সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeএক্সক্লুসিভটিকিট নেই, প্রকাশ্য তালিকাও নেই! বিশ্বের ধনকুবেরদের রহস্যময় সান ভ্যালির ভিতরে কী?

টিকিট নেই, প্রকাশ্য তালিকাও নেই! বিশ্বের ধনকুবেরদের রহস্যময় সান ভ্যালির ভিতরে কী?

সান ভ্যালি কনফারেন্সের রহস্যের বড় কারণ এর আমন্ত্রণভিত্তিক কাঠামো। সাধারণ মানুষের জন্য এখানে কোনও টিকিট বিক্রি হয় না। প্রকাশ্যে অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থাও নেই। কারা আমন্ত্রণ পাচ্ছেন, সেই তালিকাও নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হয় না।

এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : পাহাড়ঘেরা ছোট্ট শহর। চারদিকে সবুজের সমারোহ। কোথাও হাইকিং, কোথাও গল্‌ফ, আবার কোথাও সাইক্লিং কিংবা র‌্যাফটিং। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে নিছকই বিলাসবহুল গ্রীষ্মকালীন অবকাশযাপন। কিন্তু এই নিরিবিলি পরিবেশের আড়ালেই প্রতি বছর বসে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ও গোপনীয় ব্যবসায়িক সমাবেশ—সান ভ্যালি কনফারেন্স।

যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহোর সান ভ্যালিতে প্রতি বছর জুলাই মাসে এই আয়োজন ঘিরে জড়ো হন বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা। তাই অনেকে মজা করে এই আয়োজনকে বলেন ‘বিলিয়নেয়ার সামার ক্যাম্প’।

সান ভ্যালির এই বিশেষ সমাবেশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর অনাড়ম্বর পরিবেশ। কর্পোরেট দুনিয়ার পরিচিত স্যুট-টাই, ঝকঝকে মঞ্চ কিংবা ক্যামেরার সামনে দীর্ঘ বক্তৃতার বদলে অতিথিদের দেখা যায় অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ পোশাকে।

কেউ পাহাড়ে হাঁটছেন, কেউ গল্‌ফ খেলছেন, কেউ আবার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ছেন। প্রাতরাশের টেবিলে কিংবা সন্ধ্যার নৈশভোজেও চলে অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতা।

এই অতিথিদের তালিকায় থাকেন প্রযুক্তি ও ব্যবসা জগতের অতি পরিচিত মুখ। অতীতে জেফ বেজ়োস, মার্ক জ়ুকেরবার্গ, বিল গেটস, টিম কুক, স্যাম অল্টম্যান, রিড হফম্যানের মতো ব্যক্তিত্বদের সান ভ্যালিতে দেখা গিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সান ভ্যালি কনফারেন্সের রহস্যের বড় কারণ এর আমন্ত্রণভিত্তিক কাঠামো। সাধারণ মানুষের জন্য এখানে কোনও টিকিট বিক্রি হয় না। প্রকাশ্যে অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থাও নেই। কারা আমন্ত্রণ পাচ্ছেন, সেই তালিকাও নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হয় না।

সম্মেলনের ভিতরে কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, কোন ব্যবসায়িক বৈঠক হচ্ছে কিংবা কার সঙ্গে কার সাক্ষাৎ হচ্ছে—এসব বিষয়েও খুব সীমিত তথ্য প্রকাশ্যে আসে।

ফলে বছরের পর বছর ধরে সান ভ্যালিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা কৌতূহল ও কিংবদন্তি।

সান ভ্যালির পরিবেশই এই আয়োজনকে অন্যান্য ব্যবসায়িক সম্মেলন থেকে আলাদা করে। সকালে অতিথিদের একসঙ্গে প্রাতরাশ দিয়ে দিনের শুরু। এরপর কেউ যান হাইকিংয়ে, কেউ গল্‌ফ খেলতে, কেউ সাইক্লিং বা র‌্যাফটিংয়ে।

দিনের শেষে থাকে নৈশভোজ ও অনানুষ্ঠানিক আড্ডা।

বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এটি কোনও কর্পোরেট সম্মেলন নয়, বরং বিশ্বের ধনী ও প্রভাবশালী মানুষদের জন্য বিশেষ একটি অবকাশযাপন। কিন্তু সেই অবসরের পরিবেশেই চলে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক আলাপ।

সান ভ্যালি কনফারেন্সকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় এখানকার অনানুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক যোগাযোগ নিয়ে। একই জায়গায় প্রযুক্তি সংস্থা, বিনিয়োগকারী, সংবাদমাধ্যম, বিনোদন শিল্প এবং অন্যান্য বড় ব্যবসার শীর্ষকর্তারা উপস্থিত থাকেন।

ফলে আনুষ্ঠানিক মিটিংয়ের বদলে হাঁটতে হাঁটতে, গল্‌ফ খেলতে খেলতে কিংবা নৈশভোজের টেবিলে ব্যবসা নিয়ে আলোচনা হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে অতীতে সান ভ্যালিকে ঘিরে বড় ব্যবসায়িক চুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ কর্পোরেট সিদ্ধান্তের কথা উঠে এসেছে। অ্যামাজ়নের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজ়োসের ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ কেনার সিদ্ধান্তের সঙ্গেও সান ভ্যালির নাম জড়িয়ে প্রচার রয়েছে। তবে এ ধরনের ঘটনার সব বিবরণ যে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক নথিতে প্রকাশিত হয়, তা নয়।

সান ভ্যালি কনফারেন্সের ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯৮৩ সাল থেকে প্রতি বছর জুলাই মাসে এই আয়োজন হয়ে আসছে। কয়েক দশকের মধ্যে এটি প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও কর্পোরেট দুনিয়ার অন্যতম আলোচিত আমন্ত্রণভিত্তিক সমাবেশে পরিণত হয়েছে।

তবে নামের মধ্যে ‘কনফারেন্স’ থাকলেও এর ধরন প্রচলিত ব্যবসায়িক সম্মেলনের মতো নয়। দীর্ঘ মঞ্চসভা কিংবা একের পর এক আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পরিবর্তে এখানে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শুধু ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্ব নন, অনেক অতিথি পরিবারের সদস্যদেরও সঙ্গে নিয়ে আসেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়। শিশুদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা ও তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থাও থাকে।

রিসর্টের বিস্তৃত পরিবেশে পরিবারের সদস্যরা যাতে নিরাপদে সময় কাটাতে পারেন, সেদিকেও বিশেষ নজর থাকে। তবে গোটা আয়োজনেই গোপনীয়তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত। ছবি তোলার ক্ষেত্রেও রয়েছে কড়া বিধিনিষেধ। ফলে অতিথিদের ব্যক্তিগত সময় অনেকটাই ক্যামেরার আড়ালেই থেকে যায়।

চলতি বছরও সান ভ্যালি কনফারেন্সকে ঘিরে প্রযুক্তি দুনিয়ায় বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়। ৭ থেকে ১১ জুলাই অনুষ্ঠিত এবারের আয়োজনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ছিল অন্যতম আলোচ্য বিষয়।

এআই দ্রুত ব্যবসা, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগের ধরন বদলে দিচ্ছে। ফলে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি সংস্থার কর্ণধার ও বিনিয়োগকারীদের এক জায়গায় উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

এবারের আয়োজনে জেফ বেজ়োস, মার্ক জ়ুকেরবার্গ, বিল গেটস, টিম কুক, স্যাম অল্টম্যান এবং রিড হফম্যানের মতো পরিচিত নাম উঠে এসেছে।

সান ভ্যালিকে আক্ষরিক অর্থে ‘নিষিদ্ধ নগরী’ বলা ঠিক নয়। এটি কোনও বন্ধ শহরও নয়। বরং সম্মেলনের আমন্ত্রণভিত্তিক কাঠামো, সীমিত সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ এবং অতিথিদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর জোর দেওয়ার কারণেই এই ধরনের উপমা জনপ্রিয় হয়েছে।

বিশ্বের সাধারণ মানুষ যেখানে ধনকুবেরদের দৈনন্দিন জীবনকে সাধারণত ক্যামেরা ও সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে দেখেন, সান ভ্যালিতে সেই পরিচিত দৃশ্য অনেকটাই উল্টে যায়। এখানে বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাবান ব্যবসায়ীরাও কয়েক দিনের জন্য স্যুট-টাই ছেড়ে সাধারণ পোশাকে পাহাড়ি পথে হাঁটেন, গল্‌ফ খেলেন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে নৈশভোজে বসেন।

তবে এই স্বচ্ছন্দ পরিবেশের আড়ালেই যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ, বিনিয়োগের আলোচনা এবং ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নিয়ে কথাবার্তা হয়—সান ভ্যালিকে ঘিরে আগ্রহের অন্যতম কারণ সেটিই।

আর সেই কারণেই পাহাড়ের কোলে ছোট্ট সান ভ্যালি প্রতি জুলাইয়ে পরিণত হয় বিশ্বের ব্যবসায়িক ও প্রযুক্তি দুনিয়ার অন্যতম আলোচিত গন্তব্যে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ