে নেমে যাওয়ায় ভারতের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে পাসপোর্ট র্যাঙ্কিংকে একটি নির্দিষ্ট সূচকের ফলাফল হিসেবে দেখা প্রয়োজন। বিভিন্ন সংস্থা নিজেদের পদ্ধতি ও মানদণ্ড ব্যবহার করে পাসপোর্টের শক্তি পরিমাপ করে। তাই একেকটি সূচকে একই দেশের অবস্থান ভিন্ন হতে পারে।
ভারত সরকারও বেসরকারি সংস্থার প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং নিয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছে। লোকসভায় দেওয়া এক লিখিত জবাবে বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কীর্তিবর্ধন সিং জানান, সরকার এমন কিছু র্যাঙ্কিং ও তালিকা সম্পর্কে অবগত, যেগুলো কিছু বেসরকারি সংস্থা নিজেদের নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রকাশ করে।
অর্থাৎ, পাসপোর্ট র্যাঙ্কিংকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো একক সরকারি মানদণ্ড হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট সংস্থার ব্যবহৃত পদ্ধতির আলোকে মূল্যায়ন করা হয়।
নতুন ক্যাপিটাল পাসপোর্ট ইনডেক্সে সবচেয়ে নিচের অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান। দেশটির নাগরিকদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে ভিসা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ তুলনামূলক বেশি।
তালিকা অনুযায়ী, আফগান নাগরিকরা মাত্র ছয়টি দেশে ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন। আরও ২৯টি দেশে পৌঁছানোর পর ভিসা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ১৬৩টি দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে আগে থেকেই ভিসার জন্য আবেদন করতে হয়।
এই হিসাবের কারণে আফগানিস্তানের পাসপোর্টের ‘মোবিলিটি স্কোর’ এবং সামগ্রিক অবস্থান তালিকার একেবারে নিচে রয়েছে।
একটি দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত ভ্রমণ সুবিধা আন্তর্জাতিক যাতায়াতকে অনেক সহজ করে। সাধারণত কোনো দেশে যাওয়ার আগে ভিসার আবেদন করতে হলে কাগজপত্র প্রস্তুত করা, আবেদন ফি দেওয়া, প্রয়োজনীয় যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া এবং অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
অন্যদিকে ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার থাকলে এসব প্রক্রিয়ার অনেকটাই প্রয়োজন হয় না। আবার অন-অ্যারাইভাল ভিসার ক্ষেত্রে গন্তব্য দেশে পৌঁছে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ভিসা নেওয়া যায়।
ব্যবসা, পর্যটন, শিক্ষা কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে বিদেশ ভ্রমণকারীদের জন্য এসব সুবিধা সময় ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমাতে পারে। তাই পাসপোর্টের শক্তি পরিমাপের ক্ষেত্রে ভিসামুক্ত এবং সহজ ভিসা সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পাসপোর্টের র্যাঙ্কিং একটি দেশের নাগরিকদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সুবিধা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে একটি দেশের অর্থনীতি, জীবনযাত্রার মান, নিরাপত্তা কিংবা সামগ্রিক উন্নয়ন সম্পর্কে সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
একটি দেশের পাসপোর্ট শক্তিশালী হওয়ার পেছনে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, ভিসা নীতি, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির মতো বিষয় কাজ করতে পারে। আবার রাজনৈতিক বা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনেও ভিসা নীতিতে বদল আসতে পারে।
তাই পাসপোর্ট ইনডেক্সকে মূলত আন্তর্জাতিক ভ্রমণ-সুবিধার একটি পরিমাপক হিসেবে দেখা যায়।
নতুন তালিকার তথ্য থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাসপোর্টের মধ্যে ভ্রমণ-সুবিধার বড় পার্থক্য স্পষ্ট হয়। সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর নাগরিকরা যেখানে বহু দেশে ভিসামুক্ত বা সহজ ভিসা সুবিধা পান, সেখানে আফগান নাগরিকদের অধিকাংশ গন্তব্যের জন্য আগাম ভিসা প্রয়োজন।
ভারতের অবস্থান এই দুই প্রান্তের মাঝামাঝি। ভারতীয় নাগরিকরা ২৫টি দেশে ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন, ৩৯টি দেশে পৌঁছে ভিসা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং পাঁচটি দেশে ETA সুবিধা রয়েছে। তবে ১২৯টি দেশের জন্য আগাম ভিসার প্রয়োজন হয়।
সব মিলিয়ে নতুন ক্যাপিটাল পাসপোর্ট ইনডেক্স আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে দেশভেদে সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য আবারও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে ভারতের র্যাঙ্কিংয়ের পরিবর্তন এবং পাসপোর্ট সূচক তৈরির পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।



